ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

গোহাটিতে আজও প্রচণ্ড শীত পড়েছে। যদিও শীত আমার ভীষণ প্রিয়, তারপরেও বাইরে বের হতে ভয় ভয় করছে। খুব ভোরেই নিজাম ভাই, আমাদের নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার ইম্পোরটার, গেছেন আমাদের বসের সাথে দেখা করতে। শীতের পোশাককে যথারীতি প্যাকেট হয়ে বের হয়েও তিনি আবার রুমে ফিরে এসেছিলেন আরও শীতের কাপড়চোপড় নিতে। তার কাছ থেকেই থেকেই জানতে পাড়লাম বাইরের শীতের অবস্থা সম্পর্কে। তবে রুমে আমার তেমন শীত লাগছে না। বেডে একা একা শুয়ে আমার স্বভাবমতো টিভি রিমোটের বাটন অনবরত টিপতে থাকলাম। কোন চ্যানেলই তেমন পছন্দ হচ্ছে না। এক পর্যায়ে, একটা মিউজিক চ্যানেলে এসে থিতু হলাম।

ভোর থেকেই হোটেল রুমের ওয়াল টিভিতে মিউজিক চ্যানেলটিতে একনাগাড়ে হিন্দি গান দেখে চলেছি। অনেকদিন পর টিভিতে এত সময় ধরে হিন্দি গান দেখছি। “গান দেখছি” কথাটা আসলে কেমন যেন শোনাচ্ছে? আসলে কথাটা হওয়া উচিত ছিল টিভিতে হিন্দি ছবির “গান শুনছি এবং এর পিকচারাইজেশন দেখছি”। কিন্তু তা বলতে পারছি না, কারণ বম্বে ফিল্মের হিন্দি গান, আজকাল আর শ্রোতাকে শোনানোর জন্য তৈরী করা হয় না, তৈরি হয় দর্শকদের দেখানোর জন্য।

ইতিমধ্যেই একনাগাড়ে প্রায় “শ” খানেক লেটেস্ট হিন্দি ছবির গান দেখে ফেলেছি। সব গান একই উদ্দেশ্য নিয়ে বানানো হয়েছে আর তা হল সেক্স, বাণিজ্য আর টাকা। ভারতীয় সংস্কৃতি এখানে সম্পূর্ণ রূপে অনুপস্থিত। সব গানেই দর্শককে তা শোনানোর চাইতে দেখানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেয়েরা এখানে সম্পূর্ণ পণ্য-রূপে উপস্থাপিত হয়েছে এবং তা সম্ভবত ভাল দামে বিকচ্ছেও। না হলে, এত এত মেয়ে কোথা থেকে আসছে? আগে যেখানে একটা গানে একজন নায়িকা হলেই চলত, আজ সেখানে একটা গানে নায়িকার পাশাপাশি এক্সট্রা নামধারী কমপক্ষে ১০ জন মেয়ের উপস্থিতি রয়েছে। যারা নায়িকাদের চেয়েও বেশী উলঙ্গ, এক্সপ্রেশন ও অঙ্গভঙ্গিতেও চরম অশ্লীল। হয়ত ছবির প্রযোজকরা নায়িকাদের চেয়েও কমমূল্যে এদের ক্যামেরার সামনে কাপড় খোলাতে পারছে। আর পরিচালকরাও, শিল্প ভুলে, ছবি হিটের নেশায় ক্যামেরার ফ্রেমে এখন আর একটা মেয়েকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না, হিটের জন্য তাদের চাই, আরও বেশি বেশি উলঙ্গ মেয়ে। যারা নায়িকাদের চেয়েও বেশী কিছু দিবে দর্শকদের! এখন একটা গানের শুটিঙে ১০ থেকে ২০ জন মেয়ে লাগছে, কাল হয়তবা ১০০ জন মেয়ে লাগবে, তারপর কি হবে? বিগ বসের মত সানি লিয়ন’রা কি সরাসরি সালমানদের নিয়ে নেমে পড়বে? আর পূজা ভাট’রা কি নিবে তা পরিচালনার দায়িত্ব? এতে অবশ্য টাকা বিনিয়োগের লোকের অভাব হবে না। ভারতীয় সংস্কৃতি রক্ষা আর দেশে ধর্ষণ কাণ্ড ঠেকাতে না পারলেও “ভারতীয় গণতন্ত্র” এ খাতে বিনিয়োগের প্রোটেকশন দেওয়ার জন্য তো রীতিমত এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে! আফটার অল শরীর দেখানটাও এখন মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর শিল্পের পর্যায়ে পরে!

গান গুলো দেখে মনে হচ্ছে- কারিনা, ক্যাটরিনা, জেরিন, মালাইকা, বিদ্যা বালান’রা আজ শুধুই পণ্য। সবাই যেন কাপড় খোলায় ব্যস্ত। এক্ষেত্রে ব্যাপক কম্পিটিশন। কে কার চেয়ে বেশি খুলতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রথমে ছিল শাড়ি খোলার প্রতিযোগিতা, তারপর পেটিকোট আর ব্লাউজ, এখন অবশিষ্ট আছে প্যান্টি আর ব্রা। আশা করা যায়, আঁচিরেই এরা আরও নিচে নেমে যাবে! আর নাচ, সেখান থেকে শিল্প সেই কবেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ক্যাটরিনা’রা এখন জানে শুধু পিটি টাইপের এক্সারসাইজ আর অর্ধ নগ্ন স্তন যুগল ঝাঁকানো! ইঙ্গিত স্পষ্ট, পারলে ঝাঁকুনি থামাও !!

সিনিয়র নায়িকারা যখন এইসব করতে থাকে, তখন জুনিয়রদের বা উঠতি নায়িকাদের সামনে বিকল্প বলে কিছু থাকে না। পরিচালকরাও তাদের কাছে আরও বেশি কিছু আশা করেন! উঠতিদের ক্যারিয়ারে আরও প্লাস প্লাস যোগ করতে বাধ্য বা উৎসাহিত করেন তারা!

মজার বিষয় হচ্ছে, কাপড় কিন্তু এখন শুধু মেয়েরাই খুলছে না, ছেলেরাও মানে নায়করাও খুলছে। সালমান খান এর নাটের গুরু। ওর দেখা দেখি জন আব্রাহাম, অজয় দেবঘন, শাহরুখ খান’রাও আজ কাপড় খুলছে। নিজেদের উলঙ্গ শরীর নিয়ে ক্যামেরার সামনে উপস্থাপন করছে। এখানেও বাণিজ্য! ছেলেরা যেমন মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখে মনে মনে পুলকিত হয়! মেয়েরাও নিশ্চয় পুরুষের নগ্ন শরীর দেখে একই রকম অনুভব করে! তার মানে দাঁড়াচ্ছে, এই সেক্টরেও গানের তথা ছবির ভাল বাজার আছে। হয়ত “গে” রাও পুরুষের শরীর দেখতে পছন্দ করে! পৃথিবীতে তো এদের সংখ্যাও আজ কম না! অর্থাৎ এখানেও একটা বড় বাজারের উপস্থিতি রয়েছে।

বর্তমানে বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন আর একটা স্টাইল এখানে শুরু হয়েছে, আর তা হল, ছবিতে নানা কুকীর্তি করে নায়ক-নায়িকারা ফুল-ফলের-উপঢৌকনের ডালি নিয়ে হাজির হচ্ছে বিভিন্ন মন্দির-দরগায়। সৃষ্টিকর্তার কাছে ওদের চাওয়া একটাই, মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ছবিটি যেন বক্স অফিসের চার্টে সবার উপরে থাকে। এদের পাল্লায় পড়ে আর সবকিছু জেনেশুনে সৃষ্টিকর্তাও বোধ হয় আছেন বড় বিপদে! এর অবশ্য আর একটি উদ্দেশ্য আছে- আর সেটা হল, “সাধারণ মানুষকে এই বলে বোঝানো যে, আমরা যখন তখন কাপড় খুললেও কি হবে? আসলে দ্যাখো! আমরা কত ধার্মিক!” অর্থাৎ এখানেও প্রচার ও বাজারই মূলত টার্গেট ওদের! ধর্ম, উপাসনা এগুলো ব্যবহার্য উপাদান ছাড়া আর কিছু নয় ওদের কাছে! ভাল সেলস এন্ড মার্কেটিং টুলস এগুলো!

আমার ধারণা, এসবের মুলে রয়েছে বাজার অর্থনীতির নীতি-হীন বেড়ে চলা। আজ সবকিছুই বিক্রয়যোগ্য পণ্য। এখানে সব সময় খোঁজা হচ্ছে নতুন বাজার আর তার জন্য নতুন পণ্য। কে না জানে, নতুন বাজার মানেই পণ্যের বিক্রয় প্রসারের সুযোগ। আর বিক্রয় মানেই রেভেনিউ বৃদ্ধি, ব্যবসায় ক্যাশ ইন ফ্লো। সবকিছু মিলিয়ে এর একটাই অর্থ ও উদ্দেশ্য, আর সেটা হল- টাকা, টাকা আর শেষ পর্যন্ত টাকা! ক্যাপিটাল মার্কেটে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি!

দিল্লীতে ধর্ষিত মেয়েটিও আজ পণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে! হয়তবা, ইতিমধ্যেই বম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে(!) কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে, কার আগে কে এই ঘটনাটা নিয়ে ছবি বানাবে! আর কে হবে এর নায়ক-নায়িকা আর ভিলেন! আমি নিশ্চিত এই ছবি বক্স অফিসে সুপার হিট হবে, অভাব হবে না সিনেমা হল বোঝাই দর্শকের এবং তা থেকে ব্যবসায়ীরাও ব্যাপক মুনাফা বের করে নিবে! কিন্তু যে পিতা-মাতা তাদের মেয়ে হারিয়েছে, যে প্রেমিক তার ভালবাসার প্রেয়সীকে হারিয়েছে, যে ভাই তার বোনকে হারিয়েছে তাদের বেদনা এতে কমবে না, বরঞ্চ বেড়ে যাবে আরও বহুগুণ। আমার মনে হয় না, বাজার অর্থনীতি এইসব বিবেচনা করবে?

অতএব, জয় হোক বাজার অর্থনীতির! যেখানে সেক্স, হিন্দি ছবি আর সৃষ্টিকর্তা ভাল দামে বিকচ্ছে!

০৮-০৯/০১/২০১3