ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 

হঠাৎ করেই সেদিন খবরটা দেখলাম। ব্রিটিশ সরকার আমাদের হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের কার্গো বিমানগুলোর লোডিং বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেটা হবে এখন ভারত থেকে।

আমি খবরটা পড়ে যতটা না অবাক হয়েছি, তারচেয়ে বেশী খুঁজেছি এর কারণ। আমি স্পষ্ট করেই বলি- আমি এতে অবাক হয়নি! কারণগুলো বলছি- একেবারে নিজের দেখা আর জানা কিছু নমুনা থেকেঃ

১) এই বিমানবন্দর এখন সোনা চোরাচালানের একটা হাবে পরিণত হয়েছে। যা ধরা পরে এরচেয়ে বেশী আসে বলেই আমার বিশ্বাস। একটা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এভাবে সোনা চোরাচালান কোনদিনই নিরাপদ নয়, নিরাপদ নয় কোন বিমান ও এর যাত্রীদের জন্যও। সোনার জায়গায় বিমানে যখন তখন কিছু পটকাও উঠে যেতে পারে এবং উড়ন্তকালে বুম করে ফুটে প্যাসেঞ্জারদের কানে তালা লাগাতেও পারে!

২) একটা বিমানবন্দরের Security Checking ও Immigration Clearance করার পর, যদি দেখা যায় Passenger Lobby তে তিন-চারটা বেড়াল নির্ভয়ে ঘোরাফেরা করছে; তাহলে বুঝতে হবে সেখানে নিরাপত্তার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। একদিন এই বেড়ালের সাথে তাদের ‘বড়ভাই’ বাঘও ঘুরতে ঘুড়তে বিমানে চড়ে বসার দাবী জানাতে পারে এবং বড় দাঁতদুটো খিঁচিয়ে বলতে পারে, “ভাইলোকেরা আমার বিশ্বভ্রমণের শখ হয়েছে; চলেন”!

৩) যখন লবিতে বসে সব মানুষ একযোগে মশার কামড় খাচ্ছিলাম তখন বুঝলাম এখানে Maintenance -এরও সমস্যা আছে।

৪) একবার বিদেশে থেকে দেশে ফেরার পর, এই বিমানবন্দরের Immigration Officer আমার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে কম্পিউটারে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করার পর যখন বললেন, “আপনি কোনদিক দিয়ে মালয়েশিয়া গেছিলেন?” তখন আমি কেন, আমার বাবাও আকাশ থেকে পড়তে বাধ্য হতেন! তাই আমিও পড়লাম এবং তির্যক ভাষায় জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? উত্তরে উনি জানালেন, আপনি যে এই বিমানবন্দর দিয়ে ‘Departure’ হয়েছেন তার কোন রেকর্ড নাই। আমি বললাম, সিল তো আছে? উনি উত্তরে জনালেন, “হ্যাঁ আছে। সম্ভবত আপনি যখন গেছেন তখন আমাদের সার্ভার ডাউন ছিল, মাঝে মাঝে এমন হয়”। বললাম, তাহলে আমাকে ‘Departure’ করলেন কিভাবে? উনি আর বেশী কথা না বলে পাসপোর্টে ‘Arrival’ সিল না দিয়েই ফেরত দিতে দিতে আমাকে বামদিকের একটা টেবিল দেখিয়ে দিলেন। আমি সেখানে যেয়ে বললাম, ভাই এটা কি হলো? আমি গেলাম এখান দিয়ে আর এখন আপনারা বলছেন, ‘আপনি এখান দিয়ে যান নাই’, কারণ কি? উনি কথা না বাড়িয়ে খাতায় কি যেন টুকে নিয়ে পাসপোর্টে সিল দিতে যাবে এমনসময় আমি তাকে ঠেকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এতে পাসপোর্টের কোন ক্ষতি হবে না তো? উনি ‘না’ উত্তর দিতে দিতে আমাকে ‘Arrival’ দেখালেন। ততক্ষনে আমি এয়ারপোর্ট ম্যাজিস্ট্রেটের ফেবুপেজ ওপেন করেছি এর একটা বিহিত করতে। কিন্তু উনি আমাকে সহজেই সাহায্য করলেন। ধারণা করি, আমাদের খেটে খাওয়া অতি সাধারণ জনতাকে তিনি এতটা সাহায্য নাও করতে পারতেন! হয়ত এটাও একটা ফাঁদ কিছু কামাইয়ের জন্য? না হলে এই বিমানবন্দরের মেইন সার্ভার ডাউন থাকবে কেন যেখানে প্রতি ঘন্টায় হাজারখানেক মানুষ যাওয়া আসা করছে? তাহলে কি প্রতিদিন আসা-যাওয়া করা মানুষের সঠিক রেকর্ড থাকছে না এখানে?

৫) এখানে যেভাবে ছোট ছোট দোকান দেওয়া হচ্ছে আর বাইরের মানুষ এতে চাকুরীতে নিয়োজিত থাকছে? তাতে তো মনে হয় এদের শুধু দোকান চালিয়ে পোষানোর কথা না! তবে কি সাইডে কোন ব্যবসা আছে? আর এই দোকানের সমারোহ অচিরের এখানে গুলিস্তানের ফ্লেভার নিয়ে আসবে। পানের দোকানও এখানে দেখলাম কিনা? আমাদের ভাইয়েরা পান খাবে আর যেখানে সেখানে পিচকিরি ফেলবে; দারুণ মজা!

৬) যেভাবে মানুষজন বিদেশে ল্যাগেজ নিয়ে যাচ্ছে এবং তা চেকিং হচ্ছে, তাতে করে আমার মনে হয়েছে- আরও ভাল ম্যানেজমেন্ট হওয়া উচিত ছিল।

আমার অল্পবিদ্যার উদাহরণগুলো থেকে কি খুব বেশী ভরসা পাওয়া যায় এখানকার নিরপত্তা বিষয়ে?

এবার আসি টেন্ডার বিষয়ে-

নিরাপত্তার অজুহাতে যেভাবে হঠাৎ করে ব্রিটিশ কার্গো বিমানের সরে যাওয়ার কথা শুনলাম, তেমনিই হঠাৎ করেই সেই ব্রিটিশদেরই কোন কোম্পানিকে সেখানকার নিরাপত্তার দায়িত্ব পেতে দেখলাম। সত্যি বলতে কি আমার মত অল্পবিদ্যার মানুষও দুটোতেই অবাক হয়েছি।

আমার ধারণা-

সরকারের বিভিন্ন দফতর দাও মারার জন্য এভাবে ফাঁদ পাতে। যেমন-

একটা সেবা বা কাজকে তারা খারাপ হতে দিতে দিতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাতে করে সেটা থেকে মানুষের চরম ভোগান্তি হয়, মিডিয়াতে লেখালেখি হয়। তারপর একদিন সেই লেখালেখির উপর ভিত্তি করে হঠাৎ করেই জনগুরুত্বের অজুহাতে তারা অতিরিক্ত টাকা ব্যয়ের বাজেট পাস করে বা নিজেদের মানুষকে কাজ দেয়। আর এখান থেকে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বেশী টাকার দাও মেরে ভাগাভাগি করে নেয়।

এই একই অবস্থা দেশের সব সরকারি টেন্ডারেরই পাবেন। বড়গুলো আমাদের চোখে পরে কারণ তারা শত থেকে হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাড়িয়ে নেয় কাজের মাঝপথে অনেকটা ব্ল্যাকমেইল করে। ছোটগুলোর অবস্থা আরও বাজে, সেখানে ১০% এরও কাজ হয় না, আবার যাওবা হয় তার মান হয় খুবই নিম্নমানের, একটা রাস্তা তিন মাসও টেকে না বা সরকারি টাকায় বানানো বিল্ডিঙে ফাটল ধরে খুব অল্প সময়েই।

আমার মাঝেমাঝে মনে হয়, আরও অনেকের সাথে আমার এই লেখা দুটোও ব্যবহৃত হয়েছে এভাবে এই ৭৩ কোটি টাকার টেন্ডার দেওয়াতে।

অর্থাৎ আমাদের লেখাগুলোও দুর্নীতিতে ব্যবহৃত হয়?

১) বিমানবন্দরের বিড়াল ও আমাদের গপ্পো
২) শাহজালাল বিমানবন্দরে মশার কামড় খেয়েও খুশি ক্রিকেটপ্রেমীরা

যদি হয়, তাহলে সেটা হবে দুঃখজনক!

অর্থাৎ আমরা নিজের খেয়ে শুধু শুধু বনের মোষই তাড়াই না, অন্যের জন্য প্রকান্তরে লাভও বয়ে আনি!

কী বলেন?

২৬/০৩/২০১৬