ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

পার্কের কিছুটা ভিতরদিকে, যেখানে গাছ-পালা একটু বেশী, সেইদিকের বেঞ্চগুলো অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরা যুগল বেঁধে দখলে রেখেছে, যদিও বৃষ্টি তখনো শুরু হয়নি তারপরেরও তারা ছাতা ফুটিয়ে মাথার উপরে ধরে রেখেছে! যার কারণে তাদের মাথাগুলো আসলে কোথায় তা বোঝা যাচ্ছে না। আর যদিওবা তাদের শরীরের নিচের অংশগুলো দেখা যাচ্ছে কিন্তু অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসার কারণে তাদের আলাদা করে চেনাও যাচ্ছে না! অল্প একটু দূরে একটি কাঠের বেঞ্চে বসা এক যুগলকে দেখে আমার খটকা লাগলো, একটু ভাল করে তাকাতেই দেখলাম ছাতার নিচে স্কার্ট পরিহিতা মেয়েটির কোলের উপর নীল জিনস পরিহিত ছেলেটি আড়াআড়ি ভাবে পা তুলে বসে আছে। মানে অনেকটা চ্যাংদোলা টাইপের করে, ভালভাবে বললে, বাংলা সিনেমা স্টাইলে! দেখেই আমি হেসে ফেললাম কারণ আমরা এর উল্টোটা জানি! ঠিক দেখছি তো? মনের এই সন্দেহ দূর করার জন্য আরও একবার ভাল করে খেয়াল করলাম এবং নিশ্চিত হলাম, যাক! আমার প্রথম দেখাটা তাহলে ভুল হয়নি! ওদের ওইভাবে দেখে আমি নিজেই লজ্জা পেলাম কিন্তু ওরা নির্বিকার নট নড়ন চড়ন! অগত্যা আর কিছু দেখার নেই ভেবে ভেবে সামনে এগোতে থাকলাম; চলার গতি বাড়িয়ে দিলাম।

একটা জিনিস খেয়াল করলাম, আমার অনভ্যস্ত চোখ এইসব দেখে লজ্জা পেলে কি হবে? যারা ঐভাবে বসে আছে, তাদের কিন্তু আশেপাশের কারও প্রতিই কোন ভ্রূক্ষেপ নেই আর ওই দেশের স্থানীয় মানুষজনের হাবভাব দেখে, আমার মনে হল তারাও এসব দেখে অভ্যস্ত! কিন্তু আমার “বাঙালী চোখ” সবদিকেই ঘুরতে থাকলো এবং আমি যথাসাধ্য তাতে সেন্সরের কাঁচি চালাতে চালাতে লেকের উপরের সেই কাঠের পুলে উঠে পড়লাম।

কাঠের সেতুটার উপর উঠতেই মনটা ভাল লাগায় ভরে গেল! দিগন্ত জোড়া সবুজের মধ্যে এক বিস্তৃত সবুজাভ জলের লেক, তার উপর কমপক্ষে ২০ ফুট চওড়া ও কয়েক কিলোমিটার লম্বা সম্ভবত সেগুণ কাঠের তৈরি শক্তপোক্ত সেতুটা যেন ভাসছে! লেকের জল যদিও নীল হওয়ার কথা ছিল কিন্তু তাতে কিছুটা শেওলা জন্মানোর কারণে সবুজ রঙ ধারণ করেছে। বোঝা যাচ্ছে এখানে কিছুটা অব্যবস্থাপনা থাকেলও আমাদের মত সর্বদা সুযোগ সন্ধানী সরকারী-বেসরকারি লোকজন ডাইরেক্ট সুয়ারেজ লাইনের সংযোগ এর সাথে এখনো দেয়নি। আর তাইতো লেকের জলে কোন দুর্গন্ধ নেই, যা আমরা হর হামেশাই দেখে থাকি আমাদের দেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে!

ইয়াঙ্গুনে আসার পর একটা বিষয়ে আমার প্রথম থেকেই খটকা লেগেছিল তা এই পার্কে এসেও দূর হলো না। এত গাছপালা থাকা সত্ত্বেও পার্কে আমি খুব বেশি পাখি দেখতে পাচ্ছি না। সেই আমাদের ঢাকার মতই শুধুই কাকের ডাকাডাকি আর কিছু শালিক, চড়ুই-এর ওড়াওড়ি দেখতে পাচ্ছি। দুই একটা টিয়ের ডাকও শুনতে পেলাম কিন্তু এর বাইরে তেমন কিছুই দেখলাম না। তবে পাখি দেখতে না পাড়লে কি হবে, এখানে আছে প্রচুর অক্সিজেন সমৃদ্ধ একরাশ সুবাতাস।

সন্ধ্যা ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে, লেকের জলে বড় বড় মাছেরা মাঝে মাঝে আলোড়ন তুলে তাদের সান্ধ্য আহার সারছে। এই সুযোগে ছোট ছোট সাদা বাদুরগুলো উড়তে উড়তে লেকের জলে ছোঁ দিয়ে দিয়ে ছোট মাছ আর জলের পোকা দিয়ে তাদের ব্রেকফাস্টটা সারছে! জলের মাঝে মাঝে ফুটে থাকা পদ্মফুল ও তার পাতাগুলো ঢেউয়ে দোল খাচ্ছে। সেতুর কাছাকাছি একটা পদ্ম পাতায় কয়েকটা ছোট ব্যাঙ বসে আছে, নির্ভয়ে! আমি কয়েকবার হাত নেড়ে ওদের ভয় দেখাতে চেষ্টা করলাম কিন্তু তাতে কোন লাভ হল না। ওদের ভাবখানা এমন, “আমরাও সারাদিনের ক্লান্ত শরীরটাকে জিরিয়ে নিচ্ছি এখানে, তুমি কে হে ভাই? আমাদের ডিস্টার্ব করছো? তফাৎ যাও”! ভাবা মাত্র আমি তফাৎ গেলাম সেখান থেকে!

পার্কের সিকিউরিটি গার্ড বড় একটা ঘণ্টা বাজিয়ে বাজিয়ে সবাইকে জানান দিচ্ছে; সময় শেষ এখন পার্ক বন্ধ হবে! আমি আর কাল বিলম্ব না করে বেড়িয়ে পড়লাম! হাঁটতে শুরু করলাম হোটেলের দিকে! ভয় হচ্ছিল দিক হারালাম কি!

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে; আমি জোড় কদমে ও কিছুটা দৌড়ে ঠিকঠাক হোটেলে ঢুঁকতেই হোটেলের নারী কর্মীরা একযোগে চিৎকার করে উঠলো! আমি ইশারায় বললাম, কারণ কি? ওরা উত্তর দিলো, স্যার আপনি ছাতা নেননি; ভিজে ফিরবেন বলে টেনশন করছিলাম!

মনে মনে বললাম, ৫-৭ জন সুন্দরী টিনএজড নারী তোমার জন্য টেনশন করছে; সুকান্ত, তুমি তো বাংলার হিরু! আমিও তৎক্ষণাৎ রেস্টুরেন্টের টেবিলে বসে ওয়েটারকে ভাবে বললাম, বিয়ার লে আও! গলার স্বরে চাইনিজগুলো ল্যাপটপ থেকে মাথা তুললো!

আফটার অল বাংলার হিরু বলে কথা >>>

আপডেটঃ ০৬/০৬/২০১৫ রাতঃ ১১.২৫

ইয়াঙ্গুনে কয়েকদিনঃ ১ম পর্ব,২য় পর্ব,৩য় পর্ব,৪র্থ পর্ব,৫ম পর্ব ৬ষ্ঠ পর্ব