ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ক্রিকেট মানে জুয়া আর জুয়া মানে টাকা। এক কথায়- “ক্রিকেট মানে টাকা”। এটা বর্তমানকালের জন্য আমার ইকুয়েশন।

আমি মনে করি- বর্তমানে ক্রিকেট আর খেলা নেই; এর পুড়োটাই জুয়াড়িদের হাতে। ওরা যখন ইচ্ছা যাকে দিয়ে পারে তাকে দিয়ে তাদের লক্ষ্য পূরণ করে, সেটা হোক খেলোয়াড় দিয়ে বা হোক আম্পায়ার দিয়ে বা কোচ ও ভাষ্যকার দিয়ে। কে কখন কি রোল প্লে করবে তা আগে থেকে জুয়াড়িদের রিং লিডার ছাড়া আর কেউ জানে না। আর তাকে ভিত্তি করেই জুয়া চলে সারা পৃথিবী জুড়ে। এমনকি বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জেও তা ছড়িয়ে পড়েছে।

একটা সময় আমি ক্রিকেট বলতে পাগল ছিলাম। সাদাকালো টিভিতে দেখা ১৯৮৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের সেই ফাইনাল খেলায় আজহার উদ্দিনের প্রথম শটটার কথা আমার এখনো মনে আছে; যদিও সেই শট থেকে কোন রান পায়নি সে। তবুও আমি তার ফ্যান হয়েছিলাম কারণ আমি তার কথা দাদাদের মুখে শুনেছিলাম। জেনেছিলাম কিছুদিন আগে নাকি সে পর পর তিন ম্যাচে তিন সেঞ্চুরি করেছে। আমি তখন দাদাদের মুখে মুখে শুনেই কপিল দেব, আজহার উদ্দিন আর শ্রীকান্তের ভক্ত হয়েছিলাম। সেই সময়ে যখন আমি ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ি। এমনকি পাকিস্তানের সাথে খেলা শচিনের ডেব্যু বলের বর্ণনাও আমি হুবহু বলে দিতে পারি, যদিও তা রেডিওতে শুনেছিলাম। পারি সেই টেস্ট সিরিজের সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারের করা রান সংখ্যা। সেই তখন থেকেই আমি এই খেলায় ভারতের সাপোর্টর হয়ে গেলাম।

এসব বলছি, কারণ আমি স্পষ্ট করতে চাচ্ছি ক্রিকেট নিয়ে আমার ভাবনা চিন্তাগুলোকে। চাচ্ছি নিজের অবস্থান জানান দিতে।

ক্রিকেটে আমি ভারতের সাপোর্টর হলেও আমি ফ্যান ছিলাম পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরামের, অস্ট্রেলিয়ার শ্যেন ওয়ার্ন, ম্যাকগ্রাথ, বেভানের, নিউজিল্যান্ডের হ্যাডলী ও গ্রেট ব্যাচের (যাকে ওয়ান ডেতে পিঞ্চ হিটিং-এর উদ্বোধনকারী বলা হয়), শ্রীলংকার জয়সুরিয়া, মুরালিধরণ ও ডি সিলভার। টিভির পর্দা থেকে চোখ সরাতাম না যখন দেখাতাম লারা ব্যাটিং করছে, এম্ব্রোস গোলা ছুড়ছে। এছাড়াও আরও অনেক খেলোয়াড়ের খেলা দেখতে আমার ভাল লাগতো। রাতের পর রাত জেগে একনাগাড়ে খেলা দেখতাম, রেডিওতে কান লাগিয়ে শুনতাম, লেপ কাঁথা নিয়ে টিভি রুমে শুয়ে থাকতাম খেলা শুরু হওয়ার অপেক্ষায়। আর আজকের কাগজ, ভোরের কাগজের খেলার পাতাগুলো দমবন্ধ করে পড়তাম। এই ছিল ক্রিকেট নিয়ে আমার তখনকার অবস্থান।

কিন্তু বর্তমানে আমি নিঃশঙ্ক চিত্তে বাংলাদেশের সাপোর্টর। সাকিব- মাশরাফীদের খেলা আমার মনে শিহরণ জাগায়। আকরাম খান যখন আইসিসি টুর্নামেন্টে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন বানায়; পরদিন সকালে আমি একাই সারা ক্যাম্পাস ঘুরেছিলাম বাঁশে আমাদের জাতীয় পতাকা বেঁধে।

কিন্তু আমি এই খেলায় এখন আর আগের সেই শিহরণ পাই না। যখন জানলাম ক্রনিয়ের মত জাঁদরেল ক্যাপ্টেন ঘুষ খেয়ে ম্যাচ ছেড়ে দিয়েছে। গিবস, আজহার উদ্দিন, জাদেজাও এর সাথে জড়িত। পাকিস্তানের প্রায় সবাই ম্যাচ পাতায়। আমাদের আশরাফুলও কম যায়নি এই অপকর্ম করা থেকে। তখন থেকেই আমি এই খেলায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। সত্যি বলতে কি- আমি গত পাঁচ বছরে একটা ক্রিকেট ম্যাচও পুড়োটা দেখিনি। এমনকি এবারের বিশ্বকাপের একটা খেলাও আমি টিভিতে দেখিনি। অনলাইন আর কলিগদের হৈচৈ –এ যতটুকু জেনেছি ততটুকুও আমার এবারের খেলা দেখার অভিজ্ঞতা।

এই খেলা থেকে আমি আরও আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম, যখন থেকে ভারতে ক্রিকেটের IPL শুরু হলো। আমার কেন যেন মনে হয়, এই টুর্নামেন্টটা আয়োজন করাই হয়েছে জুয়াড়িদের বুদ্ধিতে। IPL কে যার ব্রেন চাইল্ড বলা হয় সেই সংগঠক যখন SMS করে ম্যাচ পাতিয়ে ধরা পড়ে তখন আমার সেই সন্দেহ আরও পোক্ত হয়। তাই আমি শচিন-সৌরভের দুই একটা ম্যাচ বাদে যত পেরেছি এই খেলা এভোয়েড করেছি, টিভিতে দেখা থেকে এমনকি আলোচনা থেকেও।

আমার জানামতে ভারতের আইপিএলে ম্যাচ পাতানোর দায়ে শ্রী নিবাসনের মেয়ের জামাই দণ্ডিত হয়েছে এবং সেও অভিযুক্ত ছিল; যদিও তার অপরাধটা প্রমাণ করা যায়নি বা হয়নি। এর কারণ হতে পারে তাকে দোষী প্রমাণ করতে গেলে আরও বড় বড় মাছ ধরা পড়বে, তাই তাকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ICC তে এই নিবাসনের ব্যাপক ক্ষমতা। তাই উপরের সূত্র ধরে আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, কোন না কোনভাবে ভারতের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশকে হারানোর প্ল্যান হয়েছিল। এবং আমি মনে করি সেটা আম্পায়ারদের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে।

ওহ! আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, যখন দেখি আমার কিছু কাছের মানুষ; যাদেরকে আমি সেই চেনা সময় থেকে দেখছি এই খেলায় পাকিস্তানকে সাপোর্ট করতে। অতীতে আমার দেখা বাংলাদেশ–পাকিস্তানের ম্যাচেও যাদের আচরণ ছিল একেবারেই ঠাণ্ডা! যারা এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেই জ্ঞান দান করত, “খেলার সাথে রাজনীতি না মেশানোই ভাল” বলে। তাদেরকে হটাৎ করেই এবারের ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচে অতি ‘দেশপ্রেমী’ হয়ে যেতে দেখে আমি থমকে গেলাম। আরও অবাক হলাম যখন শুনলাম, তারা আমাকে লক্ষ্য করে চুপি চুপি বলছে, “দাদা মনে হয় আজও ভারতকে সাপোর্ট করবে!”

তখন সত্যি সত্যি ক্রিকেটকে আমার আর খেলা মনে হয় না। মনে হয় অন্য কিছু!

তাই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলে উঠি, “ক্রিকেট খেলার সাথে আর ‘খেলা’ নেই!”

২৩/০৩/২০১৫ রাতঃ ১০,৩০