ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

আমার ফেসবুক বন্ধুর অনেকেই অনেক আজেবাজে সাইটের স্ট্যাটাসগুলো মনের আনন্দে শেয়ার করে, লাইক দেয়। যার অধিকাংশই বানোয়াট খবর, মিথ্যা তথ্যে ভরা আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভরপুর স্ট্যাটাস। ব্রেন ওয়াসকারীরাও এর মধ্যে আছে। এমনকি এর মধ্যে আরও আছে হ্যাকারদের স্প্যামিং সফটওয়ার! যাতে ক্লিক করা মাত্র তাদের কম্পিউটারের যাবতীয় তথ্যের নিয়ন্ত্রণ স্প্যামাররা নিয়ে নিচ্ছে। তোমরা কি জানো যে স্প্যামাররা তোমার ল্যাপটপের ক্যামেরা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও সেটা দিয়ে তোমার ছবি তুলে নিতে পারে? তোমার ঘরে কি কি আছে তার ভিডিও নিতে পারে? তুমি দেখছো তোমার ক্যামেরা বন্ধ আছে! কোন সমস্যা নাই! আসলে তা না, তারা সেই বন্ধ থাকা ক্যামেরা দিয়েই তোমাদের ঘরের একান্ত ছবি বা তোমাদের বাচ্চাদের নগ্ন ছবি তুলে বা ভিডিও করে তা ‘পর্ণ মার্কেটে’ বিক্রি করে দিতে পারে! একটুও টের পাবে না!

মাঝে মাঝেই দেখি- আমার একজনের পর একজন বন্ধু সমানে চিল্লাচ্ছে এই বলে যে, আমার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে আজেবাজে ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে, তোমরা আমার আইডি রিপোর্ট কর ও আমাকে বাঁচাও! তাদের এই কথা শুনি আর হাসি, কেন জানো? কারণ আমি জানি তারা সেই আজেবাজে সাইট যেয়ে মনের আনন্দে পর্ণগ্রাফী দেখেছে আর সেই সুযোগে হ্যাকাররা ওর সাইট হ্যাক করে সেখান থেকে পর্ণ ভিডিও গুলো আপলোড করছে তারই প্রিয়জনের ওয়ালে। এখন অন্যের ফেসবুকের মাধ্যমে তার কান্নার স্ট্যাটাস পরে আমি কি বুঝবো? তোমাদের কি মনে হয় না, তাদের সেই কান্নাকাটি দেখে আমার মনে মায়া মমতা ভেসে উঠে না, বেরিয়ে আসে গালি?

এছাড়াও ধর, আমি তোমাকে যেভাবে চিনি বা তোমার ফেসবুকের আরও শত শত বন্ধু সেই একইভাবে চেনে, জানে তুমি ভাল চিন্তাশক্তির অধিকারী একজন মানুষ। কিন্তু তুমি নিয়মিত শেয়ার করছো সেইসব স্ট্যাটাস যা তোমার সম্পর্কে তোমার বন্ধুদের ভিন্নভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। বিষয়টাকে এভাবে বলা যাক-

ধর, তোমার খুব কাছের বন্ধু তোমার কাছে ১০ টাকা ধার চাইলো কিন্তু তুমি কোন কারনে বললে, নাই। একটু পর সেই বন্ধুর সামনেই তোমার পকেট থেকে কাগজ বের করতে যেয়ে ১০ টাকার একটা নোট মাটিতে পরে গেল! এবার তোমার বন্ধু তোমার সম্পর্কে কি ভাববে? তুমি কি করবে সেই মুহূর্তে? লজ্জা কি পাবে না তুমি? তোমার বন্ধু কি তোমাকে মিথ্যাবাদী ভাববে না?

এখন এটাকে যদি তোমার লাইক বা শেয়ার দেওয়া স্ট্যাটাসের সাথে মেলাও তাহলে কি দেখবে? তুমি মনে করছো আমি এই স্ট্যাটাসে লাইক দিচ্ছি এটা আমি ছাড়া আর কেউ দেখছে না বা আমার যা ইচ্ছে তাই শেয়ার দেবো এতে কার কি? আসলে বিষয়টা তাই, কারও কিছু না কিন্তু দেখবে কিছুদিন পর তোমার অনেক বন্ধুও তোমার সাথে আগের সেই রিলেশন রাখছে না। অপরদিকে তুমি সেই স্ট্যাটাসওয়ালাদের কাছে একটা স্বর্ণের ডিমপারা হাঁসে পরিণত হয়েছো এবং তোমার কাছে তারা শুধু সেই স্ট্যাটাসগুলোই পাঠাতে থাকবে যা তুমি পছন্দ করছো। এভাবেই ওরা একদিন তোমার ব্রেনটাই হ্যাক করে ফেলবে। তারপর ওরা যা বলবে তাই তুমি শুনবে এবং করবে। ততদিনে তোমার এতদিনের অর্জিত শিক্ষা গৌণ হয়ে গেছে।

শুধু কি তাই? তুমি ওদের স্ট্যাটাসগুলো শেয়ার দিয়ে ওদের মনের বাসনা পূর্ণ করার পাশাপাশি একটা স্থায়ী আয়েরও ব্যবস্থা করে দিয়েছো! জান কি, তোমার শেয়ারের কারনে তাদের সাইটে যে হিট বাড়ছে তার উপর ভিত্তি করে ওরা অনলাইন থেকে বিজ্ঞাপন পায় আর তা থেকে ওরা পয়সা কামায়। তার মানে কি দাঁড়ালো? তুমি হিট বাড়াচ্ছো আর ওরা টাকা বানাচ্ছে। অনেকটা কি, “মারবো এখানে আর লাশ পড়বে শ্মশানে” ডাইয়ালগটার মত হয়ে গেল না? বা আমাদের সেই বাংলা প্রবাদের মত, “ডিম পাড়ে হাঁসে খায় বাগডাসে”?

বুঝে দেখো, তুমি ডিম পাড়ছো আর ওরা খাচ্ছে, মাঝখানে তোমার বন্ধুরা তোমার সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা পাচ্ছে!

ভালটা বেছে নাও বন্ধু! কয়েকটা লাইকই জীবনের সবকিছু না!

এরচেয়ে ফেসবুকে নিজের কথা লেখ, নিজের বাবা-মা বা আত্মীয়দের ছবি আপলোড করো, তাদের সম্পর্কে দুই-চার লাইন লেখো, অন্তত আর কিছু না পারলে নিজের ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গীর সেলফি আপলোড করো। সমস্যা কিছু নাই।

আরও ভাল হয় যদি তুমি, তোমার আশেপাশে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা, মানুষের সমস্যা, তাদের সুখ দুঃখের কথা, নিজের মোবাইলে তোলা রাস্তার ছবি, জ্যামের ছবি, ফুলের ছবি বা রান্নার ছবি আপলোড করো! তাতে হয়ত তুমি না বুঝেই “সিটিজেন জার্নালিজম” নামক একটা আধুনিক মাধ্যমে প্রবেশ করবে। দেখবে মানুষের সমস্যা নিয়ে পোষ্ট দিতেও ভাল লাগছে, সেখানেও লাইক পাওয়া যাচ্ছে! লেগে থাকলে পুরস্কারও পাওয়া যায়, বন্ধুও বাড়ে! এখানে তোমার পাড়া সোনার ডিমটা তুমিই খাবে; অন্যরা না!

ভাল থেকো বন্ধু!

২১/০৩/২০১৬