ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

শ্রাবণের এই শুক্রবারে বাসায় কেউ নেই। কেউ নেই এটা বলাটা আবার ভুলও হচ্ছে! আমার ভাতিজা সমুদ্র আছে বাসায়, সে ইন্টার পরীক্ষা দিয়ে এখন পরবর্তী শিক্ষা জীবনের প্রস্তুতি নিচ্ছে; করছে কোচিং। ঘুমিয়ে আছে পাশের রুমে। আমার বাচ্চা দুটো গেছে ওদের মামার বাড়ী, সাথে নিয়ে গেছে আমার বউটাকেও; তার বাপের বাড়ী। আর এই ফাঁকে আমি পেয়ে গেলাম একটা পুড়াই ফ্রি দিন। সত্যি বলতে কি- অনেকদিন পর আজ একদিনের পরিপূর্ণ ছুটি পেলাম। তাছাড়া গত ১৫ দিন একটানা ব্যস্ত ছিলাম; রাতে বাসায় এসে ঘুমানোর সময়টুকু বাদে। যার কারণে অনেককিছুর সাথে লেখালেখি থেকেও দূরে ছিলাম কিন্তু মনটা পড়েছিল এদিকেই।

বাইরে ঝর ঝর করে বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কোমেনের রেশ গতরাত থেকেই ঢাকায় পড়তে শুরু করেছে। আমার পাশের বাসাটার চাল টিনের হওয়ায়- বৃষ্টি পড়ার একটা মধুর শব্দ পাচ্ছিলাম সেই তখন থেকেই। সাথে ফ্রি পাচ্ছিলাম খোলা জানালা দিয়ে আসা দমকা বাতাসের হিমেল পরশ! যদিও ডেঙ্গু মশার ভয়ে এই সিজনে রাতে জানালা খুলে রাখতে আমার ভয় করে! আর তাই তো এই বিপদটাকে মিনিমাইজ করার জন্য বারান্দায় থাকা ফুল গাছের বালতী দুটোতে একদিন পর পর এরোসল স্প্রে করি; যাতে মশা সেখানে বসত গড়তে না পারে।

কথায় আছে, মানুষ অভ্যাসের দাস! কথাটা সত্যি! অনেক চেষ্টা সত্যেও প্রতিদিনের মত আজও খুব ভোরেই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সাথ সকালে উঠে বারান্দায় থাকা আমার নয়নতারা গাছটাকে দেখতে গেলাম। কেন যেন ওর পাতাগুলো হলুদ হয়ে ঝরে যাচ্ছে, ফুলগুলো হয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট। তবে কি সে বুড়ো হয়ে যাচ্ছে? হেঁটে যাচ্ছে মৃত্যুর দিকে? যদিও গাছটা এখনো ফুলে ভরপুর! আর দেখলাম, এই ফাঁকে ওর ছায়ায় থাকা ছোট চন্দনের চারাগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে, বালতির সামান্য মাটি আর বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আসা সূর্যের আলোটুকুর দখল নিতে। প্রবাদে আছে- একজনে সর্বনাশ আর অন্যজনের পৌষ মাস! আবার এটাও বলা যায়- প্রকৃতিতে কখনো কিছু ফাঁকা থাকে না। পুড়নোকে রিপ্লেস করতে নতুন ধেয়ে আসে!

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী জনাব কালাম মারা গেছেন। আমি তাকে খুবই পছন্দ করতাম। অনুসরণের চেষ্টা করতাম তার কার্যক্রম। আমি প্রথম তার নাম জানি সেই ছোটবেলাতেই; পত্রিকায়। জানতাম ভারতের আণবিক বোমা তৈরির প্রধান কারিগরদের মধ্যে তিনি একজন। এরপর ভারত যখন অগ্নি মিসাইলের প্রথম পরীক্ষা চালায় তখন তার সম্পর্কে ভালভাবে জানতে পারি; সেই সময় আমি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র ছিলাম।

ওনার কথাগুলো আমার ভাল লাগতো, ভাল লাগতো তার জীবনযাপন। শুনেছি তার একটা মাত্রই শখ ছিল, আর সেটা হলো- তার ‘হেয়ার স্টাইল’! তিনি নাকি একই নাপিতের কাছেই চুল কাটাতেন। যদি কখনো দূরে থাকতেন তাহলে বিমানে করে সেই সেলুনেই যেতেন। বন্ধু ফারুকের সাথে এটা নিয়ে আড্ডায় অনেক ঝগড়া হতো আমাদের। ওর কথা ছিল, একজন সর্বত্যাগী মানুষের এই ব্যয়বহুল শখ থাকবে কেন? আর আমার পাল্টা যুক্তি ছিল, ত্যাগী হলেও তিনি একজন মানুষ আর তার একটা শখ থাকতেই পারে? হয়ত এটা থেকে সে আনন্দ পায়, পায় কাজের অনুপ্রেরণা!

সেই কবেই তার উইংস অব ফায়ার কিনে পড়েছিলাম। আর অনেককিছুর সাথে আমার এই বইটাও হারিয়ে গেছে। তবে মনে গেঁথে আছে আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য বলা তার সেই অমর বানীটা –

“কাজকে ভালোবাসো, প্রতিষ্ঠানকে নয়! যদি কাজকে ভাল না বেসে প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসো; তাহলে একদিন দেখবে প্রতিষ্ঠান তোমাকে ভুলে গেছে”

আমি কথাটা সবসময় মনে রাখি; কলিগদের মাঝেমাঝে বলি এবং নিজে এখন মানি।

৩১/০৭/২০১৫ সকালঃ ৮.১৯