ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 

রোজার সময় বিধায় আমাদের আরও কলিগ যারা অনেক আগে থেকেই মায়ানমারে পোস্টিং-এ আছেন; তারা ইফতারের জন্য সন্ধ্যায় হোটেলেই থাকেন। কিন্তু আমি একা একা কি করবো ভেবে সন্ধ্যার পর একাই ঘুরতে বের হতাম প্রতিদিন। আজ যেহেতু বৃষ্টি তাই রুমে বসে ল্যাপটপে টুকটাক লেখার চেষ্টা করছি। এমন সময় আরমান স্যার রুমসেটে ফোন দিয়ে তার রুমে ডাকলেন। যেয়ে দেখি ইফতারির বিশাল আয়োজন; নানা রকমের খাবার সাজিয়ে তিনি একাকী বসে আছেন। আমি দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতেই বললেন, সুকান্ত আসো, একসাথে ইফতার করি। আমিও দেরি না করে চেয়ার টেনে বসে গেলাম।

বন্ধুদের সাথে ইফতারি খাওয়ার অভ্যাস আমার সেই ছোটবেলার; বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পর এটা বহুগুণে বেড়েছিল। এমনও হয়েছে পাশাপাশি বসে যাওয়া তিন-চারটা বন্ধু গ্রুপের সাথে একসাথে এটা খেয়েছি। তারমানে কিন্তু এই নয় যে, আমি সবসময় বিনে পয়সায় তা খেয়েছি। খেয়েছি সব ছাত্র সংগঠনেরই বন্ধুদের সাথেই; তাই আমি এই বিষয়ে সব নিয়ম কানুন জানি; জানি ধর্মীয় আঁচার আচরণও! এমনকি ২০০০ সালে তখন আমি MBA লাস্ট সেমিস্টারে; নিজে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছি একটা অরাজনৈতিক সংগঠনের সেক্রেটারি হিসেবে এবং তাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সময়ের ভিসি সাইদুর রহমান স্যার ছিলেন প্রধান অতিথি আর উপস্থিত ছিল হাজারখানেক ছাত্র ও অন্যান্য স্যারেরা। সেটা অবশ্য ছিল ভিন্ন বিষয়; ভিন্ন পেক্ষাপটে!

খাবারের দিকে ইশারা করে আরমান স্যার বললেন, এসবই পলাশ ভাইয়ের ওয়াইফ রান্না করে পাঠিয়েছে! আমাদের জন্য ইলিশ মাছ ভাঁজাও পাঠিয়েছেন সাথে ভাতও আছে! আমি আর লোভ সামলাতে না পেরে ঢেকে রাখা একটা বোলের ঢাকনা তুলে দেখি সেটা ভর্তি ইলিশ মাছ ভাঁজা; সব ইরাবতী নদীর ইলিশ, সাইজে অনেক বড়! অনেক কষ্টে লোভ সামলে খুশি মনে চুপচাপ ইফতারের সময়ের অপেক্ষা করতে থাকলাম; একটু পরে আমাদের নতুন জুনিয়র কলিগ আওয়াল এসে আমাদের সাথে যোগ দিলো।

আমাদের কোম্পানির RND বিভাগের ডেপুটি হেড আরমান স্যার অনেকদিন ধরেই এদেশে আছেন। তিনি একনিষ্ঠ ধার্মিক আর খুবই অল্প কথার মানুষ; লেখালেখির অভ্যাসও ওনার আছে। যার কারণে আমাদের প্রতিষ্ঠানে ওনার একটা আলাদা সুনাম আছে এবং মালিক লেভেলেও আছে তার ডাইরেক্ট এক্সেস। কর্মসূত্রে যদিও তিনি আমার ডাইরেক্ট রিপোর্টঙে নেই; কিন্তু গত ৭ বছরে ওনার সাথে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কাজ, অভিজ্ঞতা নিয়ে ভালমন্দ অনেক আলোচনাই হয় আমাদের মধ্যে। ইফতারির পর ইলিশ মাছ ভাঁজা দিয়ে অল্প কিছু ভাত খেয়ে অনুমতি নিয়ে আমার রুমে ফিরলাম।

ইলিশ মাছ ভাঁজার গল্পটা আর একটু পরিষ্কার করে বলি, পলাশ নামে বাংলাদেশেরই একটা ছেলে অনেক আগে ইয়াঙ্গুনে এসে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এখন ব্যবসা করে ও ফ্যামিলি নিয়ে সেটেল্ড। এমনকি তার বাচ্চার জন্মও এদেশে। এই পলাশ ভাইয়ের সাথে আমাদের কোম্পানি এডভাইজার কাম হেড অব RND, ডাকসাইটে রাশেদ স্যারের অনেক আগে থেকেই পরিচয়; শোনা যায় এই স্যারই ওনাকে প্রাথমিক অবস্থায় কিছু সাহায্য করেছিলেন এদেশে। সেগুলো অন্য কাহিনী আমার জানার বিষয় নয়। রাশেদ স্যার আবার আরমান স্যারের ডাইরেক্ট বস। আমার রিপোর্ট চ্যানেলে তিনিও নেই কিন্তু তিনি আবার এক্সপোর্টের কাজ করতে খুব পছন্দ করেন এবং আমার বস খান স্যার আবার তার খুব কাছের জুনিয়র যদিও তিনিও সিনিয়র এক্সজিকিউটিভ ডাইরেক্টর। এনার সাথে আমার আবার অম্লমধুর সম্পর্ক; যদিও তার সাথে আমার পজিশনে আকাশ আর পাতাল পার্থক্য কিন্তু তিনি আমাকে পছন্দ করেন; আবার সময় অসময়ে আমাকে ঘাইও খাওয়ান। আবার আমিও তার মুখের উপর না করার অসম্ভব ক্ষমতা দেখিয়েছি অতীতে; এখনো কথা বলি সরাসরি; যা শুনে অনেকেই ভিম্রী খায়।

সেই রাশেদ স্যার, মায়ানমার আসার দুইদিন আগে আমার বসের সামনে আমাকে ডেকে বললেন, ওই, তুঁই যে মায়ানমার যাচ্ছিস সাথে কি নিবি? আমি বললাম, কি নিবো আর; স্যাম্পল নিবো? সে গালি দিয়ে বললো, ক্যান তোর কি ইলিশ মাছ খাওয়ার ইচ্ছা হয় না? বললাম, হয়! ক্ষেপে যেয়ে বলল, তাহলে পলাশ আর তার মেয়ের জন্য ভাল দেখে ৫ কেজি মিষ্টি কিনে নিয়ে যাবি; কালচার শেখ! না হলে কিন্তু তোর খবর আছে। আমি বললাম, ঠিক আছে স্যার; অফিস থেকে টাকা তুলে দ্যান! এবার তিনি কিছুটা ব্যাক গিয়ার মেরে বলল, টাকা তুঁই তুলবি আমাকে জড়াস ক্যান এর সাথে? বললাম, বা! আপনিই বললেন, আর আপনি যদি আমাকে টাকা না দ্যান তাহলে কে এই বিলে সাইন করবে? আমার ট্যুর এপ্রুভালে এটা নাই। এবার সে প্যাঁচে পড়ে গেছে, আমি তার এই রোগ জানি আর এ কারণেই সে আমাকে কোনদিন কাইত করতে পারে নাই। যদিও আমাদের অনেক সিনিয়রেরই হাত পা কাপে শুধু ওনার নাম শুনলেই।

দুষ্টামি যাই করি, তার কথা তো আর ফেলতে পারি না; পরে আলাদা এপ্রুভাল করে প্রিমিয়াম সুইটস থেকে দুই পদের সন্দেশ কিনে নিয়ে আমি, আমার বস আর রাশেদ স্যার একসাথে ব্যাংকক এয়ারওয়েজের বিমানে উঠেছিলাম। বর্তমানে ওনারা আছেন ফাইভ স্টারে আর আমরা আছি আমাদের এই হোটেলে; মনে হয় এটা থ্রি স্টার হবে! মামুন ভাইই সবকিছু ঠিক করে রেখেছিল। এই মামুন ভাই আবার পলাশ ভাইয়ের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে এবং আমাদের দেশী ছেলে। আমাদের প্রতিষ্ঠানের আরও অনেকেই এদেশে এসেছেন এবং অনেকেই আছেন অনেকদিন ধরেই কিন্তু তাদের কাজ ভিন্ন ভিন্ন; আমি আর আমার বস এসেছি বাংলাদেশ থেকে এখানে আমাদের পণ্য রফতানির ফিসিবিলিটি স্টাডি করতে; পাড়লে কিছু অর্ডার সাথে করে নিয়ে যেতে।

রাত দশটার দিকে আরমান স্যার আমাকে আবারো রুমে ডাকলেন, বললেন, আসো গল্প করি। আমি গেলাম তার রুমে। একই রুমে অনেকদিন ধরে থাকার কারণে টুকটাক সবই আছে তার। তিনি নিজ হাতে চা বানিয়ে আনলেন। চা খাওয়ার এক ফাঁকে বললেন, দ্যাখো এদেশে ব্যবসা হবে খুব টাফ বাট যদি একবার মনোযোগ দিয়ে এবং লাইন ঘাট ঠিক করে চালু করা যায় তাহলে তা হবে খুবই লাভজনক। দেখেছো সামান্য একটু ডোর ওপেন করে দেওয়াতেই উন্নত দেশের ব্যবসায়ীরা কিভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সব হোটেলের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেছে মাত্র তিন-চার মাসের মধ্যেই। ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে এখন আর রুম ফাঁকা পাওয়া যায় না। আমি বললাম, আমি আসার সময় দেখেছি, ব্যাংকক থেকে কানেক্টিভ ফ্লাইটের প্রায় সবাই ছিল ইউরোপিয়ান আর চাইনিজ কিছু ইন্ডিয়ানও ছিল। তিনি বললেন, হ্যাঁ সবাই আসছে অনেকেই ব্যবসা পাবে কিন্তু আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য তা টাফ হবে। বললাম, কেন? তিনি বললেন, এর দুটো কারণ- এক) আমরা অন্য দেশের মত ঝুঁকি নিতে পারবো না বা সরকারের সেই ক্ষমতা নেই। দুই) রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে ওরা আমাদের ঠিক সহজভাবে নেই না যদিও সেটা ওরা কখনো প্রকাশ করে না বা মুখ ফুটে বলে না। আমি বললাম, এছাড়াও আমার কাছে আরও কিছু বিষয়ে খটকা লেগেছে- যেমন একটা এলিট শ্রেণী আছে এদেশে যারা আসলে সবকিছুই নিয়ন্ত্রণে রেখেছে বাকীরা সব আম আদমি। আর আমার মনে হয়েছে আমরা যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই আমাদের নজরে রাখা হয়েছে অথবা নিজস্বার্থে বা পরে কেউ চাইতে পারে ভেবে আমাদের সব ভিজিটেই কেউ না কেউ ভিডিও করছে বা ছবি তুলছে! কেন? তিনি বললেন, এটাই আসল ঘটনা! এসব নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে।

আর শোন তোমাকে ছোট ভাই হিসেবে একটা ব্যক্তিগত কথা বলি, এদেশে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে বেশী একটিভ। আমাদের দেশে প্রস্টিটিউশনকে যে চোখে দেখে এখানে সম্ভবত সেভাবে দেখা হয় না; চাইলেই মাত্র ২০ হাজার চাটে অর্থাৎ বাংলাদেশী মাত্র ২ হাজার টাকায় রুমে একটা বিউটিফুল মেয়ে চলে আসবে; তবে কেউ না চাইলে এখানে কেউ ডিস্টার্ব করবে না! আমি বললাম, কিছুটা আন্দাজ করি তবে টেনশন নিবেন না; আমি এদিকে ঠিক আছি স্যার! আমি জানি বলে তিনি হেসে দিলেন। গুড নাইট বলে নিজ রুমে চলে এলাম।

ইয়াঙ্গুনে কয়েকদিনঃ ১ম পর্ব, ২য় পর্ব, ৩য় পর্ব, ৪র্থ পর্ব, ৫ম পর্ব, ৬ষ্ঠ পর্ব, ৭ম পর্ব

### নিজেরটা ঠিক রেখে অন্য নামগুলো পাল্টে দিলাম।

সময়কাল ২০১২ সাল। লিখলামঃ ১২/০৬/২০১৫ রাতঃ ৯.০১