ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

যারা বলে ‘সিগারেট’ ছাড়া কঠিন কাজ; আমি তাদের সাথে ‘দ্বিমত’। কারণটা বলছি- সেই ক্লাস ফাইভে আমি এতে প্রথম টান মেরেছিলাম, তারপর প্রায় দুই যুগ ধরে শুধুই টেনেছি। প্যাকেটের পর প্যাকেট নানা রঙের, নানা ব্র্যান্ডের, নানা দেশের সিগারেট পুড়িয়ে ধোঁয়ার আকারে নাক-মুখ দিয়ে বের করে দিয়েছি লাঞ্চটাকে প্রায় ফুটো বানিয়ে দিয়ে। কিছুই মানিনী কোনদিন। অনেক অনেক ভয়ভীতি, প্রলোভন, শাসন কিছুই আটকাতে পারেনি আমাকে- এটা না খাওয়া থেকে। তারপর একদিন শেষ পোড়া মোথাটাকে মধ্যমার এক টোকায় ফেসঅফ মুভির জন ট্রাভল্টার স্টাইলে ছুঁড়ে দিয়ে তবেই ছেড়েছি এটা; তাও প্রায় চার বছর হলো। আর সেটা করলাম জামাইবাবুর পাশে- যমুনা নদী তীরের ক্লোজারে বসে; দাদাকে পাশের হাসপাতালের আইসিউতে অচেতন রেখে।

অবশ্য কিছুদিন ধরেই আমি নিজ থেকেই এটা ছাড়বো ছাড়বো করছিলাম। মেয়েটার ক্ষতি হবে ভেবে নিজেই আতঙ্কিত ছিলাম, শরীরও বিট্রে করছিল অর্থাৎ তা আগের মত স্পিড পাচ্ছিলো না; অল্পতেই হাঁপ ধরে যাচ্ছিল। যদিও আমি এর আগেও কয়েকবার এটা ছাড়ার প্রাকটিস ম্যাচ খেলেছিলাম কিন্তু সেগুলো ম্যাচুরিটি পায়নি খুব একটা। অবশেষে ‘আর খাবো না’ বলে শেষবারের মত সফল হলাম; জামাইবাবুর কথা প্রথমবারের মত মেনে নিলাম।

গৌতম’দা দ্রুত হাত নেড়ে ডেকে বলল, সুকান্ত এদিকে আয়! বলেই সে মক্কা ভাইয়ের বন্ধ ঔষধের দোকানের পিছনের টিনের বেড়া ফাঁক করে ভিতরে ঢুঁকে গেল। কিছু না বুঝেই আমিও ফুটবল খেলা ছেড়ে দিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম। ভিতরে ঢুঁকে দেখি চূড়া, বাঁশী, মধু আর স্বটন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে; আর সে একটা সিগারেটে আগুণ ধরাতে চেষ্টা করছে। আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম সেখানে। হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ব্রিস্টল সিগারেটটা এনে সে আমার হাতে দিয়ে বলল, দে! জোড়ে টান দে! আমিও দিলাম, এক টান। তারপর যা হওয়ার তাই হলো; গলায় ধোঁয়া আঁটকে বিষম খেলাম! কাশ কাশতে সেই অন্ধকার ঘর থেকে বের হতে হতে দেখলাম- “সুকান্ত সিগারেট খেয়েছে” বলে বলে গৌতম’দা একতালে চিৎকার করে সবাইকে জানাচ্ছে আর আমার বন্ধুরা তাতে সমানে তাল দিচ্ছে। সেটা ছিল আমার ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে ঘটনা আর খেলছিলাম আমাদেরই পাশের বাড়ীর মাঠে। রটনা আর ঘটনার শুরুটা সেইদিনই হলো। সাথে হাতেখড়ি! থুক্কু! হাতে সিগারেট উঠলো আর কি!

নিতাই, মোয়াজ্জেম, মিল্টন প্রতিদিন স্কুলে সিগারেট নিয়ে যেত; আমি স্বটন, পরিতোষ সহ আরও কয়েক ট্যাটনা- টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের পিছনে বাঁশঝাড়ে বসে ওদের সাথে জোট বেঁধে ধুমসে তা টানতাম। গন্ধ যেন আমাদের সাথে সাথে ক্লাস পর্যন্ত না যায়; তার জন্য স্কুলে ফিরে আসার আগে রফিক ভাইয়ের পেঁয়াজ মাখানো চানাচুর খেতাম টিফিনের টাকা দিয়ে দলবেঁধে, হাত-মুখও জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে নিতাম। কিন্তু তাতে করেও শেষ রক্ষা হল না; তামিজ স্যারের হাতে একদিন ঠিকই ধরা পড়ে গেলাম। বেত হাতে স্যার আমাদের বাঁশঝাড়ে স্বদলে ধরে ফেললেন। বৃদ্ধ স্যারের হাতে নিতাই আর মোয়াজ্জেম উত্তম মধ্যম ধোলাই দেখতে দেখতে ফাঁকতালে আমরা আবার ভোঁ দৌড়ে বেঁচেও গেলাম। স্যার যে তখন হাঁপাচ্ছিল রীতিমত, আর আমরা হাসতে হাসতে পালাচ্ছিলাম শুধু বাঁশঝাড় থেকে নয়; স্কুল থেকেও। তবে তাতে করে খুব একটা লাভ হলো না। আলে ডালে চালে পালিয়ে থেকে দুইদিন পর স্কুলে এসে ধোলাই হলাম জোড় বেতে। অর্থাৎ এই বিষয়ে মার খাওয়া আর স্কুল পালানোর শুরু সেখানেই, সেই ক্লাস সিক্সেই।

ক্লাসের পাঁজিগুলো সব একসাথে বসে স্কুল পরীক্ষা দিচ্ছি। বেত হাতে স্যাররা গার্ড দিচ্ছে। আমাদের মধ্যে যারা লেখাপড়ায় কিছুটা ভাল আছি; তাদের শুধু নিজের খাতায় লিখেই দায়িত্ব শেষ না, দুর্বল বন্ধুদের খাতায়ও যেন কিছু লেখা হয় তারও ব্যবস্থা করা। মানে তাদের নিজ খাতা দেখিয়ে, ব্যাকরণ, ফর্মুলা বলে পাসে সাহায্য করা। ফজলু স্যার আমাদেরকে কড়া নজরে রেখেছে চোষা পাটের খড়ি হাতে; যাতে কেউ আমরা নকল করতে না পারি। স্যারের হাতে ওটা দেখলে আমাদের চরম রাগ হত তখন; আর ঝাল ঝাড়তাম ওটার ক্ষেতের উপর- যা ছিল আবার আমাদের স্কুল ঘরেরই লাগোয়া। দলবেঁধে সমানে উপরে ফেলতাম তা ক্ষেত থেকে কিন্তু তাতে লাভ হতো না কোন। কারণ সংখ্যায় ওরা অনেক বেশি ছিল; আর স্যারের দরকার পড়ত রোজ একটা করে এবং তা সহজেই মিলে যেত। কখনো কখনো আমরাই তুলে এনে দিতাম স্যারের হাতে। তমিজ স্যার এগিয়ে এসে মোয়াজ্জেমকে বেত দিয়ে ইশারায় বলল, কিরে সারা বছর তোর খবর নাই; পরীক্ষার হলে দেখি একেবারে টুপি মাথায় ভদ্র হয়ে এসেছিস! টুপির নীচে নকল নাই তো? বলেই বেতের এক খোঁচায় স্যার ওর টুপীটা উঁচু করতেই ঝর ঝর করে ছোট ছোট কাগজে লেখা লুকানো নকলগুলো বেঞ্চের উপর পড়ে গেল। এগুলো দেখামাত্র স্যার রুদ্রমূর্তির রূপ ধারণ করলেন এবং হাতের বেতটা গর্জে উঠলো মোয়াজ্জেমের হাতে, পায়ে, পিঠের উপর। কিছুক্ষণের মধ্যেই মূর্তিমান আতংক হয়ে এসে গেল ফজলু আর সুজাবদ স্যার। মহা-ত্যাঁদড় ফজলু স্যার গাট্টাগুট্টা যুবক মানুষ, তাকে সুজাবদ স্যার অর্ডার করলেন, ওকে ভাল করে সার্চ করে দেখো তো আরও নকল লুকানো আছে কিনা? এই কথা শোনামাত্র মোয়াজ্জেম ডান হাত দিয়ে তার শার্টের বাম পকেটটা চেপে ধরলো, কিছুতেই সে তা ছাড়ছে না। ফজলু স্যারেরও জিদ চেপে গেল- ওতে কি আছে সে তা দেখবেই। তমিজ স্যার ক্রমাগত বেত মারছে আর বলছে, ওর পকেটে আরও নকল আছে, ওগুলো বের করো ফজলু। কিন্তু স্যাররা অনেক চেষ্টা করেও পারলো না ওর সাথে; এক ঝটকায় স্যারদের সরিয়ে দিয়ে খোলা দরজা দিয়ে লাফ দিয়ে বের হয়ে পুকুর পারে চলে গেল সে। সেখানে তার পকেটে থাকা জিনিষগুলো ফেলে দিয়ে আবার পরীক্ষার হলে ফিরে এলো ঝটপট যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে। এবার খেলো সে তিন স্যারের হাতে একযোগে ধুমসে মার, চুপচাপ, কোন সাড়াশব্দ না করে। স্যাররা চলে যেতেই- আমরা ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, হ্যাঁরে মোয়াজ্জেম তোর পকেটে কি ছিল, যার জন্য এত মার খেলি? ও উত্তর দিলো, সিগারেট। শুনে আমরা সবাই অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, শুধু এটা না দেখানোর জন্য এতগুলো মার খেলি তুঁই? ও উত্তর দিলো, ওটা দেখলে স্যাররা লজ্জা পেত! বাবাকে বলে দিলে- বাবাও লজ্জা পেত। গুরুজনের প্রতি সন্মান দেখনোর স্টাইলটা শেখা হল সেই ক্লাস টেনেই, আমাদের সবচেয়ে পাজি বন্ধুর কাছ থেকে। গর্বের সাথেই!

বল তো, সিগারেটের সুখটানটা কিসের মত লাগে? এস,পি দেব স্যারের ভরাট সুরেলা কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো প্রশ্নটা। আমরা স্যারের বলা ইংরেজি ভাষার লেসন গুলো দ্রুত খাতায় লেখায় ব্যস্ত ছিলাম তখন; তাই প্রথমে কেউই কিছু বুঝে উঠতে না পেরে স্যারের দিকে চেয়ে থাকলাম বোকার মত। স্যার তার আঙ্গুলের ডগায় থাকা প্রায় নিভে যাওয়া পলতেটাতে আরও একটা টান দিয়ে বলল, এটা হল সুখটান। এর অনুভূতি আর সুইট সিক্সটিনের গালে আলতো চুমু’র অনুভূতি একই। সিগারেটের মধ্যে অনুভূতি আর সাহিত্য ঢুঁকে গেল তখনই। সেই ইন্টারমিডিয়েটেই। আমাদের সবচেয়ে প্রিয় স্যারের লেসনে। রোমান্টিসিজম আর ফ্যান্টাসিরও শুরু হলো সেদিনই! স্যারের কাছে!

অসমাপ্ত

১২/০৪/২০১৪ রাতঃ ১০.০৪