ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

আহ! পদ্মা সেতু! আমাদের পদ্মা সেতু! কত কত আশা পেলাম! কত কত স্বপ্ন দেখলাম! কত কত হালি মনকলা যে খেলাম এই পদ্মা সেতু নিয়ে তা লিখে শেষ করা যাবে না! এই “আশা পাওয়া”, “স্বপ্ন দেখা” আর “মনে মনে মনকলা খাওয়া”র যেন শেষ নেই! এখন আমাদের নেতারা আমাদের সামনে ঝুলানো সেই আশা, স্বপ্ন আর মনকলা গুলোকে বর্তমান থেকে কেঁড়ে নিয়ে ছুড়ে দিচ্ছে অজানা ভবিষ্যতের দিকে দিকে, যা গত ৪ বছর আগেও অজানা ভবিষ্যতই ছিল। ভাবছি, এই মনকলাগুলো কখন না আবার মূলা হয়ে যায়? শুনেছি বোঝাবাহী গাধাদের হাঁটানোর জন্য তার মালিকরা গাধার মাথার সামনে লাঠিতে একটা করে মুলা ঝুলিয়ে দেয় আর সেই মূলা খাওয়ার লোভে গাধাগুলো শুধুই সামনের দিকে ছুটতে থাকে, যদিও কখনোই এর নাগাল পায় না, তবুও ওরা না বুঝেই এর পিছনে ছুটতে থাকে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরাও ক্রমাগত গাধাতে রূপান্তরিত হচ্ছি! আমাদের নেতারা আমাদের মাথার সাথে পদ্মা সেতু নামীয় একটা মূলা ঝুলিয়ে দিয়েছে আর আমরা সেটা খাওয়ার জন্য শুধুই ছুটছি।

প্রথমে শুনলাম, আমরা ক্ষমতায় গেলে পদ্মা সেতু হবে। ক্ষমতায় যাওয়ার পর শুনলাম, “পদ্মা সেতু” শুধু সড়ক সেতুই হবে না, এতে রেলও থাকবে, যার মাধ্যমে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার দিগন্তই পাল্টে দেওয়া হবে! দিগন্ত পাল্টানো সেই সেতুর মডেলও আমাদের দেখানো হলো! তা দেখে আমরা আম-কাঁঠাল-বাঙ্গী জনতা তো মহা খুশি! আমরা যে মানুষ তা ভুলে বাঁদরের মত লাফাতে লাফাতে মনকলা খেতে শুরু করলাম! আর লাফাতে লাফাতেই শুনলাম, যে করেই হোক এই সরকারের আমলেই এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করা হবে মানে সেতু বানানো হবে। তারপর নানা জটিল কথাবার্তা বলার পর আমাদের জানানো হলো-এই সরকারের আমলেই এর কাজ শুরু করা হবে। তারপরেও আমরা লাফানো বন্ধ করলাম না! কয়েকদিন আগে শুনলাম বিশ্বব্যাংক আমাদের মন্ত্রী-নেতাদের দুর্নীতির আঁচ করতে পেরে ঋণ প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। শুনে আমরা লাফানো থেকে সাময়িক বিরতি নিলাম। তারপর যেই শুনলাম, বিশ্বব্যাংক টাকা না দিলে আমাদের বয়েই গেছে? মালয়েশিয়া, চিন, ভারত আছে না? ওরা পদ্মা সেতু বানানোর জন্য পিলার গুলো কাঁধে নিয়ে বসে আছে। বলা মাত্রই ওরা এসে টপাটপ তা পদ্মানদীতে ফিট করে মাত্র এক বছরের মধ্যেই সেতু বানিয়ে দিবে। আর ওরা যদি নাও আসে প্রয়োজনে আমরা বালু খেয়ে, চাঁদা তুলে, একবেলা বাজার না করে তা থেকে টাকা বাঁচিয়ে পদ্মা সেতু বানাবো! এটা শোনার সাথে সাথে আমাদের লাফানো আরও বেড়ে গেল। আমাদের মধ্যে যারা কিছুটা চালাক ছিল মানে মানুষের কাছাকাছি গোত্রের ছিল তাদের বুদ্ধি খুলে গেল, সেইসাথে শুরু হয়ে গেল চাঁদা তোলার হিড়িক! এই হিড়িকে রাজশাহীতে যখন একটা বডি পড়ে ডেড হয়ে গেল, তখন কিছুটা ছোট করে আমাদের বলা হলো মানে আসল কথা পেড়ে ফেলা হল, কেন আমাদের ফরেন কারেন্সির রিজার্ভ আছে না? তা ফেলে রেখে লাভ কি? ওখান থেকে টাকা নিয়ে আমরা পদ্মা সেতু বানিয়ে পৃথিবীকে দেখিয়ে দেবো। এই কথা শুনে আর কারো না হোক আমার লাফালাফি বন্ধ হয়ে গেছে কারণ একটা পুড়নো লেখার কথা মনে পড়ে গেছে আর তারপর থেকে আমার হাড়ে ভয় ঢুঁকে গেছে।

প্রথমে ফরেন কারেন্সির রিজার্ভ থেকে ডলার নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের জন্য বোয়িং কোম্পানি থেকে নতুন নতুন বিমান কেনা হচ্ছে। এবার সেখান থেকে ডলার নিয়ে পদ্মা সেতু বানানো হবে। সব হিসাব যেন খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে। আর আমার ভয় জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে!!! এই ভয়ের কারণটা যে কি তা এই লিঙ্কে পাবেন!!! অনুগ্রহ করে পড়ে নিবেন!!

তারপর নানা গাঁইগুঁই আর দেশী-বিদেশি হোমরা চোমরাদের দৌড়াদৌড়ির পর, যখন আমরা সত্যি সত্যিই জানলাম, বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে তাদের ঋণ-প্রস্তাব বাতিল করেছে এবং জাইকা আর আইডিবি তাকে অনুসরণ করেছে। তখন আমাদের সবার লাফালাফি একদম বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী–নেতাদের বয়েই গেছে, তাদের চাপাবাজি যেন আরও বেড়ে গেল। তারা বলতে শুরু করলো মালয়েশিয়া এই এলো বলে!

কিন্তু এবার জানা গেল এর আসল তথ্য, আজ আমাদের মাননীয় অর্থমন্ত্রী, পদ্মা সেতুতে মালয়েশিয়ার অর্থায়ন প্রসঙ্গে বলেছেন-

“অনেক ব্যাপার-স্যাপার আছে। পরে বলব। তবে মালয়েশিয়ার অর্থায়নে পদ্মা সেতু করলে খরচ পড়বে অনেক বেশি।”

অপরদিকে নতুন আশার বাণী শুনিয়েছেন-

“পদ্মা সেতু নির্মাণে ১৮০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ বরাদ্দ রাখা হবে। এ জন্য শিগগিরই খোলা হবে একটি বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব (এফসি অ্যাকাউন্ট)।”

এই দুই তথ্যে এইবার বোধ হয় আমাদের হুশ ফিরেছে। না ফিরলে ফেরা উচিত। আর সেটা না হলে আমাদের মানুষ হিসেবে পরিচয় না দিয়ে গাধা হিসেবে পরিচয় দেওয়াটাই যৌক্তিক হবে!

সবশেষে, নিজেকে একটাই প্রশ্ন করতে চাই, আচ্ছা গাধা আর আমরা অপরদিকে মুলা আর পদ্মা সেতু’র মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

তারিখঃ ২৫-২৬/০২/২০১৩