ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

পৃথিবীটা শেষ পর্যন্ত টিকে গেল! মায়ানদের ভবিষ্যৎ বাণীও তাহলে ঠিক হল না! ইস অল্পের জন্য একটা সত্যিকার কিছু দেখার সুযোগ মিস করলাম! আবার কবে যে আসবে ২১ শে ডিসেম্বর বা এর মত আর একটা দিন!

২০০০ সালের ৫ই মে তারিখে একবার এই রকম একটা সুযোগ এসেছিল, তখনও একটা কিছু দেখার সুযোগ হাতছাড়া হয়েছিল আমার। সেই সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র। “৫ তারিখে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে” এই রকম এক হুজুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েরা ক্লাস, পড়ালেখা, বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিক-প্রেমিকা ফেলে প্রায় সবাই বাড়ী মুখি হয়েছিল। ভাবখানা এমন, মরবোই যখন তখন বাড়ি যেয়ে বাবা-মা’র সাথে মরি। বিশেষ করে মেয়েরা প্রায় সবাই বাড়ি মুখি হয়েছিল। আমি কিন্তু আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সগর্বে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থেকে গিয়েছিলাম কিছু একটা দেখব বলে। কিন্তু প্রায় ফাঁকা ক্যাম্পাসে আমরা কিছুই দেখিনি। শুধু দেখেছিলাম, ৫ তারিখের পর ছেলে–মেয়েরা ক্যাম্পাসে ফিরে আবার তাদের প্রেমিকা-প্রেমিকদের গলা ধরতে। বিপদে যাদের তারা যথারীতি ভুলে গিয়ে বাড়ি মুখি হয়েছিল এবার তাদের প্রেম উথলে পরতে শুরু করল!

২১ ডিসেম্বর ২০১২, শুক্রবার: কাজের চাপে সাপ্তাহিক একদিনের ছুটিটা আগেই মাটি হয়ে গেছে, আমার উপর নির্দেশ জারি হয়েছে বায়াদের তিন গ্রুপের, এক-গ্রুপকে সকালে ফ্যাক্টরিতে নিয়ে যেতে হবে! খুব ভোরেই অফিসের গাড়ি এসে হাজির। ভেবেছিলাম আজ যেহেতু পৃথিবীটা ধ্বংসই হয়ে যাবে তাই একটু শেষবারের মত আরাম করে শুয়ে থাকি। কিন্তু ড্রাইভারের ক্রমাগত মিস কলে সেটা আর হল না। দ্রুত রেডি হয়ে সকাল পৌনে ৮টায় রওনা হয়ে সকাল ৮টায় হোটেলে এসে উপস্থিত হলাম। পোষের কুয়াশা ঢাকা ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ড্রাইভার তার দক্ষতা দেখানোর সুযোগ পেয়ে গেল এবার। একটানে পোঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে। আমিও ড্রাইভারকে জোড়ে গাড়ি চালাতে বারণ করলাম না, বরং ওকে উৎসাহ দিয়ে বললাম, আজ তো শেষদিন, অতএব মারো টান! খালি খেয়াল রাখ, তুমি যেন কাউকে গুঁতো না মারো!

হোটেল লবিতে যেয়েই ফোন দিলাম। তপন’দা ফোন ধরেই বললেন, সুকান্ত, তুমি উপরে এসে পড়! রাস্তায় ভীষণ কুয়াশা, একটু পরে রওনা হই। আমি হাসতে হাসতে বললাম, এই কুয়াশা তেমন কিছু নয় দাদা, আর তাছাড়া আজ তো আমাদের শেষদিন! দাদা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললেন, দ্রুত ১১ তলা চলে আসো, শেষবারের মত ব্রেকফাস্টটা সেরে নেই! আমিও সুযোগটাকে লুফে নিলাম। কারণ সকালে তাড়াহুড়া করে বের হওয়ার সময় সকালের খাবার খাওয়ার আর সুযোগ হয়নি। খাবার টেবিলে আমি সহ ৫ জন, এর মধ্যে তিন জন ভেজিটেরিয়ান আর তপন’দা সহ আমি নন ভেজিটেরিয়ান মানে মাংসাশী মানুষ। টেবিলে বসতে বসতেই গোয়েংকা’জী তার হিন্দি উচ্চারণে বাংলায় মজা করে বললেন, সুকান্ত বাবু, ভাল করে খেয়ে নিন, আবার কখন খেতে পারবো তার ঠিক নেই! আর আপনি ভেজ না ননভেজ? আমি বললাম, দাদা, আমি ভেজ, ননভেজ দুটোই, তাই বুফেতে যা আছে তার সবই খাব। একটু পর আমাদের সাথে আমার বস যোগ দিলেন। কিন্তু খাবার টেবিলে নন ভেজদের ডবল ডিমের পোঁচ আর অমলেট খেতে দেখে আমার খটকা লাগলো! প্রচুর পরিমাণে আখেরি নাস্তা শেষে দুই গাড়ীতে ভাগ হয়ে সবাই মিলে রওনা দিলাম গন্তব্যের উদ্দেশে।

সায়দাবাদ এসে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ, ভেবেছিলাম পৃথিবীর শেষ দিনে মানুষ ঘর থেকে বের হবে না, রাস্তায় গাড়ী-ঘোড়া চলবে না, সায়দাবাদ-গুলিস্তান ফ্লাইওভারের নিচে ফাঁকা রাস্তা পাবো আর সেই ফাঁকা রাস্তা দিয়ে আমরা সাই করে চলে যাব সোনারগাঁও-এ। কিন্তু আমাদের সেই আশায় গুড়ে বালি! রাস্তা তো ফাঁকা পেলামই না, উল্টো মাত্র দুই-তিন কিলোমিটার মত রাস্তা যেতে লাগলো পাক্কা দুই ঘন্টা! অর্থাৎ সকাল বেলায়ই আমাদের দুই ঘন্টা লস! তৈরি হতে থাকা ফ্লাইওভারের নিচে জ্যামে আঁটকে থাকতে থাকতে শুধু একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল, আর তাহলো, পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাক আপত্তি নাই কিন্তু ফ্লাইওভারের কংক্রিটের বীমগুলো আমাদের উপর ভেঙ্গে পড়া চলবে না!

ফ্যাক্টরিতে এসেই আমরা পৃথিবী ধ্বংসের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম, নেমে পড়লাম কাজে। শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন উদ্যম, আর চেষ্টা করতে থাকলাম, কিভাবে বায়ারদের সন্তুষ্ট করে নতুন অর্ডার পাওয়া যায়? কারণ নতুন বছরে আমাদের নতুন টার্গেট। আর সেটা আমাদের পূরণ করতেই হবে!

ফ্যাক্টরিতে কাজ, মিটিং–সিটিং ও আপাতত শেষবারের মত রাজকীয় খাওয়া–দাওয়া সেরে আমরা তিন গ্রুপে ফিরতি পথ ধরলাম। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। এবার আমার সঙ্গী হলেন আমাদের সবার প্রিয় অমল’দা। যদিও উনি আমার চেয়ে কমপক্ষে ২৫-৩০ বছরের বড় কিন্তু সবাই ওনাকে দাদা বলে, তাই আমিও বলি। পৃথিবীর কমপক্ষে ৪০ টা দেশে ঘুরে বেড়ানো ও বহুভাষাবিদ এই মাড়োয়াড়ি ভদ্র লোকটির সাথে সময় কাটানো সব সময়ই আনন্দ দায়ক। আসার সময় উনি আমাদের টপ বসের সাথে এসেছিলেন। এবার ওনাকে সাথে পেয়ে খুশিতে ফিরতি পথ ধরলাম! ড্রাইভার বলল, স্যার কোন রাস্তা দিয়ে যাব? আমি বললাম তোমার যেদিক দিয়ে ইচ্ছা হয় সেইদিক দিয়েই যাও! আমি এবার আর কিছু বলব না, সকালে বলে ধরা খেয়েছি! ও বলল, স্যার নন্দী পাড়ার পথ দিয়ে যাই? যাও! বলে ওকে সম্মতি দিয়ে অমল’দাকে জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা কেমন দেখলেন সবকিছু? সুকান্ত, তোমাদের প্রডাক্টের দাম যদি ঠিক না থাকে তাহলে কিভাবে ব্যবসা করব? আমি বললাম, দাম তো আর আমার হাতে না, ওটা তো নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারের উপর। ওখানে দাম বাড়লে আমরা কি করব? শোন আমি সব খবরই রাখি, বলেই তার বুক পকেট থেকে তার প্রায় দশ বছরের পুরনো সেই টেড-মার্ক ছোট ক্যালকুলেটর বের করে হিসাব করতে শুরু করলেন। আমি বললাম, দাদা ব্যবসার কথা আজ থাক, কাল অফিসে এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

কাচপুর ব্রিজের আগেই রাস্তা ক্রস করে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে হয়ে বাইপাস দিয়ে গেণ্ডারিয়া ব্রিজ পার হয়ে চলে এসেছি। সেই রাস্তা থেকে ডান দিকের ছোট রাস্তায় চলে এসে নন্দী পাড়ার রাস্তা ধরলাম। রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট দেখেই আমি প্রমাদ গুনলাম। একটু একটু করে চলেই একসময় গাড়ী থেমে গেল।

দাদা বললেন, কি হল? আমি বললাম, জ্যামে আটকা পড়লাম। কতক্ষণ থাকবে এই জ্যাম? কতক্ষণে ঢাকায় যাব? গুলশানের সাজনা রেস্টুরেন্টে আমার জন্য একজন বসে আছে। সন্ধ্যা ৭টায় ওনাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ করেছি, এখন বাজে ৬টা, ঠিক টাইমে পৌঁছাতে পারবো তো? এক নাগাড়ে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন অমলদা। আমি ওনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, দাদা, আপনার যেকোন সোর্সিং আমি এখানে বসেই করে দেব তা যত কঠিনই হোক কিন্তু আমাকে ঢাকার ট্রাফিক জ্যাম নিয়ে কোন প্রশ্ন করবেন না, এর উত্তর আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। আর আপনার অতিথি যদি বাংলাদেশি হন তাহলে ওনাকে বলে দিন আমরা জ্যামে আটকা পড়েছি। তাহলে দেখবেন, সে ঠিকই দুই ঘন্টা পড়ে রেস্টুরেন্টে হাজির হবেন, আমাদের অভ্যাস আছে, এটা নিয়ে আপনি একদম চিন্তিত হবেন না।

একঘণ্টা ধরে একই জায়গায় গাড়ী আঁটকে আছে। নট নড়ন চড়ন! দাদা বিরক্ত হয়ে বললেন, সকালে দুই ঘণ্টা, এখন অলরেডি দেড় ঘন্টা গেছে, আপনাদের দেশ কিভাবে চলছে? আমি বললাম, এই যেমন দেখছেন? দেখুন দাদা, আপনি স্বচক্ষে সব দেখে যাচ্ছেন, শিপমেন্ট দিতে দেরি হলে আমাকে আর কিছু বলতে পারবেন না, প্রেশার দিতে পারবেন না, বসকে ফোন করে আমাকে আর সান্টিং খাওয়াতে পারবেন না, ঠিক আছে?

তা না হয় মানলাম কিন্তু আপনারা কাজ কিভাবে করেন? ট্র্যাফিক জ্যামেই তো দিন পার। আপনাদের সরকারের তো এই সমস্যাটা আগে সমাধান করা দরকার।

আমাদের কথা বাদ দেন, আপনাদের সরকারের কথা বলুন, ওনারা কি করছে? আমি বললাম।

সব নেতাদের ধরে ঠেঙ্গানো দরকার, জানেন তো সুইস ব্যাংকে সবচেয়ে বেশী টাকা হচ্ছে আমার দেশীদের আর এর বেশির ভাগই হচ্ছে নেতাদের চুরি করা টাকা! চীনা নেতাদের পা চাটতে হবে আমাদের নেতাদের। তাহলে যদি ওরা কিছু শেখে। আমাদের প্রধান সমস্যাই হচ্ছে আমাদের নেতারা! -অমলদা বললেন।

আমি বললাম, আপনার সাথে একমত, আমাদের দেশের সমস্যাও একই। এসব থাক দাদা, আচ্ছা বলুন তো অনেকদিন ধরেই শুনছি আজ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, এ নিয়ে কত হৈ চৈ কিন্তু এর কোন নমুনা তো দেখতে পাচ্ছি না এখনো।

অমলদা বললেন, কি বলেন, সকালে দুই ঘন্টা আর এখন বাজে রাত নয়টা মানে প্রায় তিন ঘন্টা, সব মিলিয়ে একদিনে পাঁচ ঘন্টা রাস্তায় নষ্ট করার পরেও আপনি পৃথিবী ধ্বংসের নমুনা দেখেতে পাচ্ছেন না?