ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

দীর্ঘ ১৪ বছর পর, আগামী ৯ ডিসেম্বর ২০১২ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ম সমাবর্তন ২০১২ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৯৯৮ সালের ২৯ নভেম্বর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ অর্থাৎ ৭ম সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছিল যা আমরা দেখেছিলাম। তখন বোধহয় আমরা অনার্সের শেষ বর্ষে পড়ি বা পরীক্ষা দিয়েছি। সেই সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী বড় ভাইবোনদের সাথে আমরা অনেক অনেক মজা করেছিলাম, ওনাদের কাছ থেকে খেয়েছিলামও প্রচুর আর স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ওনাদেরই ক্যামেরায় তুলেছিলাম অনেক ছবি। তখন তো আর ডিজিটাল ক্যামেরার ছড়াছড়ি ছিল না, ছিল না মোবাইল ক্যামেরা, তাই এনালগ ক্যামেরাই ছিল ভরসা। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে, প্রায় সব ছবিই স্মৃতির মতই সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে! এক-দুইজন সিনিয়র ভাই, তাদের ক্যামেরায় তোলা ছবি ওই দিনই প্রিন্ট করে নিয়ে এসে আমাদের একটা করে কপি দিয়েছিল কিন্তু সেই ছবিগুলো সহ আমার পুড়নো দিনের সেই ছবির এ্যালবামটিও আর খুঁজে পাচ্ছি না। সবই বিবর্তনের ফল! প্রথমে স্মৃতি গেছে, তারপরে ছবির এ্যালবামটা গেলো, এবার মানুষ গুলো যেতে থাকবে! এ সবই “সময়” দ্বারা নির্ধারিত, কিছুই আমাদের হাতে নেই!

১৯৫৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পর থেকে যদিও ৫৯ বার সমাবর্তন হওয়ার কথা ছিল কিন্তু হয়েছে মাত্র ৭ বার আর এইবার দিয়ে ৮ বার। এবারেরটা হচ্ছে প্রায় ১৪ বছর পর অথচ হওয়ার কথা ছিল প্রতি বছর! অর্থাৎ আমাদের দেশে রাজনৈতিক জট, যানজট, সেশনজটের মতো সমাবর্তনেও জট লেগেছে। দেরী হলেও শেষ পর্যন্ত যে অন্তত সমাবর্তনের জটটা যে কেটেছে, এই ভাল!

প্রথমে এই সমাবর্তনের তারিখটা ছিল ২ ডিসেম্বর ২০১২, পরে এটা পরিবর্তিত হয়ে নতুন তারিখটি নির্ধারিত হয়েছে। এবারের সমাবর্তনে ১৯৯৮ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর অর্থাৎ ২০০৮ সাল পর্যন্ত যারা স্নাতক পাশ করেছে তাদের হাতে মূল সনদ তুলে দেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নেওয়া সমাবর্তনের এই উদ্যোগের খবরটা, আমি অনেকদিন থেকেই জানি। বকুল, ফারুক, মিথুন, তাপস’রা আমাকে এই উদ্যোগ শুরু হওয়ার পর পরই অর্থাৎ প্রথমদিকেই খবরটা জানিয়েছিল, সেটা হবে তাও প্রায় মাস তিনেক আগে। বরাবরের মত, এবারও আমি ওদের “কনফিডেন্টলি” ও “ডেফিন্টলি” কোন উত্তর দেইনি! অর্থাৎ আমি এতে অংশগ্রহণ করব কিনা তা নিশ্চিত করে ওদের কিছু বলিনি। “সময় পাব না”, “ছুটি পাব না” -এইসব আগাম ধারণা করে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই “না” করেছি। আসলে আমি আগাম কোন কথা কাউকে দেইনা বা বলি না! এটাই আমার চরিত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা!

সাক্ষাতে, ফোনে, ফেসবুকে আমার বন্ধুরা এতে অংশগ্রহণ করার জন্য, আমাকে উৎসাহিত করেছে, চাপ দিয়েছে, গালাগাল করেছে। এমনকি এও বলেছে, “তোকে কিছু করতে হবে না, আমরাই তোর রেজিস্ট্রেশন করে দিচ্ছি, তুঁই খালি রাজী হ আর টাকা দে!” ফারুক তো গালাগাল করতে করতে বলেছে, “তুই টাকা খরচ হওয়ার ভয়েই যাচ্ছিস না!”

আমি যদি আমার বন্ধুদের বলি, দোস্ত! আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব না, আমার কাজ আছে, তাহলে নিশ্চিত ভাবেই ওদের কাছ থেকে গালি খাব। যদি বলি, ছুটি পাব না, তাহলে উত্তর পাব, “আহা! আমরা তো আর চাকরি করি না, কেন যাবি না তাই বল, ফালতু কথা বলিস না?”

চারিদিকে সাজ সাজ রব, সবাই যাচ্ছে এই সমাবর্তনে, এই উপলক্ষে মিথুন তো এক ধাপ এগিয়ে মাস খানেক আগেই, পরিচিত সবার জন্য রাজশাহীতে পুড়ো হোটেল তিনদিনের জন্য আগাম বুকিং করে রেখেছে।

আর ফেসবুকে ইমরান, মোস্তফা, সমীর’রা অনবরত এই সমাবর্তনের আপডেট স্ট্যাটাস দিয়েই যাচ্ছে আর দলবদ্ধ করছে সবাইকে। আমি সবই দেখতে পাচ্ছি, জানতে পারছি কিন্তু আমি যেতে পারছি না।

আমি কাউকেই বলে বোঝাতে পারবো না যে, ডিসেম্বরের এই সময়ে ২-৩ দিনের জন্য ছুটি পাওয়াটা আমার জন্য কষ্টকর হবে। পেলেও সেটা হবে আমার জন্য ক্ষতিকর! আমরা যারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং এন্ড সেলসে কাজ করি, তারা জানি, এই মাস হল, আমাদের জন্য চলতি বছরের বরাদ্দ “সেলস টার্গেটের” সাথে, বছরব্যাপী কাজ থেকে “অর্জিত ফলাফল” মিলিয়ে দেখার আর আগামী বছরের “চাপিয়ে দেওয়া সেলস টার্গেট” গ্রহণের মাস!

সেলস টার্গেট আমাদের ডিপার্টমেন্টের জন্য তেমন কোন সমস্যা নেই, কারণ ২০০৯ সালে নতুন ভাবে আমরা আমাদের কাজ শুরু করার পর আমাদের সেলস গ্রোথ খুবই ভাল। এই বছর আমাদের সেলস গ্রোথ হয়েছে গত বছরের তুলনায় অনেক বেশী যা আমাদেরই অন্য ডিপার্টমেন্টের জন্য অবিশ্বাস্য। পর পর তিন বছর আমরা প্রায় একই রকম সেলস গ্রোথ দিচ্ছি। আর এই খুশিতে আমাদের উপর আগামী বছরের “সেলস টার্গেট” জারি হয়েছে, এই বছরেরও ২০০% বেশী! এর যেন কোন শেষ নেই! আমরা যারা টার্গেট ওরিয়েন্ট জব করি, তারা আসলে রেসের ঘোড়া! রেস জিতলে ভাল, না জিতলে ফায়ার! এর মাঝামাঝি বলে কিছু নেই! অতএব রেস জেতাই ভাল!

এসবের পাশাপাশি, আমার কাজটা আর একটু ভিন্ন ধরণের। আমার কাজে শুধু সেলস টার্গেট পূরণ করলেই চলে না! সাথে সাথে ফরেন বায়ার সার্ভিস থেকে শুরু করে কোন কন্টেইনার কোন সমুদ্র বন্দরে কবে পোঁছাচ্ছে, কোন শিপমেন্টের ডকুমেন্ট এখনো তার গন্তব্যে পৌঁছায়নি, Shipping Document, SAFTA, Certificate of Origin এর কোন জায়গায় টাইপিং মিস্টেকের কারণে শিপমেন্ট আটকে গেছে, পেমেন্ট কেন আসছে না, প্রোডাকশনে কোন ভুল হচ্ছে কিনা, SGS কি সন্তুষ্ট হবে, এলসি ঠিক আছে তো, বেনাপোলের ট্রাকের লাইন কেমন, বাইয়ার কেন পোর্টে ট্রাক/কন্টেইনার আনলোড করছে না, সবচেয়ে কম Ocean Freight কোন Shipping Line দিতে পারবে, “একাউন্টস থেকে পেমেন্ট নিশ্চিত কর!”- কনটেইনারের যেন কোন ড্যামারেজ দিতে না হয়, শুকতারা ট্রান্সপোর্ট কেন ট্রেলার দিচ্ছে না, কন্টেইনার-বাহী ট্রেলারের চাকা কেন ফেটে গেল, আনলোড করে দিল্লি থেকে চেন্নাই পোর্টে কন্টেইনার ফিরতে কেন ড্যামেজ হল? এই রকম হাজারো সমস্যা ও অদ্ভুত সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে আর দিতে দিতেই দিন-রাত পার হয়ে যাচ্ছে আমার!

এর সাথে আছে- পুরনোকে সন্তুষ্ট রেখে, নতুন বায়ার তৈরি করে পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করাসহ প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের কাজ। আর আছে UN, USA এর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কিভাবে “নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত” দেশে পণ্য পৌঁছে দেওয়া যায়, তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ!

এইসবকে উপেক্ষা করে, আমার পক্ষে ধীরে ধীরে ছুটি কাটানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে! কোন কারনে ছুটি নিলেও বা অসুস্থ হলেও শান্তি নেই, শুরু হয় ফোনের যন্ত্রণা, এক সময় মনে হয় ছুটির চেয়ে অফিসে যেয়ে বসে থাকাও ভাল!

এরপরেও আমি আমার এই পেশা খুবই ভালবাসি এবং নিজ কাজে সন্তুষ্ট, যা করছি তা বুঝে শুনে মন দিয়েই করছি এবং প্রতিদিন নতুন জিনিস শিখছি। আমি যেমন আমার বায়ারদের কোন সেবা দিতে সামান্যতম কার্পণ্যও করিনা, তেমনি আমার বায়ার’রাও আমাকে পছন্দ করে ও কথা শোনে! যারা এক সময় এই দেশে পণ্য রফতানি করতো, তারাই এখন আমাদের পণ্যের আমদানিকারক, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন!

আমাদের পণ্যটি বাংলাদেশের জন্য একটা “অপ্রচলিত রফতানি পণ্য” এবং দেশের রফতানি বাস্কেটে নতুন সংযোজনা! তাই দেশীয় পণ্য বিদেশে বিক্রি করে এক ডলার আয় করাকে আমি দেশের কাজ বলে মনে করি। এখন আমরা বিদেশ থেকে ফরেন কারেন্সি আনছি লাখ লাখ ডলার, আগামীতে এটাকে কোটিতে তুলবো! এটাই আমাদের নিজস্ব টার্গেট!

মতিহারের ওই অসাধারণ সবুজ চত্বরটা এখন কেমন আছে! আমার ৩০১, জিয়া হলের রুমে এখন কারা থাকে, প্যারিস রোডের বড় বড় শিরিষ গাছগুলো কি ঝড়-মানুষ ঠেকিয়ে এখনও টিকে আছে, ২০০১ সালে ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বিপু’র উদ্যোগে আমি, লিমন, বুলেট ভাই’রা মিলে টুকিটাকি’র সামনের রাস্তার উল্টো দিকে বাণিজ্য অনুষদের সামনে দুইটা আর টুকিটাকি’র ডান দিকে সবুজের চায়ের দোকানের সামনে একটা, মোট তিনটা মেহগনির চারা লাগিয়েছিলাম। ওগুলো কেমন আছে! বেচে আছে, না আমাদেরই কারও হাতে কাঁটা পড়েছে! এই রকম অসংখ্য প্রশ্ন মনে জেগে উঠছে! জানতে ইচ্ছে করছে!

বন্ধুদের এই মিলন মেলায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে এখন আমার মন খারাপ লাগছে! মনে হচ্ছে, একটু চেষ্টা করলেই ছুটিটা হয়ত পেয়ে যেতাম! পরশু ফোন করেছিল তাপস, আফরোজ, কাল জুলকার, আজ করল একরাম, যাচ্ছি না শুনে ওরা সবাই মন খারাপ করলো!

পরিশেষে, শত ঝামেলা ফেলে যারা এই সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করছে, যারা এর আয়োজন করেছে; তাদের প্রতি রইল শুভকামনা এবং এই ব্লগের মাধ্যমে আমিও আমার শত বন্ধুদের সাথে থাকলাম!

মূল সনদপত্র’টা শক্ত করে ধরিস, বন্ধুরা!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ম সমাবর্তন ২০১২, শুভ হোক, সুন্দর হোক, সফল হোক!