ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

এখন মালয়েশিয়ায় বর্ষাকাল। যখন তখন বৃষ্টি হয় এখানে। যেন আমাদের আষাঢ়ে ঢল। ট্রপিক্যাল দেশ হওয়ায় আবার সারাবছরই বৃষ্টি হয়। এখানে তাপমাত্রার খুব একটা হেরফের হয় না! বলা যায় এক ঋতুর দেশ এটা। তবে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সূর্যের প্রখর তাপ থাকে। এই তাপ খুবই কড়া ধরনের হয়, গায়ের চামড়ায় লাগে। যার কারণে কর্মজীবী মানুষ দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যায়। যারা মটর সাইকেল চালায় তারা তাদের গায়ের সাথে সর্বদা রেইনকোট উল্টো করে পড়ে তবেই ড্রাইভ করে। এখানে কখন, কোথায় বৃষ্টি হবে তা কেউ বুঝতে পারে না। একই চলতি পথে রোদ-বৃষ্টি উভয়ই পাওয়া যায়।

প্রতিদিন বাইরে যারা কাজে যায় তাদের সবারই মটল সাইকেল, গাড়ী বা বাই সাইকেল একটা কিছু থাকতেই হবে। আমাদের দেশের মত সহজ ও শর্ট ডিস্ট্যান্স ট্রান্সপোর্ট এখানে নেই। যদিও এদেশের ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম খুবই আধুনিক। রোডওয়ে, মেট্রো, ট্রেন, বাস সার্ভিস সবই এখানে সহজলভ্য। কর্মজীবি মানুষ, যারা লং ড্রাইভ করতে চায় না তারা ইচ্ছে করলেই তাদের গাড়ী, মটর সাইকেল যেকোন স্টেশনে রেখে যেতে পারেন এবং ফিরতি পথে আবার সেখান থেকে তা নিতে পারেন। এর জন্য তাদের খুবই অল্প পরিমাণে টোল দিতে হয়।

প্রতিটি রাস্তায় টোল প্লাজা আছে এবং সেই রাস্তা ব্যবহার করার জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট হারে প্রতি গাড়িকে টোল দিতে হবে, তবে মটর সাইকেলের টোল ফ্রি। এই টোল ম্যানুয়েল ও স্মার্ট কার্ড দুই পদ্ধতিতেই দেওয়া যায়। রাস্তায় চলাচলকারী কোন গাড়ী সাধারণত ওভারটেক করে না। যে যার মত করে স্পিড সিলেক্টেড লেনে চলে। কেউ গাড়ীতে হর্ণ বাঁজায় না। কাউকে পিছন থেকে হর্ণ দিলে সে নিজেকে অপমানিত বোধ করে।

মালয়েশিয়ার প্রকৃতি অনেকটাই বাংলাদেশের মত। চিরসবুজের দেশ এটা। কী গাছ নেই এখানে, আম, কাঁঠাল থেকে শুরু করে ভেন্না গাছ পর্যন্ত আছে। সেদিন রাস্তার পাশে দেখলাম তেলাকুচ লতা, তাতে ছোট ছোট সাদাফুল ফুঁটে আছে। আমি ছবি তোলার জন্য বড় তেলকুচ খুঁজলাম কিন্তু তা পেলাম না তবে ফুলের সাথে ছোট্টরা আছে। রাস্তার পাশের জঙ্গলটাতে তেলাকুচ খুঁজতে যেয়ে উল্টো ছোট ছোট মশার কামড়ে আমার দুই হাত ফুঁলে গেল। আমি কিছুটা আতংকিত হলাম এই ভেবে যে, আবার ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়াতে না পড়ি। এখানে বিদেশীদের জন্য ডাক্তার খরচ খুব বেশি। পারতপক্ষে আমাদের দেশীয়রা কেউ ডাক্তাদের কাছে যায় না। অসুখ হলে তারা ভুগতে থাকে আর ওয়েট করে কখন সারবে অসুখ? ডাক্তার ভীতি এখানে ব্যাপক। সবার ধারণা এখানে সামান্য অসুখটাকেও অনেক বড় করে তোলে এবং অপ্রয়োজনীয় ঔষধ দেয়। ফলে সবাই দেশ থেকে নিয়ে আসা ঔষধের উপর ভরসা করে থাকে। আমি প্রতিবার আসার সময় প্রয়োজনীয় ঔষধ কিছুটা বেশী করে আনি। যাতে ফেরার সময় বেঁচে যাওয়াগুলোকে আমার কোন কলিগকে দিয়ে যেতে পারি।

মালয়েশিয়ায় আমাকে সবচেয়ে আকৃষ্ট করেছে আমগাছ। এখানে সব আমগাছেই সারাবছর আম ধরে এবং এর ‘রকম’ খুবই মজার। দেখা যায়, একই গাছে আম টকটকে হলুদ হয়ে পেকে আছে। সাথে আছে সবুজাভ কাঁচা আম আবার সেই গাছে মুকুলও এসেছে। এখানে গাছে প্রচুর পাকা আম ঝুলতে দেখা যায় কিন্তু কাউকে কখনো তা পাড়তে দেখিনি। একমাত্র আমিই চলার পথে লাফ দিয়ে গাছ থেকে কাঁচা আম পেড়ে খেয়েছি। আমার এই কাজ দেখে আমার কলিগ মিজ নোরা খুব হেঁসেছে, আর বলেছে, খেয়ো না খুব টক। হাঁসতে হাঁসতে ওকে বলেছি- তুমি এই বাঙ্গাল পোলারে টক দেখাও? আমরা মা’র পেট থেকে পরেই আমগাছে ঢেল দেওয়া শিখেছি। ওর কথা না শুনে, কাঁচা আমটাতে কামড় দিয়ে ওর কাছে উল্টো নুন চেয়ে বসলাম! হঠাৎ হাত পেতে নুন চাওয়ায় ওর মেয়েলি মন হাতের কাছে আর কিছু না পেয়ে তার ভ্যনিটি ব্যাগ খুঁজতে শুরু করে দিলো। আমি হেঁসে বললাম, তুমি কি ট্যুরে আসলেও সাথে নুন আনো? ও লজ্জা পেল! ঘটনা মালাক্কায়, আমরা অফিস ট্যুরে ছিলাম সেদিন।

চলবে >>>

০৫/১২/২১০৬