ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

 

গতকাল, ২৭ ডিসেম্বর ২০১২। অবশেষে বনানী রেলক্রসিং ওভারপাসটা উদ্বোধন করলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সরকারের আমলেই এই প্রজেক্টের পরিকল্পনা, বাজেট বরাদ্দ সহ যাবতীয় কাজ সময়মত শেষ হয়েছে। এটা একটা ভাল লক্ষণ এবং এই প্রকল্পের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকলে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই প্রজেক্ট তৈরির মূল দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর মীর-আক্তার কন্সট্রাকশন লিঃ।

এই কাজটা খুবই দ্রুত শেষ হয়েছে, যদিও এর আর একটা পার্ট আছে আর সেটা হলো বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভার। যা এয়ারপোর্ট রোডকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের উপর দিয়ে মাটিকাটা তথা জিয়া কলোনি হয়ে মিরপুরকে সংযুক্ত করেছে। এটাই এই কম্বাইন্ড প্রজেক্টের মুল অংশ, যার কাজ এখনো শেষ হয়নি। মনে হয় আরও কিছুদিন লাগবে এটা তৈরী হতে। তবে আশার কথা এই যে, এর কাজও দ্রুত এগুচ্ছে।

আমরা যারা প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করি, এই উদ্বোধনের খবর শুনে খুবই খুশি হয়েছি কারণ যেদিন থেকে এই ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই আমরা এর তৈরি জনিত কারণে যানজটে ভুগছিলাম। আমরা এই দুর্ভোগ মেনে নিয়েছিলাম সুন্দর আগামীর জন্য। অবশেষে সেই ক্ষণ এলো! তাই গতকাল বিকেলে অফিস থেকে ফেরার সময় প্রগতি সরণি-গুলশানঃ২-বনানী হয়ে না এসে, প্রগতি সরণি-কুড়িল-এয়ারপোর্ট রোড ধরে গাড়ি চালাতে গাড়ির ড্রাইভারকে বললাম।

এয়ারপোর্ট রোডে এসেই আমরা প্রমাদ গুনলাম! যা ভেবেছিলাম চোখের সামনে তাই দেখতে পাচ্ছি। যতদূর চোখ যায় গাড়ি আর গাড়ি এবং যথারীতি সবগুলোই রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘন্টা খানেক সময় নিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে সদ্য উদ্বোধন কৃত বনানী রেলক্রসিং ওভারপাসের উপরে ওঠার পর আমদের গাড়ি আবার জ্যামে আটকে গেল। উপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পেলাম, সব গাড়ি এয়ারপোর্ট রোডের বনানী-বনানী DOHS ক্রসিং আটকে যাচ্ছে, এটাই আমরা আগাম ধারণা করেছিলাম। আমাদের ধারণা সত্যি হওয়ায় নতুন করে কষ্ট পেলাম। অর্থাৎ আমাদের সামনে নতুন বিপদ হয়ে দাঁড়ালো এই ক্রসিং।

এবার মহাখালী ফ্লাইওভার ও বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভারের মাঝখানে পথ আটকিয়ে দাঁড়াচ্ছে এই ক্রসিংটা। অচিরেই, গুলশান থেকে বের হওয়া গাড়িকে এয়ারপোর্ট রোড ক্রস করে বনানী-DOHS ও ডানে এয়ারপোর্ট তথা উত্তরা অভিমুখে যাওয়ার এবং মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে নেমে বনানী পর্যন্ত এসে, সেখান থেকে ডানে মোড় নিয়ে গুলশান-গামী গাড়ি গুলোর বিকল্প পথের ব্যবস্থা করে, এই ক্রসিংটা বন্ধ করা না হলে, নতুন ওভারপাসটি থেকে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। একই সাথে এই রোডে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদর দফতরের সামনের ছোট ক্রসিংটাও বন্ধ করতে হবে। তাতে করে অল্প সময়ের মধ্যে আগের চেয়ে বেশী সংখ্যক গাড়ি ফার্মগেট–বিজয় সরণি থেকে উত্তরা অভিমুখে বের হয়ে যেতে পারবে। আর এটা হলে নিশ্চিত ভাবেই ঢাকার ভিতরের রাস্তার উপর গাড়ির চাপ কমবে এবং এর কিছুটা হলেও পজিটিভ প্রভাব পড়বে পুড়ো ঢাকা সিটিতে।

মোটকথা রাস্তায় বিশেষ করে প্রাইভেট কারের অবস্থানের সময় কমে যাবে। আর কে না জানে, ঢাকার ট্র্যাফিক জ্যামের মুল খলনায়কই হচ্ছে এই প্রাইভেট কার। একটা দিক বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় আর তা হল এই প্রাইভেট কার-এর মালিক গন কিন্তু বেশীক্ষণ রাস্তায় থাকতে চান না, এরা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর বেশিরভাব ক্ষেত্রেই গাড়িটার স্থান হয় বাড়ির বা অফিসের গ্যারেজে। তাই যতদ্রুত তাদের গ্যারেজে পাঠানো যাবে ততই রাস্তার উপর চাপ কমবে। সবচেয়ে ভাল হত যদি একই সাথে এর সংখ্যা কমানো বা নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, জরুরী ভিত্তিতে এয়ারপোর্ট রোডের পূর্বপাশ দিয়ে মাছরাঙা টিভি’র হেড অফিস থেকে নৌবাহিনীর সদর দফতর হয়ে মহাখালী বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরি করা যেতে পারে। এর জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও আছে। হয়ত সেতু ভবন আর কিছু ব্যক্তিগত বিল্ডিং ভাঙ্গা পড়বে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিয়ে কাজটা করা যেতে পারে।

অপরদিকে এই রোডের পশ্চিম পাশে মহাখালী থেকে বনানী পর্যন্ত কার পার্কিং বিহীন যে সকল বিল্ডিং আছে তাদের কার পার্কিং-এর জায়গা করতে বাধ্য করার সাথে সাথে এই সকল বিল্ডিং-এর নীচতলায় স্থাপিত সব দোকান, রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। কারণ দোকান মানেই রাস্তার উপর মালামালের ওঠানো-নামানো আর সেটা করতে যেয়ে রাস্তার একটা লেন সব সময় বন্ধ থাকে।

রাস্তা মানেই দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আমাদের কালচারে এই সংযোজনই আমাদের যানজটকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। মহাখালী বাস স্ট্যান্ড’টার অবস্থান নিয়ে এখনই ভাবা উচিত। সবচেয়ে ভাল হত যদি এটাকে আব্দুল্লাহপুর বা তার আশেপাশে সরিয়ে নেওয়া যেত।

দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট বিহীন রাস্তা ঢাকাতে দুর্লভ, রাস্তা সে বড় হোক আর ছোট হোক, তাতে দোকান-পাট আছেই। এইসবে মালামাল ওঠানো নামানো করতে যেয়ে রিক্সা-ভ্যান, ঠেলাগাড়ি, রিক্সা, পিকআপ-ভ্যান, ট্রাক প্রভৃতি রাস্তায় দাঁড়াবেই। আর সেটা করতে যেয়ে দেখা যায় অধিকাংশ রাস্তারই বাম পাশের প্রথম লেনটা ব্যবহারই হয় না। যেমন মিরপুর-১০ গোল চত্বর থেকে তালতলা পর্যন্ত রাস্তার একটা লেন কখনো গাড়ি চলাচলের জন্য ব্যবহার হয় না অর্থাৎ এই রাস্তার দুই দিক মিলিয়ে মোট ছয় লেনের দুই লেন ব্যবহৃত হয় মালামাল ওঠানো নামানোর কাজে। ফলে ঢাকায় যতটুকু রাস্তা আছে তার তিন ভাগের এক ভাগ মুল কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এমনিতেই ঢাকাতে যতটুকু রাস্তা আছে তা তার প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তারপরে সেই রাস্তাটুকুও যদি তার মুল কাজে ব্যবহার না হয়, তাহলে জ্যাম তো বাড়বেই। একই অবস্থা প্রগতি সরণিতে, শ্যামলী-ধানমন্ডি, গুলশানঃ২-বনানী, প্রেসক্লাব-শাপলা চত্বর রোডে। এক কথায় পুড়ো ঢাকা জুড়ে একই অবস্থা।

অপরদিকে যে সকল রাস্তার পাশে ফুটপাত ঘেঁষে বিল্ডিং করতে দেওয়া হয়নি বা ওয়াল দিয়ে ঘেরা, সেই সকল রাস্তা পুরোটা ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তাতে বাধা বিহীন ভাবে গাড়ি চলাচলের কারণে জ্যাম প্রায় দেখাই যায় না। যেমন আগারগাও থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্যন্ত পুড়ো রাস্তাটা ওয়াল/ফুটপাত দিয়ে আটকানোর কারণে পুড়ো রাস্তাটিই গাড়ি চলাচলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। একই রকম দেখা যায় জাহাঙ্গীর গেট থেকে বিজয় সরণী, বনানী থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত, মিন্টু রোড প্রভৃতি রাস্তা গুলোতে। অর্থাৎ দেখা যায় যে সকল রাস্তা পুরোটা ব্যবহার হয় সেখানে অপ্রত্যাশিত জ্যাম হয় না।

কথা হচ্ছে, শুধু ফ্লাইওভার বানালেই চলবে না, সেই ফ্লাইওভার থেকে গাড়ি নেমে যেন বাধা বিহীন ভাবে চলতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভার হয়ত আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে চালু হবে। যা ঢাকাকে পূর্ব–পশ্চিমে সংযুক্ত করবে। এই ফ্লাইওভারের পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটা ভাল পরিকল্পনা। কারণ ঢাকার মুল রাস্তা গুলো সবই উত্তর–দক্ষিণ মুখী। যার কারণে কোন গাড়িকে গাবতলি বা মিরপুর বা মোহাম্মদপুর থেকে এয়ারপোর্ট রোডে বা প্রগতি সরণিতে আসতে হলে তাকে অবশ্যই বিজয় সরণি হয়ে মহাখালীর উপর দিয়ে আসতে হবে। এই ফ্লাইওভারটি চালু হলে সেটা আর লাগবে না, ফলে বিজয় সরণি ও মহাখালীর উপর চাপ কমার পাশাপাশি এই এলাকায় যানজট কমবে বলে আমরা আসা করতে পারি।

অপরদিকে বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভার চালু হওয়ার সাথে সাথে যে সকল গাড়ি উত্তরা থেকে মিরপুর যেত, তাদের আর বনানী পর্যন্ত আসতে হবে না, তারা সরাসরি মাটিকাটা বা জিয়া কলোনিতে বা মিরপুর পর্যন্ত যেতে পারবে কিন্তু তারপর কি হবে? হ্যাঁ এতে বনানী-মহাখালীতে গাড়ির চাপ কিছুটা কমবে কিন্তু মিরপুর-১৪, মিরপুর-১২, মিরপুর-১০ এর রাস্তা গুলোতে চাপ বাড়বে, যা ইতিমধ্যেই ওভার লোডেড অর্থাৎ এখানেও ভয়াবহ যানজট হবে।

আমি দেখেছি, মাটিকাটা, কালাপানি ও মিরপুরের ১০, ১১, ১২ এলাকা গুলোর ভিতরে প্রচুর চওড়া রাস্তা আন্ডার ডেভেলপড, বেদখলি অবস্থায় আছে, এই সকল রাস্তা গুলোকে খুবই অল্প খরচে ও কম সময়ের মধ্যে দু-পাশ মিলিয়ে ৪, ৬ ও ৮ লেনের রাস্তায় পরিণত করা সম্ভব। যা গাড়ির জট ছাড়াতে সাহায্য করার পাশাপাশি সেগুলোকে বিভিন্ন মুখী করে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করবে এবং রাস্তার ধারণ ক্ষমতা বাড়বে। তাই মিরপুর এলাকায় আগামী দিনের ভয়াবহ ট্র্যাফিক জ্যাম এড়াতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। না হলে বনানী-মিরপুর ফ্লাইওভারের উপযোগিতা হ্রাস পাবে।

সবশেষে বলতে ইচ্ছা করছে, ফ্লাইওভার তো হচ্ছে কিন্তু তাতে কি ট্রাফিক জ্যাম কমবে?