ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

গতকাল নোরাকে ভাইবারে ফোন দিয়ে না পেয়ে ওর বর্তমান আপডেট জানতে মেসেজ দিয়ে রাখলাম। মাস তিনেক আগে সে আরও পড়াশোনা করবে বলে আমাদের প্রতিষ্ঠানের চাকুরী ছেড়ে দিয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সে আমাদের জন্য কয়েকটা ব্যবসায়ী কন্ট্রাক্ট আনতে পেরেছিল। আরও কয়েকটা পাইপ লাইলে ছিল। আমার ফোন দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, এবিষয়ে ওর কোন হেল্প আমি পেতে পারি কিনা? অথবা আবারও আমাদের এখানে জয়েন করবে কিনা? কারণ ওর রিপ্লেসমেন্টে যাকে নেওয়া হয়েছে সেই মিস মেই- তাকে দেওয়া দায়িত্বটা ঠিকমত পালন করতে পারছে না। যদিও সে চাইনিজ অরিজিনের মেয়ে তাই তার এটা পারা উচিত ছিল। কিন্তু পারেনি।

মালয়েশিয়ায় চাইনিজ অরিজিনদের জব ভ্যাল্যু সবচেয়ে বেশী। কারণ এদেশের ব্যবসায়-বানিজ্যের ৯০ ভাগ চাইনিজদের আওতাধীন এবং এক চাইনিজ অন্য চাইনিজকে সবসময় অগ্রাধিকার দেয়। বড় ব্যবসার সব পজিশনে চাইনিজরা থাকায় আমাদের পক্ষে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঢুকতে পারাটা খুব কঠিন। এক কথায়- অসম্ভব! মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও একটা এপোয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায় না, ব্যবসা তো দূরের কথা! আর একটা বিষয় এখানে বলে রাখি, চাইনিজরা ওদের ওরিজিনের বসের আন্ডারে কাজ করতে সবসময় পছন্দ করে এবং নিজেদের ওরিজিনের বাইরে বিয়ে অথবা সম্পর্ক করে না।

নোরা এই গ্রীড লক ভাঙতে সিদ্ধহস্ত ছিল। আমাদের এখানে চাকুরী করার আগে সে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেছিল তাই সে এদেশের কর্পোরেট কালচার সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখতো। এছাড়াও তার অনেক দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকাসহ কয়েকটা ভাষা জানতো সে। ইংরেজিতে ছিল সাবলীল। আবার সে শৌখিন মাউন্টেইন হাইকিংদের গ্রুপেও ছিল। সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মালয় ভূমিপুত্রী’ ছিল সে, ফলে চাইনিজরাও ওকে ‘না করার’ সাহস দেখাতো না। আর ও ছিল দুর্দান্ত স্মার্ট! এমনকি উইদাউট এপোয়েন্টমেন্টে একটা অফিসে যেয়ে হাজির হলেও আমাদের কাক্ষিত সেই ব্যক্তি দেখা না দিয়ে পারতো না! আমার দায়িত্ব ছিল- ওকে গাইড করে এদেশে আমাদের ব্যবসার ভিত্তিটা গড়ে তোলা। কিন্তু ওর একটা সমস্যা ছিল, সেটা হলো- সে অত্যাধিক ছুটি কাটাত। অবশ্য মালয়রা নাকি এরকমই! যতক্ষণ হাতে টাকা থাকবে ততক্ষণ কাজ করার ইচ্ছা ওদের কম থাকে বলে শুনেছি।

এদেশের স্থানীয়দের জন্য চাকুরী পাওয়া এবং তা ছেড়ে দেওয়া অনেকটাই তাদের ব্যক্তি ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তাই ওদেরকে কাজের জন্য বেশী ফলোআপ করলে বা টার্গেট ওরিয়েন্টেড করতে চাইলেই ওরা ধুম করে চাকুরী ছেড়ে দেয়। এখানে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশী কর্মজীবী ও একটিভ। রাস্তা, ট্রেনে, অফিসে, মার্কেটে শুধুই কর্মজীবী নারী দেখা যায়।

এদেশে যত হোয়াইট কালার জব আছে তার সিংহভাগ দখলে রেখেছে চাইনিজ ও মালয়রা। অল্প কিছু আছে ইন্ডিয়ানদের দখলে। এই ইন্ডিয়ানদের মধ্যে তামিল ওরিজিনরা আবার এগিয়ে আছে। আমাদের বাঙালীরা কাজ করে সবচেয়ে লো গ্রেডের ও অস্থায়ী কাজগুলো। অল্পকিছু আছে যারা মালয় মেয়ে বিয়ে করে মুদি দোকান, রেস্টুরেন্ট, ছোট ও ম্যান পাওয়ারের ব্যবসা করছে। এরা মূলত ‘বউসূত্রে’ পাওয়া স্পাউস ভিসায় এদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে ও ব্যবসা করতে পারছে।

বর্তমানে বাংলাদেশীদের জন্য মালয়েশিয়ার ভিসা প্রায় বন্ধ। দিন দিন এটা ক্রমেই জটিল হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ভিজিট ও স্টুডেন্ট ভিসা ওপেন আছে। কলিং ভিসা আবারো ওপেন হবে বলে অনেক অবৈধ বাংলাদেশী আশায় বুক বেঁধে আছে। কেউ কেউ দালালদের অগ্রীম টাকা দিয়ে নিজেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে অথবা লুকিয়ে কাজ করছে। মাঝে মাঝে ইমগ্রেশন পুলিশ ব্লক রেইড দিয়ে অবৈধদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক বাংলাদেশী রোহিঙ্গা কার্ড পাওয়া চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গারা এদেশে রিফিউজি হিসেবে অনেক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। এখন কিছু কিছু বাংলাদেশী সেদিকেও ঝুঁকেছে কিন্তু সেটা পাওয়াও কষ্টকর।

আমাদের দেশীয়দের ভাষায়, মালয় ছেলেদের তুলনায় বাঙালী ছেলেরা স্মার্ট হওয়ায় আগের জেনারেশনে আসা অনেক বাংলাদেশী এখানে মালয় মেয়ে বিয়ে করতে পেরেছে। কিন্তু এর একটা খারাপ ইফেক্টও পড়েছে এদেশের সমাজে। অনেক এদেশীয় মেয়েই বাঙালী ছেলেকে বিয়ে করে ঠকেছে। আবার কেউ কেউ নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে। অর্থাৎ প্রথম স্ত্রীকে দেশে রেখে এসে এদেশে মিথ্যা কথা বলে আবারো বিয়ে করেছে তারা।

কিন্তু এখন দিন বদলে গেছে, আমার জানামতে স্টুডেন্ট ভিসায় আসা সত্যিকার স্মার্ট ও শিক্ষিত অনেক ছেলেকেই এদেশের বাবা-মা’রা মেয়ে বিয়ের অফার দিচ্ছেন কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা এবার শিরদাঁড়া খাড়া রেখে না করতে শিখে গেছে।

প্রচুর ছেলে-মেয়ে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়তে আসছে। এর মধ্যে অনেকেই সত্যি সত্যি পড়তে আসলেও বেশীর ভাগই আসছে কাজ করতে। এরা যতদিন ছাত্র থাকে ততদিন কাজ করতে পারছে। সেদিন এক ছেলেকে দেখলাম একটা রেস্টুরেন্ট পরিষ্কার করছে। আমি তাকে দেখেই ডেকে বললাম, বাড়ী কই? সে বলল, ফরিদপুর। বললাম, কি ভিসায় আসছো আর এখানে কতদিন? সে বলল স্টুডেন্ট ভিসায় আর এখানে ৫-৬ দিন। জিজ্ঞাসা করলাম, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে? ও উত্তর না দিয়ে বলল, ভাই আমাকে একটা চাকুরী দেন। বললাম, এভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আসা কি তোমার ঠিক হয়েছে? পুলিশ ধরলে তো জেল খাটতে হবে আর বেতনও বেশী পাবে না।

এটা গেল একদিক। অন্যদিকে আছে- অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে এদেশে এসে নানা অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ কেউ জড়িয়ে যাচ্ছে নেশায়। শোনা যায়, অনেকেই লিভিং টুগেদারও করছে। আবার অনেকেই চাকুরী থেকে টাকা আয় করে তা দিয়ে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে যাচ্ছে।

চলবে >>>

পূর্বের লেখাঃ

বৈদেশের জীবন যাপন-১
বৈদেশের জীবন যাপন-২

০৭/১২/২০১৬