ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

কি আনন্দ! কি আনন্দ! চারদিক যেন আনন্দ ঝরে পড়ছে! শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে যেন স্বর্গ থেকে আনন্দ ঝরে পড়ছে! মনে হচ্ছে কোন এক অচেনা আনন্দ ভুবনে এসে হাজির হয়েছি। মানুষ গুলোকে যদিও চেনা চেনা লাগছে, তাদের সুরগুলোকে পরিচিত মনে হচ্ছে! তারপরেও যেন সবই অচেনা! আমি কি স্বপ্ন দেখছি! এত আনন্দ, আমি কখনো পাইনি! মানুষকেও এত আনন্দ কখনো পেতে দেখেনি! আজ সন্ধ্যায় শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে চার ঘন্টা একনাগাড়ে একাকী ঠাই দাঁড়িয়ে থেকে আমার এই অনুভূতি হল। এ এক পরম অভিজ্ঞতা। এ এক মুক্তিযুদ্ধের আনন্দ! যা হয়ত, সৌভাগ্যবানরাও জীবনে একবারই পায়।

শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে আমাদের নতুন পথের দিশারী “নতুন প্রজন্ম” আস্তানা গেড়েছে আর পণ করেছে- সব রাজাকারকে ফাঁসিতে না ঝুলিয়ে এবার তারা ঘরে ফিরবে না। তাদের পূর্বসূরিরা দেশ স্বাধীন করার জন্য ৯ মাস যুদ্ধ করেছিল, এরা প্রয়োজনে ১৮ মাস শাহবাগের রাস্তায় পড়ে থাকবে। তবুও রাজাকারদের শেষ দেখে ছাড়বে। ওদের বাড়বাড়ন্ত ছাড়াবে, কোমর ভাঙবে! এ এক কঠিন পণ! যারা ভাবছেন, বাঙ্গালীর এই পোলাপানগুলা বেশী কথা কয়, এদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না। তারা এসে দেখে যান! কিভাবে তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা হাতে হাত রেখে আপন ভাই বোনের মত টানা ৬ দিন অলরেডি কাটিয়ে দিয়েছে এই খোলা রাস্তায়। যে সব ছেলে-মেয়েরা হয়ত বাবা-মা’র আদর-শাসনে রাত ৭-৮ টার বেশী বাসার বাইরে থাকারই অনুমতি পাইনি কখনো? আজ তারাই রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে- খাবার, লেপ-বালিশ কম্বল বিহীন ভাবে। ভাবা যায়? কি এক অদ্ভুত চেতনায় আচ্ছন্ন ওরা! নিশ্চয় কোন এক অলৌকিক শক্তি ভর করেছে ওদের উপর! না হলে যারা সারাদিন পড়াশুনার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ফেসবুক, ব্লগ, ক্রিকেট নিয়েই পড়ে থাকতো, ভিন্ন উচ্চারণে বাংলা-ইংলিশ মিলিয়ে কথা বলত, রাজনীতিকে অপছন্দ করত, তারাই আজ কথা নেই, বার্তা নেই, হুট করে একযোগে কোথা থেকে এসে এখানে জোড় হলো! মিরাকল! সত্যিই মিরাকল!

কে নেই এই নতুন প্রজন্মের শুরু করা দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে? শিশু, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতি, মধ্যবয়সী, প্রবীণ থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী, পেশারই মানুষ আছে এখানে! কেউ বসে আছে, কেউ হাঁটছে, কেউবা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায় ফুটপাতে কিন্তু কারোর মধ্যেই কোন তাড়াহুড়া নেই, যেন সবার হাতে অফুরন্ত সময়! যে বাঙ্গালী এক সেকেন্ডের জন্য কাউকে আগে যেতে দেয় না, গুঁতাগুঁতি ছাড়া চলতে পারে না, তারাই আজ কোন এক দৈববলে আইন মানতে শুরু করেছে। একে অপরকে ছাড় দিতে শিখেছে। আমি চার ঘন্টায় একুশের বইমেলা থেকে রূপসী বাংলার মোড় পর্যন্ত হাঁটলাম হাজার হাজার উৎসব মুখর মানুষের মধ্য দিয়ে কিন্তু কারও সাথে আমার একটু ধাক্কা পর্যন্ত লাগেনি, ঠেলাঠেলি হয়নি একবারও। ছিনতাই, পকেটমারের কথা তো মনেও হয়নি একবারের জন্য, ভাবা যায়?

কি নেই এখানে? রাস্তায় কোথাও বাদ্যের সাথে সমস্বরে কোরাস হচ্ছে, কোথাও মোমের বাতি জ্বেলে অপেক্ষায় রত যোদ্ধারা, কোথাও বন্দী মানচিত্রকে মুক্তির ব্রত নিয়ে বসে আছে ছেলে মেয়েরা, কোথাও হচ্ছে নাটক-গান। একদল মশাল মিছিল করছে তো, আর এক দল করছে ঝাড়ু মিছিল! কেউবা ঝোলাচ্ছে ফাঁসির দড়িতে রাজাকারদের! সবাই আনন্দিত! সব জায়গায় আনন্দ! যেন আনন্দ ঝরে পড়ছে- ঝর ঝর করে … পড়ুক! আরও বেশী করে পড়ুক! বন্যা হয়ে যাক! দুই-একটা আনন্দের সাইক্লোন হয়ে গেলে ক্ষতি কি? ধুয়ে যাক সব পাপাচারী রাজাকাররা! মুছে যাক ওরা বাংলার মাটি থেকেও!

আসুন! যারা এখনো কাছে থেকেও এই আনন্দর ভাগ পাননি বা পেতে চাননি বা বদহজমের ভয় পান। তারা বসে যান দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য! আর হাতে নিন ঢোল, মাদল, করতাল আর তা না থাকলে হাতের কাছের থালা-বাসুন, ডেসকি-পাতিল তো রয়েছেই? তাই দিয়ে বাজাতে থাকুন আর আমার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে জোড়ে জোড়ে কোরাস করুন …..

জয় বাংলা … জয় বাংলা!
জয় মুক্তিযুদ্ধ … জয় মুক্তিযুদ্ধ!

আমি কে? তুমি কে? … বাঙ্গালী! বাঙ্গালী!