ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

খবরটা যে এতদূর গড়িয়েছে সেটা আমি তক্ষণ বুঝতে পারিনি। আজ খবরটা পড়ে সত্যিই বিস্মিত হলাম। একটা চাক্ষুষ ঘটনা দেখা অথবা পাবলিক রিয়াকশনে নিজেই ধাতানি খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলাম! ঘটনাটা বলি-

গত পরশুদিন অর্থাৎ ৪ তারিখে আমার আর নিজাম ভাইয়ের গোহাটি থেকে নাগাল্যান্ডের দিমাপুরে যাওয়া কথা ছিল। এই বিষয়টা আমাদের ওখানকার এজেন্ট সাইমনের সাথে আগে থেকেই ঠিকঠাক করা ছিল। মূলতঃ সাইমনের ডাকেই আমি ওর ওখানে যাচ্ছিলাম কারণ ও তার বিক্রয়ের চ্যানেলটা ঠিকমত গোছাতে পারছিল না। তাই আমাকে সে বহুদিন ধরেই ডাকছিল যেন আমি ওর ওখানে যাই এবং একটু গুছিয়ে দিয়ে আসি। কারণ লাগাল্যান্ডে ও একটা কেউকেটা হলেও পণ্যের বিক্রয়িকটা সম্পর্কে সে একেবারেই নাদান। আফটার অল ওরা জীবনে কোনদিন ব্যবসা করেনি; করেছে শুধুই জমিদারী আর দাদাগিরি যা এখনো বর্তমান। এছাড়াও এবার ও আমাকে কোহিমাতে নিয়ে যাবে বলে কথা দিয়েছিল। আর আমার ইচ্ছে ছিল মাথাকেটে মর্দামি দেখানো কোন ট্রাইবাল লিডারের সাথে ছবি তুলবো নরমুণ্ড হাতে।

গোহাটিতে আমাদের কাজ দ্রুত শেষ করে হোটেলে ফিরলাম। একটু রেস্ট নিয়ে আমি আর নিজাম ভাই বেরিয়ে পড়লাম রেলস্টেশনের দিকে। এক সুহৃদের বুদ্ধিতে আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম বিনাটিকেটে ট্রেনে চড়বো কারণ গোহাটি থেকে দিমাপুর পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর টিকেট পাওয়া যায় না; যাওবা পাওয়া যায় তার সবই দ্বিতীয় শ্রেনীর। তারপরেও ষ্টেশনে একটু খোঁজাখুঁজি করে টিকেট না পেয়ে ঝুঁকি নিয়েই বিনাটিকেটে রাজধানী এক্সপ্রেসে উঠে পড়লাম। ছাত্রজীবনে আমি দেশে বহুবার বিনাটিকেটে রেল ভ্রমণ করলেও ভারতে এই প্রথমবারের মত আকামটা করলাম; তাও রাজধানী এক্সপ্রেসের মত নামীদামী সার্ভিসে।

তবে আমাদের নেওয়া এই ঝুঁকিটা ছিল ক্যাল্কুলেটিভ। কারণটা ছিল, আমরা দিল্লী থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটিতে গোহাটি ষ্টেশনে কিছুতেই প্রথম শ্রেণীর টিকেট পাচ্ছিলাম না; আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সারাপথ যাওয়ার ঝুঁকি নিতে ইচ্ছে করছিল না। অপরদিকে, বিনাটিকেটে প্রথম শ্রেণীতে ভ্রমণ করতে করতে যখন টিটি আসবে তখন বিনাবাক্য ব্যয়ে জরিমানা দিয়ে টিকেট কাটবো। এই ছিল আমাদের প্ল্যান।

সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল, সন্ধ্যায় ট্রেনে ওঠার সময় সাইমনকে কয়েকবার ফোন দিয়ে ওকে পেলাম না। বারবার রিং হচ্ছিল কিন্তু ও ফোন ধরছিল না। অগত্যা একটা ম্যাসেজ দিয়ে নিশ্চিন্তে ট্রেনে উঠে বসলাম আর বিনাটিকেটের যাত্রী হয়েও আমরা কী কী আইটেম ফ্রি খাবো তা নিয়ে হাসাহাসি করছিলাম। হটাৎ করে সাইমনের ফোন থেকে তার ম্যানেজার ফোন করে নিজাম ভাইকে জানালো, আমরা যেন কিছুতেই দিমাপুর না আসি; আসলে বিপদে পড়বো। নাগারা ক্ষেপে উঠেছে একটা নাগা মেয়েকে ধর্ষণকাণ্ডে; আর সেই কর্মটা করেছে কোন এক বা দুইজন বঙ্গ সন্তান। আর তাই ওদের সব রাগ পড়েছে বাঙালিদের উপর। যেখানে এদের পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই তাদের নগদে পেটানো হচ্ছে। সে আরও জানালো যে, ইতিমধ্যেই নাগা জনতা বাঙালিদের অনেক মার্কেট দোকান জ্বালিয়ে দিয়েছে।

নিজাম ভাই আমাকে এই খবরটা জানালে আমার কিছুটা সন্দেহ হলো, আমি বিশ্বাস করলাম না। নিজাম ভাইকে বললাম, আপনি অন্য সোর্স থেকে খবরটা নেন। কারণ সাইমন আমাকে ফোন দিবে না, এটা আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর কয়েকটা ফোন করে নিজাম ভাই নিশ্চিত হল, ঘটনা সত্যি। বাঙালিরা যে যেভাবে পারছে পালাচ্ছে। তারপরেও আমি গোঁ ধরে সাইমনকে ম্যাসেজ দিলাম, হোটেলে রুম বুকিং দাও! আমরা আসছি। পরক্ষনেই সাইমনের ফোন থেকে কল করলো তার ম্যানেজার উমেশ। সে আমাকে বলল, দাদা, দিমাপুরে কিছুতেই আসবেন না! আপনারা লামডিং-এ নেমে যান! আমি বললাম, এত রাতে আমরা সেখানে কিভাবে নামবো, যে জায়গা আমরা চিনি না!

এখানে বলে রাখি- গোহাটি থেকে দিমাপুর যেতে রাজধানী এক্সপ্রেস শুধুমাত্র লামডিং-এ স্টপেজ দেয়। সে বলল, আমি অতকিছু জানি না দাদা, সাইমন দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করছে, সে আপনাদেরকে আসতে না করেছে, আসলে বিপদ হবে; হোটেল-রেলস্টেশনে নাগারা বাঙালিদের খুঁজছে। আর অনেকে গেছে থানা আর জেলখানা ঘেরাও করতে। আসবেন না কিছুতেই দাদা! আর আসলে নিজের ঝুঁকিতে আসবেন! বলেই সে দ্রুত ফোন কেটে দিলো।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে আমরা লামডিং-এ মধ্যরাতে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, ততক্ষণে ক্যালেন্ডারে মার্চের ৫ তারিখ হয়ে গেছে!

আর আজ খবরে দেখলাম, ধর্ষণকারীকে নাগা জনতা জেল থেকে বের করে এনে ঝুলিয়ে পিটিয়ে মেরেছে! অবশ্য পিটিয়ে মারতে নাগারা খুবই ভালবাসে; ভালবাসে মাথাকাটতেও!

০৭/০৩/২০১৫ রাতঃ ১২.৩০
আগরতলা, ত্রিপুরা।