ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পার্কে ঢুকতেই ডানদিকে বিশাল একটা গাছ একাকী দাঁড়িয়ে আছে, একহারা লম্বা গড়নের আর এত চওড়া গাছ আমি আমাদের দেশের কোথাও দেখেনি। সম্ভবত এটি গর্জন গাছ! কিছুদিন আগে “মেরিন বেসিন” রোড ধরে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে এই প্রজাতির কিছু গাছ দেখেছিলাম। তখন গাছের প্রজাতির নাম জিজ্ঞাসা করলে, আমাদের গাড়ীর স্থানীয় ড্রাইভার বলেছিল “এগুলো গর্জন গাছ, স্যার”। যদিও কক্সবাজার বনবিভাগের সেই গাছগুলো এত বড় ছিল না, তবুও সেগুলো দেখতে ভীষণ সুন্দর ছিল। বাংলার মানুষের হিংস্র হাত থেকে বেঁচে যাওয়া অবশিষ্ট সেই গাছগুলোকে স্মৃতি হিসেবে ধরে রাখার জন্য আমরা গাড়ি থেকে নেমে ছবি তুলেছিলাম। কেননা আমাদের হাতে সর্বদা বিলুপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে ওরা! বলা তো যায় না, আর যদি না দেখতে পাই কখনো? সেই ভয়ে ছবি তুলে রাখা! আমার এইসব কথায় সেদিন আমার বস হেসেছিলেন খুব, আর বলেছিলেন, ইউ আর রাইট!

ছোটবেলা থেকেই আমি বাবার মুখে শুনে আসছি, বার্মাতে অনেক বড় বড় সেগুণ গাছ আছে, যাদের বয়স শত শত বছর। পাঁচশত থেকে হাজার বছরের সেগুণ গাছও নাকি আছে বার্মার বনে! আমাদের সেই সময়ের বাড়ীর পুরাতন বিল্ডিংগুলোর যা ১৯৯০ সালের দিকে বাড়িসহ যমুনা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, সেগুন কাঠের বড় বড় ভীম-বর্গা, দরজা-জানালা-খড়খড়িগুলো দেখিয়ে- বাবা বলতেন, এগুলো সব “বার্মা সেগুণ” দিয়ে তৈরি! সেই থেকে আমার সেগুনের বড় গাছ দেখার আকাঙ্ক্ষা! এখন সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রায় কাছাকাছি আমি! আর তাই তো অবচেতন মনের সেই হাজার বছর বয়সী গাছ দেখার লোভে বড় বড় গাছের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে দ্রুত পার্কের ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

অধিকাংশ গাছই আমার চেনা, আম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে সেগুনসহ অনেক ধরনের গাছই আছে এখানে, আছে রঙ বেরঙের ফুলের উদ্ভিদ, ক্যাকটাস আর নাম না জানা নানা রঙের অর্কিড। পার্কের ভিতর বিশাল এক লেক। আর লেক পাড় ধরেই পিচ ঢালা সব রাস্তা বিন্যস্ত করা। দূর থেকে লেকের উপর একটা কাঠের পুল দেখতে পেলাম যাতে দলবেঁধে অনেক মানুষ হাঁটছে। আমি সেই পুলে ওঠার লক্ষ্য নিয়ে এবং পথের দিক ঠিক রেখে হাঁটতে থাকলাম যাতে ফিরতি পথ ধরতে ভুল না হয়। ঘুরপথগুলোকে মার্ক করে রাখার এর জন্য বড় গাছ, ক্যাকটাসের বাগানকে মনে রাখার চেষ্টা শুরু করলাম। জানিনা কতটুকু মনে রাখতে পারবো, তারপরও করলাম! কারণ রাস্তা মনে রাখায় আমার সমস্যা আছে! আমাকে প্রায়ই ভুগতে হয় এটা নিয়ে।

এখানে নতুন গাছের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পুরনো গাছও আছে যাদের মধ্যে অনেকগুলোই ভাঙ্গাচোরা। একেকটা গাছ যে কয়েকবার করে ঝড়ে ভেঙ্গেছে তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না; ভাঙাকান্ড থেকে গজানো বিভিন্ন বয়সী ডালপালা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তা। ঝড়ে ভাঙ্গা পুড়নো এই গাছগুলো নতুন নতুন ডালপালা মেলে যেন বলছে, দ্যাখো! আমরা কয়েক যুগ ধরে ঝড়ে ভাঙছি আর নতুন করে জীবন গড়ছি, ভাঙছি আর গড়ছি, গড়ছি আর ভাঙছি তবুও হার মানছি না!

কালো হয়ে যাওয়া অনেক পুরাতন ও মৃত গাছের ডালবিহীন কিছু কাণ্ড আছে এখানে, যেগুলোকে ঘিরে নতুন করে এবং কিছুটা ভিন্ন উপায়ে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমাদের দেশে হলে, এইসব ঝড়ে ভাঙ্গা পুরনো গাছগুলোকে কবেই পার্ক পরিষ্কার করার নামে, জনস্বার্থের নামে সমূলে উপড়ে; বেমালুম গিলে ফেলা হত! অথবা শোভাবর্ধন করত পার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী আমলা কর্মচারীদের ড্রয়িং রুমের! চাই তো কয়েক হাত ঘুরে নেতার মেয়ের বিয়ের যৌতুকও হয়ে যেতে পারত বাসর ঘরের খাট হয়ে! বর্মীরা কিন্তু তা করেনি, বরং পার্কের মালী ও তত্ত্বাবধায়কগণ সেইসব অতি পুরাতন ঝড়ে ভাঙা গাছগুলিকে কেটে বিনাশ না করে সেগুলোকে নতুন করে বাঁচতে দিয়েছে আর যেগুলো মারা গেছে সেগুলোতেও বিভিন্ন ধরনের অর্কিড লাগিয়ে দিয়েছে। আর তাতে রং-বেরঙের ফুলও ফুটেছে অনেক, যেন এক-একটা মস্ত বড় জীবন্ত ফুলদানী, সৌন্দর্যের নতুন এক সংজ্ঞা!

পার্কের রাস্তার পাশ দিয়ে ছোট ছোট কাঠ ও সিমেন্টের বেঞ্চ বানানো আছে, তাতে পার্কে হাটতে আসা বিভিন্ন বয়সী মানুষ বসে কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের হাতেই ছাতা ধরা আছে এবং আমার হাত যথারীতি খালি। আমার হোটেলের নারী কর্মীদের বারবার অনুরোধ উপেক্ষা করে আমি ওদের দেওয়া ছাতাটা সাথে করে আনিনি! কারণ হাতে ছাতা নিয়ে ঘোরাঘুরি করাটা আমার কাছে ঠিক ভাল লাগে না; বোঝা বোঝা লাগে! অবশ্য প্যাঁচে পড়লে অন্যরকম লাগে; মানে তখন বোকা বোকা লাগে! এবার গর্জন শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাতে মেঘের ঘনঘটা দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, আজ বোধ হয় আমার শেষ রক্ষা হবে না; ভিজতেই হবে! কারণ আশেপাশে এমন কোন ছাউনি নেই, যাতে বৃষ্টি শুরু হলে দাঁড়ানো যায়। তারপরও হাঁটতে থাকলাম; যা হওয়ার হবে এমন ভাবধারা নিয়ে!

লেখাঃ ০৯/২০১২। আপডেটঃ ০৬/০৬/২০১৫ রাতঃ ১১.৪১

ইয়াঙ্গুনে কয়েকদিনঃ ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব