ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, শিল্প-সংস্কৃতি

যখনই আমি কোন পালবাড়ীর পাশ দিয়ে যাই, তখনই ভীষণ কষ্ট লাগে! দেখতে পাই- কত যত্নে আর ভালাবাসায় তারা তাদের পূর্ব পুরুষদের পেশাটাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন! আর ছোট ছোট মাটির পুতুল থেকে শুরু করে হাঁড়ি পাতিল তৈরীরত নারী-পুরুষদের মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তারা কতই না কষ্টে আছেন!

আমি পুজোর মেলা থেকে প্রতিবারই এদের বানানো মাটির নানা খেলনা আমার মেয়ের জন্য কিনে থাকি। সত্যি বলতে কি, দোকানদারের কাছে এসব পণ্যের দাম জিজ্ঞাসা করতে আমার লজ্জা লাগে! এর কারণটা হলো- এরা হাতে বানানো সুন্দর পাখিটার দাম চায় মাত্র পাঁচ টাকা অথচ আমি আমার মেয়ের জন্য তখন একশত টাকা খরচ করতে রাজি থাকি! সেই সময়গুলোতে আমি যা করি তা হলো- মেয়ে না চাইলেও কয়েকটা খেলনা একসাথে কিনে ফেলি!

Mrit Shilpo

আমরা যারা বর্তমান সমাজের খোঁজখবর রাখি, তারা নির্দ্বিধায় বলতে পারি এই পেশা বিলুপ্তির পথে। আর বর্তমানে এই পেশায় নিয়োজিত কর্মীরাই শেষ প্রজন্ম; যদি না তারা তাদের পূর্বপুরুষের জ্ঞানের সাথে নতুন জ্ঞানের সন্নিবেশ ঘটান; বাজারজাতকরণের নতুন আইডিয়াতে নজর দেন!

আমি মনে করি, সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসা উচিত মানুষের আদিমতম ও সুন্দরতম এই পেশাটাকে টিকিয়ে রাখার প্রতয়ে! বিশেষ করে যারা সুপারস্টোর বা চেইনস্টোর পরিচালনা করেন, তারা ইচ্ছে করলেই এই হাতে তৈরী পণ্যগুলোকে তাদের সেলফে জায়গা দিয়ে প্রমোট করতে পারেন। পারেন নতুন নতুন টেকনোলজি এইসব জাতশিল্পীদের হাতে তুলে দিতে। এতে করে আমাদের ঐতিয্য রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা দরজাও খুলে যেতে পারে!

আমাদের বাঙাল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অনেকেই হয়ত নাক সিঁটকাতে পারেন এই ভেবে যে, এইসব কমদামি পণ্য আমাদের দামি সেলফে তুললে তা আমাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু কমিয়ে দিবে! তাদের জন্য বলি, হ্যাঁ! এইসব পণ্যের প্রসারে- গোড়ালির কাপড় হাঁটুর উপর তুলে কারিনা-কাটরিনা’রা হয়ত রঙ দেখানোর আড়ালে ঢং করবে না, কিন্তু এই পণ্যটা বিক্রি হলে গ্রামের ঘোমটা মাথার যে কুলবধূটি কোলের ছেলেকে মাটিতে রেখে একমনে পুতুলটির চোখ আঁকছেন- তার একটা নতুন শাড়ীর ব্যবস্থা হবে। যে শিশুটি শিল্পী মায়ের কোলে জায়গা না পেয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, সে হয়ত একটি বছর আগে স্কুলে যেতে পারবে!

অপরদিকে আপনারা পেতে পাড়েন ডঃ ইউনুস ও ডঃ আবেদের মত বিশ্বজোড়া সম্মান! এই পন্যকে প্রমোট করার মত অর্থ, জ্ঞান ও টেকনোলজী আপনাদের আছে। এখন জাস্ট একটুখানি ইচ্ছা দরকার। আমাদের হস্ত ও মৃৎশিল্পের খ্যাতি বিশ্বজোড়া এবং কমপক্ষে আড়াই হাজার বছরের প্রমাণিত ঐতিয্য আছে আমাদের। এটাই আমাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু।

এখানে একটা তথ্য যোগ করি, চীনের উদীয়মান কোটিপতিরা বছরে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে আসল ও নকল এন্টিক কেনা কাটায়! আমাদের নকল পণ্য তৈরির দরকার নেই, আমাদের যা আছে তা আরও একটু মডিফিকেশন করে আমরা সেখানে বাজারজাত করতে পারি।

কালিগঞ্জে এক অচেনা নদীর ঘাটে- পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে থাকা মানুষটির মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তিনি টিকে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন! ছবিই কথা বলছে!

২৭/১১/২০১৫ বিকালঃ ২.৪৯