ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে, তখনো মুক্তিযোদ্ধারা পুরোদমে যুদ্ধ শুরু করতে পারেনি। দেশের সব জায়গায় গণহত্যা চলছে, আওয়ামী লীগের কর্মী ও হিন্দুদের বাড়িঘর আর মানুষ পড়েছে সবচেয়ে বড় বিপদের মধ্যে। দেশের ভিতরে পালিয়ে থাকতে থাকতেই আমাদের বাড়ী তথা পাড়া কয়েকবার করে লুট করে নিয়ে গেছে রাজাকার’রা, কিছু বাড়ী পুড়িয়েও দিয়েছে। এমনকি পালানোর সময় কোন একদিন আমাদের পরিবারের খুবই পরিচিত, ‘আকছেদ গজার’ নামক এক ‘হাফ রাজাকার’ আমার মা-বড়মা’কে ‘বৌদি’ ডেকেই তাদের শাড়ি আর বাসনের ট্রাঙ্কগুলো গরুর গাড়ী থেকে নামিয়ে নিয়েছিল, নিরাপদে রাখবে বলে! আর কোনদিন তা ফেরত দেয়নি সে! আমার মা-বড়’মা তাদের সবকিছুর শোক ভুলতে পারলেও তাদের শাড়ির জন্য আজীবন আকসেদ গজারকে অভিশাপ দিয়ে গেছেন এবং আমার মা এখনো দেন যদিও গজারটা ইতিমধ্যেই পৃথিবী ছেড়েছে। দুর্বলের একমাত্র হাতিয়ার হলো এই ‘অভিশাপ’! লাভ হোক আর না হোক তারা ওর উপরে এটার প্রয়োগ করেছিল কিন্তু গজার দিব্বি বেঁচে ছিল আমরাও তাকে দেখেছি ছোটবেলায়।

সেই সময়ে আমাদের পুরো পরিবার প্রাণ বাঁচাতে আমাদের বাড়ী থেকে কিছুটা দূরের খুকনী গ্রামের দুই-তিনটা মুসলিম পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই পরিবারের সাথে আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল। সেই সময়ে- মরহুম দুলাল প্রামাণিক, তার ভাইয়েরা ও তাদের যুবক ছেলেরা আর বাড়ীর মেয়েরা মিলে আমাদের পুরো পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। সেই দিনগুলিতে তাদের নিজ বসত ঘরে আমার মা-দিদিদের তথা মেয়েদের নিরাপদে রেখে তারা রাতে বাইরে ঘুমাতেন আর সারারাত ধরে পাহাড়া দিতেন। একটা সময় সেখানেও আর নিরাপত্তা বোধ করছিল না সেই দুলাল সাহেব। একদিন বাবা-জেঠাকে বললেন, বাবু এখানে আর বোধ হয় থাকা নিরাপদ না, আপনারা ভারতে চলে যান। দুই-তিনবার পাঠিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যর্থও হলেন তারা। শেষে একদিন সুযোগ বুঝে নিজেদের পাহাড়ায় নৌকায় করে পাঠিয়ে দিলেন ভারতের সীমান্তের দিকে। তাদের ছেলেরা অস্ত্র হাতে সেই নৌকাটা কিছু দূর পর্যন্ত এগিয়েও দিলেন। তখন সময়টা ছিল এমন- একদল জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছে, একদল খুন আর লুটের নেশায় তাদের খুঁজছে, আর একদল বিপদে পড়া মানুষদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচাচ্ছেন। খুনি আর লুটেরাদের ঠেকানোর ‘বাহিনী’ তখনো তৈরী হয়নি। পরবর্তীতে আমাদের দেলুয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর নুর বাকী যিনি ছিলেন সম্পর্কে ডাঃ আবু হেনা’র বড় ভাই ও তার মুক্তিযোদ্ধা দল এদের ঠেকাতে এগিয়ে এলেন। কিছুদিন পর সেই দলে ও অন্যদলে আসলেন আমার কাকা, মেসো, দাদা’রা। তারপর নিরাপদে আমাদের পুরো পরিবার ভারতে চলে গেলেন। এখানে বলে রাখি- যখন এই বাকী সাহেবসহ অন্যরা যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারতে যান তখন তাদের কিছুদিন রান্না করে খাইয়েছিল আমার মা, যিনি আগে থেকেই সেখানে রিফিউজি হিসেবে ছিলেন। একমাত্র বাকী সাহেব এটা এখনো মনে রেখেছেন। আমার মা তখন সাহসিনী কারণ তার আপন ভাইয়েরা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আর আমার বাবা তখন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও ১৯৭০ এর জাতীয় পরিষদের এম,এল,এ ডাঃ আবু হেনা সাহেবের সাথে রিফিউজি আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারী সংগঠক হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি হাট-বাজারে পাটের ব্যবসা করে কিছুটা আয় করারও চেষ্টা করছিলেন কারণ সে অন্যের কাছে হাত পাততে অভ্যস্ত ছিলেন না। আজীবন লড়ে যাওয়া মানুষ সে। মাত্র ৪ বছর বয়সে যখন তার মা মারা যান এবং আমার দাদু তার সংসার বাঁচাতে দ্বিতীয় বউ অর্থাৎ আমার ঠাকুমাকে ঘরে নিয়ে আসেন; সেই তখন থেকেই।

এখানে আরও একটা কথা বলে রাখি, দেশ বিভাগের কারণে আমাদের পিতৃ ও মাতৃকুলের অধিকাংশ আত্মীয়স্বজন আগে থেকেই ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের সেই অঞ্চলে বসবাস করছিলেন, সেই হিসেবে আমাদের পরিবার ওখানে প্রায় নিজেদের মত করে দাঁড়াতে পেরেছিল। আর বাবার সাথে যাওয়া দিদি, পিসিরা সব চলে গিয়েছিল আমাদের মামা আর আত্মীয়দের বাড়ীর নিরাপদ আশ্রয়ে। এইসব কারণে তারা ছিল অনেকটাই নির্ভার ও সাহসী। এছাড়াও আমাদের আত্মীয়দের মধ্যে কেউ কেউ সেইসময়ে ওখানকার রাজনীতি’র সাথেও কিছুটা জড়িত ছিলেন ফলে খুব দ্রুত আমাদের পরিবার ভারতীয় ও বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রশাসন তথা মুক্তিবাহিনীর সাথে পরিচিত হতে পেরেছিল।

আরও একটা বিষয় এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, যা সেই সময়ে ভারতে ঘটেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কোন ‘একাকী যুবক বা মধ্যবয়সী পুরুষ’ গেলেই ‘পাকিস্তানী গোয়েন্দা’ সন্দেহে তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করত। সেই সময়ে আমাদের এলাকার অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যেয়ে বা রিফিউজি হয়ে সেই বিপদে পড়েছিল। তাদের অনেককেই সেখান থেকে ছাড়িয়ে এনেছিল আমাদের আত্মীয়স্বজন, আমার বাবা ‘আমি চিনি’ বলে তখন সাক্ষ্য দিতেন। সেই মানুষেরা এখন সেইসব কথা মনে করতে লজ্জা পান, বা আর সবকিছু বেশী বেশী করে মনে রাখলেও শুধু ‘সেই কথাটা’ ভুলে গেছেন তারা! যদিও সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

ব্যবসাসূত্রে তৎকালীন পাবনা অঞ্চলের অনেক মানুষ আমাদের বাবা-জেঠামশাইকে চিনতো এবং তারাও প্রচুর মানুষকে জানতো, অন্তত নাম, ঠিকানা শুনেই পরিচিতি বের করতে পারতো। তাছাড়া তারা সহ আমাদের কাকারা ছিল আওয়ামীলীগের সমর্থক ও বঙ্গবন্ধুর ভাবশিষ্য। সেই সময়ে অনেক নেতার আড্ডা আর দলের চাঁদার উৎসস্থল ছিল আমাদের ‘গদিঘর’ যা চলমান ছিল স্বাধীনতার পর অনেক বছর পর্যন্ত। অবশ্য সেই ইতিহাস বললেও এখন অনেক ‘উপরতলার’ মানুষ লজ্জা পেতে পারেন। হয়তবা ৫৭ ধারায় লাল দালানেও ঢুকে যেতে পারি। কিছুই বলা যায় না; বড় মানুষ বলে কথা! তবে এটুকু বলি, বঙ্গবন্ধুর পায়ের কাছে বসে কাকাদের বীরবেশে পোচ দেওয়া ছবি দেখতে দেখতে আর তাদের গল্প শুনতে শুনতে বড় হয়েছি আমরা।

পূর্ব পাকিস্তানের মানুষেরা সব হারিয়ে রিফুউজি হয়ে ভারতের সীমান্তের কাছের বিভিন্ন শহর ও গ্রামগুলোতে আশ্রয় নিতে ছুটছে; এমন সময় আমার বাবা তার পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে বর্ষা মৌসুমের উত্তাল যমুনা নদীতে নৌকায় উজান ঠেলে ভারতের ‘মাইঙ্কার চরের’ রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেন। পুড়ো যাত্রায় পাকবাহিনীর গানবোট আর ডাকাতের ভয়ে নৌকার পাটাতনে শুয়ে ছিলেন তারা। যাত্রাপথে নৌকার মাঝি কয়েকবার গানবোটের শব্দ শুনেই নদীর জলে ভেসে থাকা কাশবনে নৌকা লুকিয়ে তাদের বাঁচিয়েছেন। তখন বাহাদুরাবাদ নৌঘাট ছিল পাক বাহিনীর টহল দলের আস্তানা। নৌকা যাওয়ার পথটা এর উপর দিয়েই গেছে। স্থান সংকুলান, পাকিস্তানী ও রাজাকার বাহিনীর হাতে ধরা পরে যেন পুরো পরিবার খুন না হয়; সেটা বিবেচনায় নিয়ে যাওয়ার সময় রেখে গেলেন আমার জ্যাঠা মশায়, জেঠী মা যাকে আমরা বড় মা বলে ডাকতাম ও কাকাদের কয়েকজনকে। শুধু সাথে নিলেন আমার মা, আমার দাদা, দিদি ও জেঠাতো বোনসহ বংশের সব যুবতী বয়সের মেয়েদের। এর মধ্যে আমার পিসি থেকে শুরু করে জেঠিমা’র বোনও ছিল। আর নিয়েছিলেন কিছু অর্থ। সেই সময়ে উঠতি বয়সের মেয়েদের ছিল সবচেয়ে বড় বিপদ। এর বাইরেও ছিল ডাকাতের ভয়। নদীগুলোতে তখন নৌ-ডাকাতের উৎপাত বেড়ে গেছে বহুগুণে।

আমার বাবা’র ভাষ্য, “যখন নৌকায় করে ভারতের সীমান্তে পৌছালাম, তখন মনে হলো- আমি কি তাহলে বেঁচে গেছি? আমরা কি তবে বেঁচে গেলাম! সেই সময়ে শরীরের সব শক্তি নিমিষেই উবে গেল! নৌকা থেকে যে নদীর পারে নামবো তার শক্তিটুকুও আর নেই! পার থেকে একদল মানুষ চিৎকার করে ডাকছে- বাবু, নৌকা থেকে নামেন, আর ভয় নাই! ভারতে এসে গেছেন”। পরে অন্যের হাত ধরে মাটিতে নেমেই বাবা’র মনে আর একটা প্রশ্ন এসেছিল, “তবে কি আর কোনদিন নিজদেশে ফিরতে পারবো না?”

ড্রাফটঃ তথ্যে কিছুটা কারেকশন লাগবে হয়ত। পরে বাবা-মা’র সাথে কথা বলে ঠিক করবো।

(অসমাপ্ত)

২১/০৩/২০১৬