ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

 

অনেকদিন আগে রাতে বিটিভিতে ‘এক্স ফাইলস’ নামে একটা ইংরেজি সিরিয়াল প্রচারিত হতো। সিরিয়ালের মুভিগুলো দেখতে এমনিতেই ভয় ভয় করতো আমার; সাউন্ড শুনেই শরীর কাঁপতো! সেটা বেশী ঘটত যদি একা একা টিভি দেখতাম। আর পুড়ো বাসায় যদি এক থাকতাম, তাহলে তো কথায় নেই? একটু দেখেই লেপ; না হয় কাঁথা মুড়ি ঘুমাতাম। সেই এক্স ফাইলসের একটা পর্বে দেখিয়েছিল কুচক্রী ডাক্তাররা সুস্থ মানুষের ‘দেহ’ কেটে এনে অসুস্থ দেহের একজন মানুষের কেটে রাখা ‘মাথা’র সাথে তা লাগিয়ে দিচ্ছে! নায়িকা কেলীও সেই রহস্যভেদ করতে যেয়ে নিজেই তাদের খপ্পরে পরেছিল; সময়মত নায়ক আসাতে তবেই রক্ষা। তারপর থেকে এরূপ ঘটনা আমার কল্পনাতেই ছিল!

কিন্তু আমার সেই কল্পনা ভেঙ্গে গেল যখন শুনলাম এক ইতালিয়ান ডাক্তার একই কাজ করতে যাচ্ছেন এবং জনাব স্পিরিদোনভ নামক এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী তার মাথাটাকে ‘নিজ দেহ’ পরিবর্তন করার অনুমতি দিয়েছেন। জনাব স্পিরিদোনভ, যিনি আসলে একটা জটিল রোগে ভুগছেন এবং তার দেহ ক্রমাগত তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বলতে গেলে তার মাথা সুস্থ থাকলেও অসুস্থ দেহের কারণে তিনি ক্রমাগত মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন। এই হলো ঘটনা!

এখন প্রশ্ন উঠছে এই কাজ নীতিগত ভাবে সঠিক হচ্ছে কিনা বা করা যাবে কিনা? আসুন দেখা যাক খবরে কি কি আছে-

অপারেশন কে করবেন, কারা করবেন ও কিভাবে করবেন-

প্রাণঘাতী পেশী-ক্ষয়রোগ স্পাইনাল মাসকিউলার অ্যাট্রফিতে (এসএমএ) ভুগছেন স্পিরিদোনভ। নিজের জীবন রক্ষার জন্যই নিজের মাথা প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুগান্তকারী এই অপারেশনের মূল কাণ্ডারি হিসেবে থাকবেন ইতালিয়ান চিকিৎসক ড. সের্গেই ক্যানাভেরো। সব মিলিয়ে ৩৬ ঘণ্টার অপারেশনে অংশ নেবেন দেড়শ চিকিৎসক ও নার্স। অপারেশনে স্পিরিদোনভের মাথা কেটে বসানো হবে ‘বেইন ডেড ডোনার বডি’তে। মস্তিষ্ক মৃত হলেও সম্পূর্ণ সুস্থ হতে হবে ওই দাতার শরীর। এখানেই শেষ নয়, দাতা শরীরের স্পাইনাল কর্ড ও জাগুলার ভেইনের স্পিরিদোনভের স্পাইনাল কর্ড ও জাগুলার ভেইন সফলভাবে সংযুক্ত করতে না পারলে ব্যর্থ হবে অপারেশন।

রাশিয়ান চার্চ এই অপারেশনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে-

মাঝে বাধ সেধেছে রাশিয়ার অর্থোডক্স চার্চ। ‘শরীর ও আত্মা অবিচ্ছেদ্য’ হওয়ায় এই অপারেশন ধর্মীয় বিশ্বাসবিরোধী বলে ঘোষণা করেছে চার্চ কর্তৃপক্ষ। এই অপারেশন নিয়ে সমালোচনা চলছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতেও।

রুগীর মত ও মায়ের আশীর্বাদ-

এ ব্যাপারে স্পিরিদোনভের বক্তব্য, “আমি ভয় পাচ্ছি, কিন্তু যে ব্যাপারটা কেউ বুঝতে পারছে না, সেটা হল আমার হাতে অন্য কোনো উপায় নেই। প্রতিবছর আমার শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। আমার মা তার আশীর্বাদ দিয়েছেন। আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতামত-

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতেও এই অপারেশন নিয়ে সমালোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। “এমনটা কারও সঙ্গে হোক তা আমি কখনও চাই না। আমি কাউকে এমনটা করতেও দিতাম না। কারণ, মৃত্যুর থেকেও খারাপ অনেক কিছুই আছে।”– মন্তব্য করেছেন অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর নিউরোলজিকাল সার্জনসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ড. হান্ট ব্যাটজার। এক শরীর থেকে মাথা কেটে অন্য শরীরে বসালে ওই ব্যক্তি নানা শারীরিক ও মানসিক জটিলতার আশংকা থাকে। ওই শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর আশংকাই বেশি। অন্যদিকে স্পিরিদোনভের অপারেশনের মূল উদ্যোক্তা ড. কানাভেরোকে ‘উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ল্যাঙ্গন মেডিক্যাল সেন্টারের পরিচালক আর্থার কাপলান।

অতীতের রেফারেন্স-

মানুষের মাথা প্রতিস্থাপনের এটাই প্রথম ঘটনা হলেও ১৯৭০ সালে বানরের উপর পরীক্ষামূলকভাবে এই অপারেশন চালানো হয়েছিল। স্পাইনাল কর্ড সঠিকভাবে সংযুক্ত করতে না পারায় শ্বাসকষ্ট ও পঙ্গুত্বে ভুগে ৮ দিনের মাথায় মারা যায় ওই বানর।
নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৪ সালে সোভিয়েত সার্জন ভ্লাদিমির দেমিকভ অপারেশন করে ২০টি কুকুরের শরীরে বাড়তি মাথা জুড়ে দিয়েছিলেন। এক মাসের বেশি সময় বাঁচেনি ওই কুকুরগুলো।

সম্ভাবনা দেখছেন যারা-

মানবশরীরের ক্ষেত্রে সফলভাবে মাথা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ান ন্যানো-বায়ো রিসার্চার আলেক্সান্দার জাভোরোনভ। তবে পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি বেশি সময় বাঁচবেনা না বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।

আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, “মানুষের যেন এমন রোগ না হয় যাতে করে সে এমন ভয়ংকর একটা চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়”!

অফটপিকঃ আপাতদৃষ্টিতে মহা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংকে ‘ম্যান ও মেশিনের’ একটা মিলিত রূপ হিসেবে মনে হয়! কারণ তিনি যে রোগে ভুগছেন তা যদি গরীব কোন দেশের কোন বিজ্ঞানী’র হতো তাহলে তার চিন্তাভাবনাগুলো আমাদের জানা হত না কোনদিনই! এখন আমরা যা শুনছি তা মূলত: স্টিফেন হকিং এর চিন্তার ‘মেশিন মাধ্যমীয় প্রকাশ’। তার হাত, পা, গলার স্বরসহ পুড়ো দেহ অকেজো কিন্তু মাথা সচল! অতীতে ডাক্তার’রা অনেকবারই তার লাইফ লাইনের ইতি টেনেছেন কিন্তু সব গেলেও এখনো তার মস্তিষ্ক সচল আছে। মনে হয় আগামী দিনগুলোতেও এটা সচলই থাকবে যতটুকু সম্ভব; বিজ্ঞানের কল্যাণে >>>

বিজ্ঞান কি বলে?

আমার ভাবনাঃ

আমি ভাবছি এই অপারেশন যারা করবেন তাদের মানসিক সক্ষমতা নিয়ে? জীবন্ত দুইজন মানুষের কাঁটা মাথা হাতে নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঘোরাঘুরি করবেন প্রায় শ খানেক মানুষ! এটা করতে যেয়ে কি একজনও মাথা ভিমরি খেয়ে পড়বেন না?

এই তো গতবছর শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে- সড়ক দুর্ঘটনায় কলিগের কাঁটা যাওয়া বাম পা’টা বোলের মধ্যে এক নজর দেখেই চিত হয়ে গেছিলাম; তারপর আইসিউতে শুয়ে থেকে আর অনেক স্যালাইন খেয়ে তবেই রক্ষা পেয়েছিলাম!

১৫/০৪/২০১৫

সুত্রঃ বিডিনিউজ২৪ডটকম নিউজ। খবরের লিংক

ডিক্লারেশনঃ কোটেশনে খবরটা কপিপেস্ট করা আছে পার্ট বাই পার্ট করে।

বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাঃ ৩/১০ টা।