ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

সকালের এই সময়টাতে চ্যানেলটিতে বিভিন্ন রকমের আয়ুর্বেদিক ঔষধ বিক্রির নামে চলে এক ধান্দাবাজির আসর। অখ্যাত কোম্পানি গুলো টিভি চ্যানেলের চাঙ্ক টাইম কিনে নিয়ে দিনের পর দিন, তাদের বিদঘুটে পণ্যের জন্য সিনেমার পড়তি নায়ক-নায়িকা, অবসর নেওয়া ক্রিকেট খেলোয়াড়দের দিয়ে এমনভাবে “বিজ্ঞাপন গল্প” সাজায় যেন এটা খেলে, মালিশ করলে সব অসুখ হাওয়া হয়ে যাবে। কিছু কিছু ধান্দাবাজী দেখে তো আমি নিজেই থ বনে যাই, এরা “মা লক্ষ্মী”র নামে একধরণের সোনার লকেট বিক্রি করে, এটা কিনে ঘরে রাখলে নাকি “মা লক্ষ্মী” ঘরে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসবে।যত্তোসব! ধর্মের নামে ধান্দাবাজী। এই লকেটে কতটুকু সোনা আছে বা আদৌ আছে কিনা তা যদিও আমি জানি না। তবুও আমি বিশ্বাস করি এতে সোনা নেই, থাকলেও দাম অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে নেই, যারা এগুলো কেনে তারাও তা জানে না। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর- এই প্রবাদটির “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু” অংশটুকুই ক্রেতাদের সন্তুষ্টি আর বিক্রেতাদের বিজ্ঞাপনের মূল অস্ত্র!

ভারতীয় যে চ্যানেলটাতে এই কার্টুনটা বর্তমানে চলে তার নাম হাঙ্গামা। আগে চলতো ডিজনি চ্যানেলে। সেটা জনগণের তীব্র দাবির মুখে সরকার বন্ধ করে দেওয়ার পর এই হাঙ্গামা চ্যানেলটি নতুন করে হাঙ্গামা শুরু করেছে। একটা টিভি চ্যানেলে প্রায় সারাদিন একই কার্টুন চলে, এটা কেমন কথা? অতিসত্বর এই “হাঙ্গামা”টার হাঙ্গামাও বন্ধ করা উচিত।

সরকার সবচেয়ে ভাল করত; যদি আমাদের সব কয়টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে একসাথে বা পর্যায়ক্রমে টেরিস্টরিয়াল ফ্যাসিলিটি দেওয়ার মাধ্যমে সারাদেশে এন্টেনার মাধ্যমে  টিভি দেখার সুযোগ করে দিত। তাহলে একসাথে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। টিভি দেখায় আমরাই হয়ে যেতাম আমাদের নিয়ন্ত্রক, আর বেচে যেত মাসে মাসে একটা খরচের টাকাও। বর্তমানে আমরা “কেবলটিভি” নামক এক মাফিয়া নেটওয়ার্কের আওতায় আছি। পুরো হোম এন্টারটেইনমেন্ট’টা এদের হাতে বন্দী। কারো কিছু করারও নেই, বলারও নেই। মাঝখানে কিছুদিন বাধ্য হয়ে বিটিভি দেখেছিলাম। ওটা দেখে যা বুঝলাম; এই বিটিভি’র সাথে জড়িত মানুষগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সব চেয়ে বড় তেলবাজ। এর খবর থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই, আসলে দেশে কি ঘটছে এবং সামনে কি ঘটবে? আর যুগ যুগ ধরে এরাও টিকে আছে, যখন যেমন তখন তেমন তেল মারো’র ভিত্তিতে।

পাশের রুমে টিভিতে ডোরেমন চলছে, ভেসে আসছে, নোবিতা, সুজুকা, জীয়ানদের গলা, চলছে তাদের ছেলেমানুষি কার্যকলাপ, অঙ্গভঙ্গি, চেঁচামিচি, আর নিত্য নতুন গেজেটের ভেল্কিবাজি যা বের হয় নোবিতার বিপদের সময় ডোরেমনের পেটপকেট থেকে। আর এগুলোর সবই বাচ্চাদের কাছে প্রিয়। আমিও আমার মেয়ের সাথে মাঝে মাঝে ডোরেমন দেখি আর বোঝার চেষ্টা করি কেন এই কার্টুনটা একযোগে সব ছোট ছোট পিচ্চি পাচ্চাদের এত পছন্দ। ওরা তো একে অপরকে এটা দেখার জন্য বলেনি বা আমাদের মত নেটে ফেসবুকে প্রচারও চালাইনি? তাহলে কেন ওরা এটা দেখার জন্য এত এগ্রেসিভ, ডাইহার্ড? কারণটা কি? আরও তো অনেক কার্টুন আছে, টম এন্ড জেরি আছে, ছোটা ভীম আছে কিন্তু সেগুলো তো ওদের ডোরেমনের মত এত আকর্ষণ করে না ওদের?

এখনো আমি সুযোগ পেলেই টম এন্ড জেরী দেখি, আর ছোট বেলায় তো নিজেকে ভাবতাম থান্ডার ক্যাটসের লায়োনো। প্রতি শুক্রবারে তিনটা বাজার অপেক্ষায় থাকতাম সারা সপ্তাহ ধরে। আর ওইসময় যদি বিদ্যুৎ না থাকতো তাহলে তো দুঃক্ষেই মরে যেতাম, যা তখন প্রায়ই হত। ছোটদের নিয়ে থান্ডার ক্যাটসের মত একটা দলও তৈরী করেছিলাম আমরা তখন এবং তাদের মত করেই খেলতাম দলবেঁধে, টিভিতে যা দেখতাম বাস্তবে তাই করার চেষ্টা করতাম।

আমার মতে, বর্তমানে বাচ্চারা যে কার্টুনটা টিভিতে দেখছে, তা তারা কয়েকজন মিলে খেলার ছলে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেনা বলেই ভার্চুয়ালের ডোরেমন, নোবিতা, সুজুকা, জীয়ানদেরকে তারা তাদের বন্ধু মনে করছে এবং নিজেদেরকে ওদের সাথে একীভূত করে ফেলছে। ভার্চুয়াল আর বাস্তবের মিশ্রণে এক ধরনের বিচিত্র আনন্দ উপভোগ করছে ওরা।

আমি লিখছি, এমন সময় হটাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল, আমি প্রমাদ গুনতে গুনতেই আমার মেয়ে এসে হাজির। বাবা কি করছো? মনে মনে বললাম, আমি তোমার স্টাইল চিনি মা, যেমন তুমি ইতিমধ্যেই চিনে ফেলেছ আমারটা। বললাম, আমি লিখছি মা। কি লিখছো? তুমি কিভাবে লেখো? পর পর প্রশ্ন করতে করতে পাশে এসে বসে কিবোর্ডের পাশে আঙ্গুল ঘষতে শুরু করল সে। ল্যাপটপ দখলে নেওয়ার আগে সে এমনই করে আর যদি না পারে তাহলে পাওয়ার সুইচটি টিপে সে ল্যাপটপ শাটডাউন করে দেবে।

এখন যেকোন একটা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ও। আমি ওকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে কোলে তুলে নিয়ে, জিজ্ঞাসা করলাম, নোবিতা, জীয়ান, সুজুকাদের সাথে আর যেন কারা কারা আছে মা? সাথে সাথে ওর উত্তর, সুনিয়ো, ডরিনি, মম, ড্যাড আছে, তুমি ভুলে গেল বাবা? আর আছে চুয়া, পিচুটে, তুমি কিছুই মনে রাখতে পার না। আমি বললাম, হ্যাঁ মা আমি ভুলে গেছি, মনে রাখতে পারিনা। আচ্ছা, বল তো এদের মধ্যে কাকে তোমার সবচেয়ে ভাল লাগে? নোবিতা! একদম স্ট্রেইট উত্তর ওর।

আমি ভাবতেই পারিনি ও আমার এই প্রশ্নটা এত তাড়াতাড়ি ধরতে পারবে। উত্তর শুনে আমি কিছুটা হতচকিত হয়ে বললাম, তুমি একটু অপেক্ষা কর মা, আমি ডোরেমন চালিয়ে দিচ্ছি।

এবারের উত্তরটা শুনে আমি একেবারেই অভিভূত পড়লাম, ও বলল, না বাবা, আমিও লিখবো …

০৮/০৯/২০১৩, ৭-২৭ রাত, আপডেট ১৪/০৯/২০১৪

বিঃদ্রঃ মেয়ের গল্প লিখতে চেষ্টা করেছিলাম। অন্যব্লগে দিয়েছিলাম, বন্ধ থাকার কারনে বিডিব্লগে দেওয়া হয়ে ওঠেনি সেই সময়ে, তাই এখানেও দিলাম আর্কাইভে রাখার জন্য! আর লেখাটা একটু বড় হয়ে যাওয়ার কারণে দুই পর্বে ভাগ করলাম।