ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

বানরের পিঠা ভাগের গল্প কে কে জানেন হাত তোলেন? আর যারা জানেন না তারা শোনেন বানরের পিঠা ভাগের কাহিনী; নতুন করে-

ভাগাভাগি নিয়ে অনেক ক্যাচালের পর এক বানরকে দেওয়া হলো, পিঠা’টাকে সমান দুইভাগে ভাগ করার জন্য। বানর পিঠাটা হাতে নিয়েই দুহাতের চাপে তা ভেঙে ফেললো। তারপর তাকিয়ে দেখলো তার ডান হাতের ভাগটা বাম হাতের ভাগের চেয়ে একটু বড় হয়েছে। এবার বানর বড় টুকরাটাকে এক কামড়ে ছোট করে নিলো! খেয়ে ফেলা অংশটা ধারণার চেয়ে একটু বড় হওয়ায় এবার সে বাম হাতেরটাকে ছোট করার জন্য আবার কামড় দিলো। এভাবে কয়েক কামড়ে পিঠা তো সমান দুভাগে ভাগ হলই না- উল্টো পিঠার দাবীদার’রা খালি হাতে বিদায় নিলো আর বানরের হলো উদরপূর্তি।

সিরিয়ার অবস্থা দেখে আমার বার বার বানরের পিঠা ভাগের গল্পটা মনে পড়ছে।

আর অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সিরিয়ানদের তাদের মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে আরও সময় লাগবে। তখন হয়ত ‘সিরিয়া’ দেশটাই পিঠা ভাগের মত ভাগাভাগির খপ্পরে পরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

আমরা যারা দাবা খেলা শিখেছি, তারা জানি- কিভাবে দাবার বোর্ডে একটা সামান্য বড়েকে কেদ্র করে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে? সিরিয়াকে নিয়ে সেই দাবা খেলা শুরু হয়েছে। প্রথমে এই যুদ্ধের কলকাঠি নেড়েছে আমেরিকা ও তার ইউরোপিয়ান মিত্র’রা অবশ্যই দাবার ‘নৌকা’ হয়ে সাথে ছিল ন্যাটো! আর ছিল পেট্রোডলারের ভারে অস্থির মধ্যপ্রাচ্যের ধনী রাজপরিবারেরা! এরা এই খেলায় ‘ঘোড়া’র রোল প্লে করছে আর পেট্রোডলারের বস্তা কাঁধে নিয়ে সমানে লাফাচ্ছে! একবারও ভাবছে না- এই বস্তা খালি হওয়াটা অল্পকিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র! দাবার ওস্তাদেরা জানে, কিভাবে ঘোড়াগুলোকে ফাঁদে ফেলে আটকানো যায়! তাদের নড়াচড়া বন্ধ করা যায়! আর এই খেলায় ঘোড়া যখন আটকায়- তখন তার সামনে আত্মহুতি দেওয়া ছাড়া অন্যকোন পথ খোলা থাকে না।

সিরিয়ার বোর্ডে প্রেসিডেন্ট আসাদ ‘রাজা’ হয়ে সটান আছেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ‘মন্ত্রী’ রাশিয়া। দুপাশে এক ঘোড়া আর এক হাতি হিসেবে আছে ইরান আর হিজবুল্লাহ। আর আছে কিছু আফগানি আর পাকিস্তানী ‘শিয়া মতাবলম্বী’ সৈন্য ‘বড়ে’ হয়ে। খেলার প্রথমেই আসাদ তার এক ঘোড়া, এক হাতি আর নৌকাগুলোকে হারিয়েছিল। কিন্তু ‘মন্ত্রী’ রাশিয়া যেহেতু একাই খেলছে- তাই আপাতত তাদের অভাববোধ করছে না সে, যতক্ষণ না বিপক্ষের ‘মন্ত্রী’ আমেরিকা খেলায় নামছে! কিন্তু এবার এই বিপক্ষ ‘মন্ত্রী’ নিজে যুদ্ধ করার চেয়ে ঘোড়া, হাতি আর নৌকা দিয়েই যুদ্ধ করাতে চাইছে। কারণ সে জানে বিপক্ষ ‘মন্ত্রী’ তাকে এবার ছেড়ে কথা বলবে না, মিঃ পুতিন এবার ডু অর ডাই মুডে খেলছেন! তাই সে আপাতত এই খেলায় ‘দুই ঘোড়া’ তুরস্ক আর সৌদিকে নামাতে চাচ্ছে, স্থল যুদ্ধের অনুপ্রেরণা দিচ্ছে!

ধারণা করি- এই যুদ্ধে ‘ঘোড়াদ্বয়’ এমনভাবে আটকা পড়বে যে, তারা আর বোর্ড ছেড়ে বের হতে পাড়বে না। উল্টো তাদের দলের ‘মন্ত্রী’র কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে কিনতে ফতুর হতে হবে। অপরদিকে, বিপক্ষ মন্ত্রী’র গুঁতায় সেই অস্ত্র আবার ছাতু হবে! কারন এগুলো যত ছাতু হবে, তত বেশী অর্ডার যাবে আমেরিকায়! হিসাব একেবারে সোজা! হয়ত আমেরিকার কাছ থেকে গোপনে কিছু ক্ষতিপূরণও পেয়ে যেতে পারে রাশিয়া- রুটির ভাগ হিসেবে!

দাবা খেলায় আর একটা অলিখিত নিয়ম আছে, সেটা হলো- বিপক্ষ ‘মন্ত্রী’র আক্রমণ ঠেকাতে হলে নিজ পক্ষের ‘মন্ত্রী’কেও প্রতি আক্রমণে যেতে হয়, নইলে জেতা যায় না! ধারণা করি, এই খেলায় শুধু ‘মন্ত্রী’ না, ইউরোপিয়ান হাতি’রাও নামবে না! কারণ নেপোলিয়ান থেকে হিটলার- কেউই রাশিয়ান ‘ভল্লুকের’ থাবা থেকে রক্ষা পায়নি! তাই আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, এই যুদ্ধে হাতি’রুপী ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি’রা নামবে না! ইতিহাস বলে, আক্রান্ত হলে রাশিয়ান’রা যুদ্ধের শুরুতে কিছুটা হারলেও শেষ পর্যন্ত লড়তে লড়তে জিতে যায়! আর তুরস্ক, ন্যাটোর আশ্বাসে ভর করে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে যেতে চাচ্ছে কিন্তু ফল হবে উল্টো- শেষবেলায় ন্যাটো তুরস্ককে বলবে, “আমি কি তোমাকে এই করতে বলেছিলাম?” আমি মনে করি, তুর্কিদের লিও টলস্তয়-এর “ওয়ার এন্ড পিস” বইটা পড়া উচিত! তাহলেই তারা বুঝতে পাড়বে জেনারেল কুস্তভ কে? কেন রাশিয়ানদের ভল্লুক বলা হয়?

তবে কি এই যুদ্ধের খেলা হবে না? হবে! এবার খেলার চাল এই বঙ্গদেশ পর্যন্তও আসতে পারে আর প্রথমেই যাবে ‘বড়ে’, দু-পক্ষেই!

অনেকেই আমাকে বলতে পারেন, ওরা যুদ্ধ করছে তাতে তোমার কি হে বাপু! আরে ভাই, আমি এই যুদ্ধের খবর রাখি পেটের দুঃখে আর পিঠ বাঁচাতে! ইয়েমেনে যেদিন সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয় তার কয়েকদিন আগেই আমি তা আঁচ করতে পেড়েছিলাম কারণ আমি মেইনস্ট্রীম-ডাউনস্ট্রীমের প্রায় সব খবরা-খবর রাখছিলাম! হুতি’রা এগিয়ে যাচ্ছে সানার দিকে আর প্রেসিডেন্ট সালেহ পালানোর বিমান রেডি করছে! এইসব খবর পাচ্ছিলাম প্রতিনিয়ত আর তা থেকেই নিজের মনে একটা ‘ফ্রেম’ তৈরী হচ্ছিল! বুঝতে পাড়ছিলাম, কি হতে যাচ্ছে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে।

আমরা যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজ করি, তাদের নিজের পেট ভরাতে শুধু সেলস টার্গেট পূরণ করলেই চলে না, টাকা এনে পিঠ বাঁচাতে চাইলে রাস্তার পিচ থেকে শুরু করে জাহজের ইঞ্জিনেরও খবর রাখতে হয়! নইলে বড় কোন বিপদ হলে ন্যাটোর মত করে বস বলবে, আমি কি এই করতে বলেছিলাম?

অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে আমি ইয়েমেনে আমাদের ব্যবসাটা ডেভেলপ করেছিলাম। এখানে জানিয়ে রাখি, আমাদের রফতানীকৃত এই পন্যটা বাংলাদেশের রফতানি বাস্কেটে ‘নতুন পন্য’ হিসেবে স্বীকৃত। মূল যুদ্ধটা শুরু হওয়ার আগে আগে আমাদের দুবাইয়ের এজেন্ট মিঃ দীপক চার লাখ ডলারের একটা বড় অর্ডার প্লেস করলো সাথে মুল্যে একটা বড়সড় ডিস্কাউন্টও চাইলো। এটা ছিল আমাদের পাওয়া সবচেয়ে বড় অর্ডার, পন্য যাবে এক চালানে। লাগবে প্রায় ৪০টা ফরটি ফিট হাইকিউ কন্টেইনার। আমরা যেখানে এক ডলারের অর্ডার পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস বায়ারের পিছনে ঘুরে বেড়াই সেখানে এত বড় অর্ডার পেয়েও আমি তেমন উৎসাহ দেখালাম না কারণ আমি বুঝে গিয়েছিলাম, মাস দুয়েক পরে যখন এই পন্য এডেন বন্দরে পৌঁছাবে তখন হয়ত সেখানে মূল বায়ারকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি ওভার ফোনে দীপককে এই বিষয়ে সতর্কও করেছিলাম।

এখানে আমার পেটের চেয়ে পিঠটাই মুখ্য হয়ে গিয়েছিল। আর দীপক পেটকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে সেই পন্য কিনলো চিন থেকে। একদিন দুপুরে পন্য বোঝাই কন্টেইনারগুলো জাহাজে ভাসমান রেখে সে আমাকে ফোন দিয়ে অনুরোধের স্বরে জিজ্ঞাসা করলো, আমরা তার সেই পন্যটা কিনতে পারবো কিনা? বা আমি অন্যকোন জায়গায় সেটা বেঁচে দিতে পারবো কিনা? যেহেতু স্পেসিফিকেশন ভিন্ন ছিল, তাই আমাকে দুঃখের সাথে ‘না’ বলতে হয়েছিল তাকে। পরে শুনেছিলাম, সেই শিপমেন্টে তারা হিউজ লস করেছিল এবং সবশেষে বলেছিল, সুকান্ত, তোমার কথাই ঠিক হলো! সেই থেকে আমাদের ইয়েমেনের ব্যবসা বন্ধ অথচ ২০১৩ সালে এখানে আমি একাই দুই মিলিয়ন ডলারের বেশী পণ্য রফতানী করেছিলাম। আগের, পরের বছর মিলে সংখ্যাটা আরও বড় হবে। শখ ছিল ইয়েমেনে কাজের সুযোগে বেড়াতে যাবো, সেটাও আর হলো না।

বর্তমানে আমাদের ম্যানেজমেন্ট অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসাটা সম্প্রসারণ করছেন, এমতাবস্থায় যদি সর্বাত্মক যুদ্ধটা বেঁধে যায়, তাহলে আমাদের কি হবে? খাবো কি?

তাই বাধ্য হয়েই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের খবর রাখি; নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াই আর কি!

“আদার বেপারীর জাহাজের খবর রাখা”র মত কাহিনীও বলতে পারেন একে? বা বলতে পারেন গরীবের ঘোড়ারোগ?

০৬/০২/২০১৬ রাতঃ ১২.৩০