ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

আমাদের চাইনিজ অরিজিনের কলিগ মিস লি হাইওয়েতে হাইস্পীডে বাম হাতে ড্রাইভ করছে আর ডান হাতে ধুমছে সিগারেট টানছে! অপরদিকে আমি পাশের সীটে বেল্টে নিজেকে বেঁধে রেখে ওর তামশা দেখছি! মনে মনে বললাম, আমিও ভিক্ষুক হলাম আর দেশ থেকে ভিক্ষাও উঠে গেল! এক পর্যায়ে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম- এই বলে যে, আসলেই ম্যান ইজ মরটাল! আই মিন, জীবন পরিবর্তনশীল!

ইতিমধ্যেই সে আমাকে একবার সিগারেট অফার করছে আর আমিও হাঁসিমুখে তাতে না করেছি! দ্রুত ব্যাক গিয়ারে ভাবলাম, “একসময় আমার ছাড়া সিগারেটের ধোঁয়ায় আমার পাশে কেউ থাকতে পারতো না, আর এখন আমিই এর উল্টো ভিক্টিম!” অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পেলাম, আমার ভিতরকার পুরোনো নাড়ীনক্ষত্রগুলো নিকোটিনের গন্ধে মানুষ খেকো বাঘের মত উদয় হতে আরম্ভ করেছে! কিন্তু নিজেকে আমি এমন বেল্টে বেঁধেছি যে, সেই ২০১০ সালে এক ঝটকায় এই ‘ধুমটান’ ছাড়ার পর আর একবারও ওতে ঠোঁট ছোঁয়াইনি!

ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা লি, তুমি ডেইলি কয়টা সিগারেট খাও! ও ঠোঁট উল্টে বলল, আট দশটা! বললাম, মাত্র? আমার সর্বোচ্চ রেকর্ড ডেইলী চল্লিশটা!

শুনে ও ভিম্রী খেয়ে গাড়ীতে ব্রেক কষলো! আরও বললাম, তুমি কতদিন ধরে এটা খাও? উত্তরে সে বলল, এই ৪-৫ বছর! আবারো বললাম, মাত্র? আমি শুধু চেইন স্মোকারই ছিলাম কমপক্ষে আঠারো বছর! আর খুচরা-কাচরা দিয়ে এই ধরো বছর পচিশেক আমি সিগারেট খেয়েছি!

এবার সত্যি সত্যি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো তাহলে তুমি সিগারেট ছাড়লে কিভাবে? আর কোন বয়স থেকে সিগারেট খেতে? আমি কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ছাড়তে পারছি না!

বললাম, যৌক্তিক প্রশ্ন! তাহলে শোনো মেয়ে, আমি সিগারেট ছেড়েছি এক ঝটকায়! এটা চেষ্টা করে ছাড়া যায় না! আমিও অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি! এটা ছাড়তে হলে সেলফ মোটিভেশন লাগে! যেমন আমার মোটিভেশন হলো, “আমি এখন সিগারেট খাবো না!” আর কোনদিনও খাবো না তা কিন্তু পন করিনি? করলে নিজের অবচেতন মনই এতদিনে এই বাঁধ ভেঙে ফেলতো কারণ মানব মনকে অপরাধ টানে! তাই আমার পন হলো- এখন খাবো না! ব্যাস! এই ‘এখন’ গত ছয় বছর ধরে বলবত আছে! যদিও আমি এই সময়কালে নিকোটিনের নির্মম শাস্তির মুখোমুখি হয়েছি কয়েকশত বার, বাট নিজেকে কখনো ভেঙে পড়তে দেইনি!

লি, যদিও তুমি চিনবে না তারপরেও বলি, আমার প্রথম সিগারেট ব্র্যান্ড ছিল ‘ব্রিস্টল’ আর এতে টান দিয়েছি সেই ক্লাস ফাইভে! তখন আমার বয়স ছিল ১১ বছর! শুনে ও চোখ পাকিয়ে বলল, ওওও ইউ আর নটি বয়! বললাম, তবেও বোঝ? আমি তোমার গুরু! হিসেব করে আমার সামনে সিগারেট খাও! আর ডোন্ট ইনফ্লুয়েন্স মি! ওকে?

২)
আমাদের বাঙ্গালী দুষ্ট পোলাপান, লিকে সহজ সরল মেয়ে পেয়ে বাংলা ভাষার নানা গালি শিখিয়েছে। বছর পচিশেক একটা সুন্দরী মেয়ের মুখে অকথ্য বাংলা গালি শুনতে কারো ভাল লাগার কথা নয়! কিন্তু ওর বয়সী আমাদের কলিগরা ওকে ওগুলো শিখিয়েছে আর ও এর অর্থ না জেনেই ধুমছে সেগুলো বলে যাচ্ছে! অপরদিকে আমাদের সেই বাঙ্গালী ছেলেগুলো ওর গালীগুলো শুনে এক নির্মল আনন্দ উপভোগ করছে! আমি প্রথমদিন কিছু বললাম না! দ্বিতীয়দিন রুটিন ওয়ার্কে বের হয়েছি। এবার আমাদের তরুণ কলিগ শাহিনকে সামনের সীটে ওর পাশে বসতে বললাম। আজও লি’ই ড্রাইভ করবে!

আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে মিস লি ওর কলিগ বন্ধুদের সাথে ধুমছে সিগারেট টানছে আর সেই গালিগুলো সমানে বলে যাচ্ছে! এবার গাড়ীতে উঠে বসতেই আমি ওকে বললাম, আচ্ছা লি! তুমি যে বাংলা শব্দগুলো বলছো, এর অর্থ জানো? উত্তরে না বোধক মাথা ঝাঁকালো সে এবং কিছুটা অবিশ্বাসের চাহনিও দিলো আমার দিকে কারণ আমার সাথে ওর সামনাসামনি পরিচয় হয়েছে মাত্র দুই দিন ধরে! আর ওর চাইনিজ কিউরিয়াস ব্রেন আমার কথা সহজে মেনে নিবে তাও বিশ্বাস করি না! তাই শাহিনকে বললাম, ওকে গালিগুলোর অর্থ বুঝিয়ে দাও! পরে অর্থ জানার পর ও আর সেই শব্দগুলো এখনো পর্যন্ত বলেনি।

বাঙালীদের এই এক দোষ! কোন বিদেশী এদের কাছে বাংলা ভাষা শিখতে চাইলেই প্রথমে এরা তাদের গালি শেখায়! এর আগেও আমি এর কয়েকটা নজির দেখেছি। একেবারে ভাল ভাল মানুষরাও এই অপকর্মটা করে থাকে! কেন রে ভাই? বাংলা ভাষায় কী শব্দের অভাব পড়েছে? নাকি তোমাদের অবচেতন মনে যে একটা নোংরা মানুষ বাস করে তা এর মাধ্যমে তোমরা তা প্রমাণ করছো?

৩)
আমার মালয়েশিয়ার কলিগ শাহিনকে আমি ভীষণ পছন্দ করি! একেবারেই সাধাসিধা ছেলে সে! একদিন ও গাড়ী ড্রাইভ করছিল আর আর আমি ওর পাশের সীটে বসে কালেন্ট ভিজিটে যাচ্ছি। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, হ্যাঁরে শাহিন, তুমি কোথায় পড়েছো আর মালয়েশিয়ায় এসে চাকুরীই বা করছো কেন? কারণ আমি ইতিমধ্যেই ওর সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পেয়ে গেছি!

উত্তরে ও বলল, দাদা! আমি এ লেভেল, ও লেভেল কমপ্লিট করে নর্থ সাউথ হয়ে মালয়েশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে এই চাকুরী নিয়েছি! বললাম, ঢাকায় থাকো কোথায়? উত্তরে ও জানালো গুলশানে! এবার আমার মনের কিউরিসিটি অংশ ব্যাপক কিউরিয়াস হয়ে উঠে ওকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি ওকে চেন?

উত্তরে সে জানালো, হ্যাঁ আমার সাথে ওর হাই হ্যালোর সম্পর্ক ছিল! সে একটা মেয়ের সাথে লিভিং টুগেদার করতো এবং সেই মেয়েও এখনো আমার বান্ধবী!

সাথে সাথে আমি ওকে কিছু বুঝে উঠতে না দিয়ে বললাম, তাড়াতাড়ি আমাকে একটা সুয়েটেবল জায়গায় নামিয়ে দাও আমি ট্রেনে যাবো!

চলবে >>>

০২/১২/২০১৬

## নামগুলো ছদ্ম!