ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

images

 

প্রতিদিনের মত, আজও, আমার চার বছর বয়সী ও একমাত্র মেয়ে, সুতপা, ঘুম থেকে উঠেই ডোরেমন কার্টুন দেখার বায়না শুরু করলো, এটা তার নিত্যদিনের বায়না। আর একবার টিভি সেট চালু হলে তা চলবে মধ্যরাত পর্যন্ত। আমরা কোনভাবেই এথেকে ওর এটেনশন অন্যদিকে সরাতে পারছি না। কতরকম ভাবেই না চেষ্টা করছি, যাতে ওর এই কার্টুন দেখার আসক্তি কিছুটাও কমে, কিন্তু তার সবই নিষ্ফল হয়েছে। উল্টো নিজেরাই ঝামেলায় পড়েছি।

মাঝে প্রায় ছয় মাসের জন্য আমি ডিসের কানেকশন কেটে বাসায় টিভি দেখা বন্ধ রেখেছিলাম, যাতে এই আসক্তি থেকে তাকে দূরে রাখা যায় কিন্তু তা সফল তো হয়নিই উল্টো বিপদ হয়েছিল। ও তখন উপর তলার ফ্লাটে ওর সমবয়সী বান্ধবী ঐশী’দের বাসায় ডেরা গাড়লো। স্কুল থেকে এসেই, সেই যে সকাল বেলায় ঘর থেকে বের হয়ে যেত আর সহজে বাসায় ফিরিয়ে আনা যেত না।

মেয়ে অন্যের বাসায় যেয়ে পড়ে থাকলে কার ভাল লাগে? আমাদেরও ভাল লাগলো না। যদিও ঐশীর বাবা-মা তা ভালভাবেই নিত, তবুও নিজেদের কাছে খারাপ লাগতো। তাই ওকে বাসায় রাখার জন্য ডিস কানেকশন পুনঃ সংযোগ নিলাম গতমাসে। কেবল লাইনের মালিককে এর জন্য এক হাজার টাকা বেশী দিতে হলো, কেন আমি লাইন কেটেছিলাম তার পেনাল্টি হিসেবে।

আর নিজেদের কথাই বলি, টিভি ছাড়া বাসায় কতক্ষণ থাকা যায়? আমি না হয় সারাদিন বাইরে বাইরে থাকি, আসি সেই রাতে, ল্যাপটপ আছে, ইন্টারনেটে ঘোরাফেরা করি, কিন্তু ওর মা সারাদিন বাসায় থাকে, ওর তো সময় কাটে না। যদিও আমি জানি ওরও আর একটা ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি তীব্র আসক্তি আছে যার নাম স্টার প্লাস, কুখ্যাত একটা চ্যানেল, যার শব্দ শুনলেই আমার মাথায় রক্ত চড়ে যায়! ডিস লাইন কাটায় অবশ্য সেটাও একটা হিডেন অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করেছিল।

আজ ভোর বেলায় আমার মেয়ে এই যে টিভি সেটের দখল নিলো, তা চলবে রাতে তাকে জোড় করে ঘুম পাড়ানোর আগ পর্যন্ত। সে যদি পড়তে বা লিখতে বসে, তবুও টিভি সেটে ডোরেমন চলতে হবে, পাশের রুমে গেলে বা বান্ধবী ঐশী’র সাথে খেলার সময়ও তাকে ডোরেমন, নোবিতা, সুজুকাদের কথার শব্দ শুনতে হবে। সে যত দূরে থাকবে টিভি সেটের শব্দও তত জোড়াল করতে হবে, যাতে সে সেই শব্দ ভালভাবে শুনতে পায়। এ এক শোচনীয় অবস্থা।

আমি পাশের রুমে শুয়ে আছি আর বাইরে ঝড় বৃষ্টির শব্দ শুনছি। মাঝে মাঝে মোবাইলের ঘড়িতে সময় দেখছি সেই পারফেক্ট টাইমের জন্য, যখন থেকে আমি অফিসে যাওয়ার প্রিপারেশন নিতে শুরু করবো। ঘুম জড়ানো চোখে গুটি গুটি পায়ে সুতপা আমার ঘরে চলে এসে পাশে বসতেই; আমি আদর করে ওকে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কার্টুন চলছে না মা? ও উত্তর দিলো, না। কালকে কলা কয়টা খেয়েছো মা? ওর এটেনশন ঘুরাতে জিজ্ঞাসা করতেই ও উত্তর দিলো, বলবো না! আমি বললাম, কেন? কাল আমি তোমার জন্য কলা এনেছি, পেয়ারা এনেছি, তাল এনেছি আরো কত কি এনেছি, তারপরেও আমার উপর তোমার এত রাগ? একটা মাম দাও তো মা? আবারো তার না-বাচক উত্তর পেলাম। আমি বললাম, কেন মা, তুমি না, বাবাকে প্রতিদিন একটা করে মাম দাও, আজ দিবে না কেন? বলেই ওকে জোড় করে কাছে টেনে নিয়ে একটু আদর করতে চাইলাম। ও মাথা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে বলল, কাল আর কি কি এনেছ তার সব তুমি বল নাই, সব বল, না হলে তোমার পেট ফাটিয়ে ফেলবো, বলেই ওর মাথা দিয়ে আমার পেটে গুঁতাতে লাগলো। আমি যে বলার সময় বলেছি, আরও কত কি এনেছি, এতে ওর সম্ভবত ধারণা হয়েছে, গতকাল ওর জন্য চকলেটও এনেছি কিন্তু ওকে না বলে তা আমি লুকিয়ে রেখেছি, তাই ওর এই রাগ রাগ ভাব।

ওর গুঁতোতে আমিও ব্যথা পাওয়ার ভান করে ওকে খুশি করার চেষ্টা করলাম এবং খুশি হয়েই সে বলল, ল্যাপটপে ডোরেমন চালিয়ে দাও! তাহলে তোমাকে আমি মাম দিব। আমি এটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিলাম। এতটুকু একটা মেয়ে এরই মধ্যে তার বাবাকে ব্ল্যাক মেইল করা শিখে গেছে। শিখে গেছে গিভ এন্ড টেক! সবই যুগের হাওয়া! আমাদের অত্যধিক আদরও এর একটা কারণ হতে পারে।আবার এও ভাবি; ওকে আদর না দিয়েই বা কি করবো? ও ছাড়া আদর করার আর কেইবা আছে আমাদের?

শুধু টিভি না আমার ল্যাপটপেও অন্যান্য কার্টুন আর মুভির সাথে একটা ডোরেমন মুভিও লোড করা আছে, আর এটা দেখাই আপাতত ওর টার্গেট। অনেকটা বাধ্য হয়েই ল্যাপটপে আমাকে ডোরেমন কার্টুনটা লোড করতে হয়েছে। না হলে মাঝে মাঝে ওকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে ওর মা’র পক্ষে। তাছাড়া ওর মাকেও মাঝে মাঝে টিভি দেখার সুযোগ করে দিতে হয় এবং আমারও সময়ে সময়ে দেশ বিদেশের খররা-খবর, মুভি, ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফী চ্যানেল দেখতে মন চায়। তখন এটা কাজে লাগে। কোন কোন সময় অবশ্য দুটোই দখলে নেয় সে।

২য় পর্ব >>>

বিঃদ্রঃ মেয়ের গল্প লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। অন্যব্লগে দিয়েছিলাম, বন্ধ থাকার কারনে বিডিব্লগে দেওয়া হয়ে ওঠেনি সেই সময়ে, তাই এখানেও দিলাম আর্কাইভে রাখার জন্য! আর লেখাটা একটু বড় হয়ে যাওয়ার কারণে দুই পর্বে ভাগ করলাম।