ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

কমপ্লায়েন্ট হতে হবে না হলে কারখানা বন্ধ: এই কার্যক্রমের আওতায় বিজিএমইএ লোক দেখানো কিছু কারখানায় ইন্সপেকশন চালাবে, হয়ত সাথে মিডিয়ার লোকজনও থাকবে, থাকবে টিভি ক্যামেরা, কারণ তাতে খুব অল্পতেই বেশী লোককে দেখানো যাবে! আর এই ইন্সপেকশন করবে কারা জানেন? আমার জানামতে, “যে সকল ফ্যাক্টরি মালিক বা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই ব্যবসায় লোকসান দিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে বা ঋণে জর্জরিত হয়ে ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়ে নিজের সংসার চালাতে পাড়ছে না, তাদেরকেই বিজিএমইএ ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রেখেছে” – তাদের দিয়ে! যারা অলরেডি তাজরীন গার্মেন্টসকে বিকল্প সিঁড়ি ছাড়াই ফ্যাক্টরি লে-আউট পাস করে দিয়ে অবৈধ ফ্যাক্টরিকে বৈধতা দিয়ে মানুষ হত্যা ফাঁদ পেতেছিল! আমার ধারণা, এরাই আবার কমপ্লায়েন্টের জন্য আরও অন্যান্য ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশন করবে, যাদের অলরেডি বৈধতা তারই দিয়ে রেখেছে! রেজাল্ট কি আসবে, তা বুঝতে তো পারছেন?

বিজিএমইএ যদি সত্যিই এটা চায়, তাহলে এই ইন্সপেকশনের কাজটা SGS বা বিদেশি নামকরা তৃতীয় কোন পক্ষ দ্বারা করাক! দেখি তাদের কোমরে কত জোড়, আর কত ভাল মানুষ ওরা!

আসলে এই কার্যক্রমের নামে বিজিএমইএ জনগণ, শ্রমিকদের তথা বিদেশী বাইয়ারদের আইওয়াশ করতে চাচ্ছে। আর ভুলোমন বাঙ্গালীদের ভুলে যাওয়ার সময়টুকু দিতে চাচ্ছে বা পার করতে চাচ্ছে।

তারপর একদিন দেখবেন, যে লাও সেই কদু! আবার আগুন, সেই গেট বন্ধ, বিকল্প সিঁড়ি বিহীন ফ্যাক্টরিতে শত শত পুড়ে যাওয়া লাশ, আবার মিডিয়া-ব্লগারদের চিল্লাচিল্লি, আবার ষড়যন্ত্রের মোয়া, বিজিএমইএ এর ইন্সপেকশন! এই চক্কর ঘুরতেই থাকবে বছরের পর বছর!

এইসব বাদ দিয়ে সবচেয়ে ভাল হয়, “আঞ্জুমান-আরা মফিদুল ইসলামকে গণকবর খুড়ে রেডি থাকতে বলা!”

এবার আমি আমার ব্যক্তিগত একটা বিষয় বলছি-

২০০৬ সালে আমরা ৬ বন্ধু মিলে (যার মধ্যে ২ জন ছিল গারমেন্টেসে চাকুরীরত ছিল) সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থে একটা ছোট নীট গার্মেন্টস কারখানা স্থাপন করেছিলাম। আমাদের ফ্যাক্টরিটা ছোট হলে কি হবে, আমরা সরকারী এই সংক্রান্ত নীতিমালা মেনে এবং ফরেন বাইদের কমপ্লায়েন্ট মেইন্টেইন করেই তা তৈরি করেছিলাম। তিন ফ্লোরের (প্রায় ৯০০০ স্কয়ার ফিট) ফ্যাক্টরিটি সম্পূর্ণ টাইলস করা থেকে শুরু করে, বড় বড় জানালা গুলো থাই গ্লাস দিয়ে তৈরি করার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক তার যাতে নকল কিনতে না হয় তার জন্য “বিআরবি কেবলস” থেকে কর্পোরেট অফারের মাধ্যমে তা কিনেছিলাম এবং বৈদ্যুতিক সুইচ গুলো ছিল ওরিজিনাল জাপানী যা আমরা নিজেরা বাজার যাচাই করে কিনেছিল এবং প্রতিটি বৈদ্যুতিক পয়েন্ট যা থেকে সামান্যতম দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ছিল তা কাঠের বক্স দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলাম আর সেই কাঠ (যাকে আমরা সাধারনতঃ কেরোসিন কাঠ বলে থাকি) আমি নিজে গিয়ে মিরপুরের কাঠ বাজার থেকে যাচাই করে কিনেছিলাম। এছাড়াও ছিল পর্যাপ্ত ফায়ার ডিস্টিংগুসার, বালতি, বালি ও জলের ব্যবস্থা। ফ্লোরে ফ্লোরে ছিল EXIT মার্কিং করার Arrow চিহ্ন।

যখন বিকল্প সিঁড়ি করার প্রশ্ন আসলো, তখন যেসব মিস্ত্রী এইগুলো বানাতে অভ্যস্ত তাদের কাছ থেকে ড্রয়িং চাইলাম। ওদের ড্রয়িং–এ একটা জিনিস দেখে আমি অবাক হলাম, আর তা হল, বিকল্প সিঁড়ির সব দরজায় দুই দিকেই তালা মারার ব্যবস্থা দেখে! আমি একটু রাগ করেই এক মিস্ত্রিকে জিজ্ঞাসা করলাম দরজাগুলোতে তালা মারার ব্যবস্থা কেন রেখেছেন? উনি উত্তর দিলেন, সবাই তো তাই করে, স্যার! আর এটাতে তালা মারা থাকলে চুরি হওয়ার ভয়ও থাকে না!

আমি ওনাদের কথা শুনে খুবই অবাক হয়ে বললাম, দেখুন এই সিঁড়িটা কেন বানানো হচ্ছে? নিশ্চয় আগুন থেকে বাচার জন্য? এই দরজাগুলোতে যদি তালা মারা থাকে, তাহলে আপনি কি নিশ্চিত যখন আগুন লাগবে তখন এই তালা গুলোর চাবি খুঁজে পাওয়া যাবে? বা যার কাছে এই চাবিগুলো থাকবে তাকে খুঁজে পাওয়া যাবে?

আমার কথা শুনে ওরা বোকার হাসি হাসল! পরে আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমাদের বিকল্প সিঁড়ির “দরজায়” বাইরে থেকে লাগানোর কোন ব্যবস্থা থাকবে না এবং ভিতরে থাকবে শুধু বড় ছিটকিনি, যাতে থাকবে না কোন তালা লাগানোর ব্যবস্থা। বিপদে যা সহজেই এবং কারও সাহায্য ছাড়াই খোলা যাবে এবং সিঁড়ির শেষ মাথায় কোন গেট থাকবে না এবং এটা থাকবে মাটির এবং খোলা রাস্তার সাথে লাগোয়া! আমরা আমাদের কমন-সেন্স কাজে লাগিয়ে বিকল্প সিঁড়ির আশেপাশের জানালাগুলো যা দিয়ে ধোঁয়া বের হয়ে সিঁড়িকে দুর্ঘটনার সময় ব্যবহারের অনুপযুক্ত করে ফেলতে পারত তা ইট সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

এই কথা গুলো বললাম এই কারণে যে, একটু সতর্ক হলেই অনেক বড় দুর্ঘটনা থেকে বাঁচা যায়! জাস্ট একটু ইচ্ছা আর নিজের কমন-সেন্স প্রয়োগ করলেই হয়, এর জন্য বেশি পয়সা লাগে না!

যে ফ্যাক্টরিতে আগুনে পুড়ে এত মানুষ মারা গেল, সেই ফ্যাক্টরিটার মালিক অবশ্যই আইন মেনে এটা তৈরি করেননি এবং তাতে যদি সত্যি সত্যি বিকল্প সিঁড়ির ব্যবস্থা না থেকে থাকে, তাহলে তা হয়েছে বড় ধরনের “আইন লঙ্ঘনের ঘটনা” আর বিজিএমইএ, এই ফ্যাক্টরিকে কাজের অনুমতি দিয়ে; করেছে সবচেয়ে বড় অপরাধ! এর ফলে ফ্যাক্টরিটা হয়েছে মৃত্যুফাঁদ, যাকে আমরা “খুনের ফাঁদ”ও বলতে পারি!

এই যে এখানে আগুন লেগে এত মানুষ পুড়ে মারা গেল, এটা একটা হত্যাকাণ্ড, এই অপরাধে, ওই এলাকার সরকারি বিভিন্ন দফতরের ফ্যাক্টরি ইনস্পেক্টর থেকে শুরু করে ফ্যাক্টরি মালিক এবং বিজিএমইএ’র ইন্সপেক্টর, নেতা ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি “গণহত্যার” মামলা দায়ের হওয়া উচিত
পড়ুন : আসুন সবাই মিলে জনস্বার্থে ’বিজিএমই–এর অবৈধ বিল্ডিংটি’ ভেঙ্গে ফেলি!