ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

আজ বিকালে অফিসের কাজ শেষে হাতে কিছুটা ফাঁকা সময় পেলাম। কি করি? কি করি? ভাবতে ভাবতেই জনতা ব্যাংকের কর্পোরেট অফিসের পাশের ডাবের দোকান থেকে ৫০ টাকা দিয়ে একটা ডাব কিনে খেলাম। বেছে বেছে যে ডাবে শ্বাস একটু বেশী পাওয়া যাবে সেটাই পছন্দ করলাম। জল খাওয়ার পরে, দোকানীর ধারালো চকচকে দা’র এক কোপে কেটে দেওয়া ডাবের একটা কাঁটা অংশকে চামচ বানিয়ে তা দিয়ে শ্বাস তুলে খাচ্ছিলাম। এমন সময় একটা কিশোর ছেলে এসে হাত পাতলো। আমি সচরাচর এসব ছেলেদের কিছু দেই না। কিন্তু আজ কি মনে করে দিলাম কিছুটা; সম্ভবত আমার একার পক্ষে খাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না; তাই দিলাম।

অজ্ঞান হওয়ার ভয়ে আমি রাস্তা থেকে সচরাচর ডাব কিনে খাই না; যদি একা থাকি তাহলে তো কথাই নেই? কিন্তু আজ খেলাম কারণ গরমে কাহিল ছিলাম। আবার ছিল আমার ক্যাল্কুলেশন- আর যাই হোক ডাব খাওয়ার আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরতি বাসে উঠবো না। মাথা ঘুরে যদি পড়ি তাহলে রাস্তায় চিত হয়ে পড়বো; মানুষের সামনে পড়বো। তারপর দোকানদারকে এসে ঠেসে ধরবো। মতিঝিলে আমাকে কেউ না কেউ চিনবেই। বাসে একা একা অজ্ঞান হয়ে থাকবো? তা হবে না। অপরদিকে নিজের ওয়েট বেড়ে যাওয়ার কারণে আমি প্রায় কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া ছেড়েই দিয়েছি। আজকের ডাব খাওয়ার মূল কারণ আসলে এটাই।

ডাবের খোলসটা দোকানীকে ফেরত দিয়ে ও টাকাটা পরিশোধ করেই এক ঝটকায় রাস্তাটা পার হয়ে বিমান অফিসের পাশ দিয়ে পেট্রোল পাম্পটাকে বাম পাশে রেখে সোজা হাঁটা দিলাম। কিছুটা ছায়ার আশায় হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটা পার হয়ে ডানদিকের ফুটপাতে উঠে পড়লাম। দোকান-মানুষ ঠেলে ফুটপাত ধরে কিছুটা আগাতেই আমার মাথাটা চক্কর মারলো- বাঁপাশের মিষ্টির দোকানটা দেখে। কিছু একটা খেতে ভীষণ লোভ হলো; রসমালাই থেকে ছানার জিলাপি কি নেই এই দোকানে? পথ চলতি মানুষেরা সমানে খাচ্ছে। আমারও থেমে যেতে মন চাইলো কিন্তু যখনই মনে হলো এই মিষ্টিতে স্যাকারিনের স্বাদ পেয়েছিলাম সেদিন; তখনই লোভটাকে দমন করলাম। ফুটপাত থেকে রাস্তায় নেমেই ডানদিকে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার দিকে ফিরলাম।

মতিঝিলের রাস্তায় হাঁটার এটাই হলো মজা- দেশের সবচেয়ে ভাল ভাল ফল, সবজি, মাছ এখানেই পাওয়া যায়। যদিও এগুলো কেনার সার্মথ্য আমার নাই কিন্তু দেখে মজা নিতে তো আর কেউ মানা করছে না? আমি বেসিক্যালি তাইই করি; যতটুকু পারি এগুলো থেকে মজা নেই। আর যেদিন থেকে সিটিজেন জার্নালিজমের ক্যারাটা মাথায় ঢুকেছে- সেদিন থেকে ছবি তোলার একটা ঝোঁক চেপেছে।

এখানেই সেদিনের সেই কালিজিরা তেলের দোকানটা খুঁজলাম। কিন্তু সেখানে এখন কাঁচা আমের বিশাল দোকান। দেখলাম তরতাজা কাঁচা আমগুলো গাছ থেকে পেরে এনেছে। একদিক দিয়ে এটা ভাল; আর যাই হোক কাঁচা আমে নিশ্চয় ফরমালিন দেয়নি। যদিও বাঙ্গালীর উপর আমার ভরসা কম। কোন কারণ ছাড়াই এরা সবুজ সবজীতে সবুজ রঙ মেশায়; নিরীহ লাল শাকটাকে এরা রোডালাইনে ডোবায় আরও লাল করার জন্য। আমি এই মতিঝিলেই গতবছর ড্রামে গোলানো রঙ দেখেছি। আমি দেখে ফেলেছি; দেখেই একটা ছেলে দৌড়ে এসে ঢাকতে ঢাকতে বলেছিল, স্যার এই রঙ বিল্ডিঙে দিচ্ছে! আমি মনে মনে হাসি আর গালি দিতে দিতে বললাম, শালার পুত, তুই আমাকে রঙ চেনাস? আমাদের চৌদ্দ পুরুষের জাত ব্যবসা হলো সূতা-রঙের ব্যবসা। তুই আমাকে ‘কাঁচা গ্রিন’ চেনাস? ‘রোডালাইন’ চেনাস?

একটু হাঁটতেই নতুন একটা কালিজিরা তেলের দোকান পেয়ে গেলাম। ওর ডালাতে রাখা কালিজিরার তেলের বোতল দেখেই বুঝতে পারলাম আজ তেলে সরিষার তেলের পার্সেন্টেজ বেশি। কথা না বাড়িয়ে এগোতেই দেখি হাতের বামে জলঢুপি আনারসের কয়েকটা ভ্যান দোকানে সমানে কাঁটা আনারস বিক্রি হচ্ছে। এবার আর লোভ সামলাতে পারলাম না; কিসের ফরমালিন? আর কিসের হরমোনের ভয়? দোকানিকে বললাম কত? বলল, স্যার, ১৫ আর ১০ টাকা পিস। আমি বললাম, দাও এক পিস তবে নতুন কেটে দাও; তোমার মাছি বসাটা না। আর তোমার হলুদ রঙ মেশানো লবণটা মেশাবে না; আমি এমনিতেই খেতে পারি। খেয়ে দেখলাম দারুণ মিষ্টি! শুধু শুধু রঙ মেশাচ্ছে ওরা; আর চোখ থাকতেও কানা মানুষগুলো সমানে তা খাচ্ছে।

“কানাকে পথ দেখিয়ে লাভ নাই” প্রবাদটা ভাবতে ভাবতে বড় রাস্তায় এসে বামদিকে ঘুরেই ডালায় সাজিয়ে রাখা চকচকে ‘কাঁটা ইলিশ’ মাছে নজর আঁটকে গেল; কিন্তু থামলাম না। দোকানদারটা আমার নজর ঠিকই খেয়াল করেছে, সে পিছন থেকে বলে উঠলো, ১০০ আর ২০০ টাকা প্রতি পিস। দাম শুনেই আমার মনে খটকা লাগলো। দ্রুত ক্যাল্কুলেশন করলাম, পহেলা বৈশাখ গেছে মাত্র ৭ দিন। আর এই কাঁটা ইলিশ সে মাত্র ১০০ আর ২০০ টাকায় বিক্রি করছে? সাইজ তো ভালই মনে হলো? এই ইলিশ তাকে কমপক্ষে ৭ থেকে ১০ দিন আগে কাটতে হয়েছে? এই মাছ সে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি না করে ২০০ টাকায় কেন বিক্রি করছে? যেই ভাবা সেই কাজ। পুড়া ব্যাক গিয়ারে কাঁটা ইলিশের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দোকানী ভাবলো পেয়েছি মক্কেল? আর আমি ভাবছি- মাছ তো ইলিশই মনে হচ্ছে এবং সাইজেও অনেক বড়; তাহলে কেন এত কম দাম চাচ্ছে? কাহিনী কি? শুরু করলাম প্যাঁচাল। মাছগুলো ভাল করে দেখতে যেয়ে মাছের কাঁধের কাছে আমার নজর আঁটকে গেল! ঠিক ইলিশ বলে মনে হল না। পকেট থেকে দ্রুত মোবাইলটা বের করে ছবি তুলতে তুলতে বললাম, আপনার মাছের ছবি পত্রিকায় দিব! সে বলল, স্যার শুধু মাছের ছবিই দিবেন? আমারটা দিবেন না? বললাম, বসে যান! তুলি। এমন সময়, এক মুরুব্বী এসে বলল, ভাই কি মাছ দিলেন ইলিশের তো কোন গন্ধ পেলাম না? শুনে আমার সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। এমন সময় আরও একজন এসে বলল, ভাই আপনার কাঁটা ইলিশ ভাল না, কোন স্বাদ নাই। এবার আমি বলেই ফেললাম, এই মাছ তো ইলিশ না! কি মাছ এটা?

এবার সত্যিকারের বিক্রেতার আচরণ দেখাতে শুরু করলো দোকানদারটা! আর আমি চুপচাপ পগার পার হলাম। তবে ছবিগুলো শেয়ার দিচ্ছি। আমি দেখেছি; আপনারাও দেখুন- কাঁটা ইলিশ মাছেও ভেজাল দেখুন!
kata Ilish-1
[এই মাছ ২০০ টাকা প্রতি পিস চেয়েছিল এবং এখন নিলে ২০টাকা ডিস্কাউন্টও দিবে বলেছিল দোকানদার]

তবে বলে রাখি ধরতে পাড়াটা হবে খুবই টাফ। আমি এই মাছ অনেক আগে কক্সবাজারে একটা ফিসারিজে শুঁটকী বানাতে দেখেছিলাম। তবে নাম জানি না।
Kata Ilish -2
[প্রতি পিস ১০০ ও ২০০ টাকার মাছ পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা আছে]

তবে আসুন দেখি- মতিঝিলের ‘ভেজাল’ কাঁটা ইলিশ মাছ! আর সমস্বরে বলে উঠি, মতিঝিলের কাঁটা ইলিশেও ভেজাল!
Kata Ilish-5
[দোকানদের ইচ্ছায় ওনার ছবি তুলেছিলাম আর আমার ইচ্ছায় ওনার মাথাটা কেটে দিলাম]

২০/০৪/২০১৫ , ১১.৩০ রাত