ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

ছোটবেলায় ঠাকুমা’র মুখে অনেক শোলক শুনতাম। সে প্রায়ই শোলকগুলো ছন্দ করে করে আমাদের শোনাতেন। তার বলা শোলকদের মধ্যে আবার একটা ছড়ায় তিনটা বিশেষ ধরনের শোলক ছিল, এর সাথে মাহাত্য বর্ণনাসহ একটা ছোট গল্পও ছিল। সেই শোলকের প্রথম অংশ ছিল, “পথের নারী বিপর্যিতা”। দ্বিতীয় ছন্দটা মনে নেই, তবে সেটা গদ্যে হবে- “আপনজনও যদি পিঁড়িতে বসতে বলে, তাহলেও সেটা পা দিয়ে একটু সরিয়ে বসবে। কারণ সেখানে তোমার মৃত্যুফাঁদ হয়ত পেতে রেখেছে সে” আর তৃতীয়টা ছিল সম্ভবত, “যাত্রাপথে কাউকে বিশ্বাস না করার কোন উপদেশ”। তিনি তারও ঠাকুমার রেফারেন্স দিয়ে সেগুলো আমাদের শোনাতেন আর আমরাও তা গোগ্রাসে শুনতাম। এখন বুঝি সে কমপক্ষে দুইশত বছরের অভিজ্ঞতার নির্যাস আমাদের সাথে শেয়ার করতো তখন।

আমি যখনই কোথাও যাই বা যে যানবাহনেই চলাফেরা করি না কেন, সেই তিনটা উপদেশ বাক্য সবসময় মনে রাখি। অর্থাৎ সেই ছোটবেলায় ঠাকুমা আমার মনে একটা ‘কিউরিয়াস মন’ তৈরী করে দিয়েছেন এবং এখনো পর্যন্ত এর ভাল ফল পাচ্ছি।

আমি আমার আগের একটা লেখায় লিখেছিলাম, “অপরাধী মন ঠকে কম”। কেন বলেছিলাম তা জানি না, তবে এটা বিশ্বাস করি আমার ঠাকুমা আমাকে একটা অপরাধী মন তৈরী করে দিয়ে গেছেন সেই ছোটসময়ে।

‘অপরাধী মন’ বলছি এই কারণে যে, একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, ঘরের ছোট ইঁদুরটা রাতভর আপনার বিছানা কাটলেও, শিকারী বেড়ালটা ঘুমাবে ঠিক আপনার লেপের নীচে। আমি বলতে চাচ্ছি, অপরাধীরা সবসময় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকে আর এর ফলে সে ক্রমেই আর দশজন ভাল মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে একটা ফরেন জার্নালে পড়লাম, সেখানেও বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, একজন ভাল মানুষের চেয়ে একজন অপরাধী মাল্টি ডাইমেনশনাল চিন্তা করতে পারে ও বেশি বুদ্ধি রাখে। ফলে সে বাঁচেও বেশি দিন! এই যেমন- আমাদের প্রিয় শাকিল ভাই মারা গেলেন কিন্তু এরশাদ কাকু এখনো লেহেঙ্গা বিলি করেই যাচ্ছেন! করেই যাচ্ছেন! থামার নামটা পর্যন্ত নেই! অথচ এই জীবনে কী এর একটাও বিলি করতে পেরেছি? নিজের জীবন নিয়েও আফসোস!

একটা বাস্তব ঘটনা বলি, আমার গত মালয়েশিয়া ভিজিটে, আমাদের হেড অব বিজনেজ ডেভেলপমেন্ট সালেহ স্যার বললেন, সুকান্ত আমি আগামী রবিবার তেরঙ্গানুতে যাবো। আপনি আমার সাথে যাবেন? বললাম, যাবো স্যার! আমার সেখানে কিছু পেন্ডিং কাজ আছে, তাছাড়া ছুটিরদিনে বসে থেকে কী হবে? কাজে লাগাই।

শনিবার রাত এগারটার দিকে- স্যার ফোন দিয়ে আমাকে ভোর ৫ টায় রেডী থাকতে বললেন এবং জানালেন এইমাত্র সে মালাক্কা থেকে ড্রাইভ করে ফিরলেন। উত্তরে বললাম, কাল সকাল থেকে আবারো ড্রাইভ করতে পারবেন? রাস্তা কিন্তু প্রায় ছয় শত কিলোমিটার? এছাড়াও আমি গাড়ী ড্রাইভ করতে জানি না, ফলে প্রয়োজনে সাহায্য করতেও পারবো না।

রবিবার ঠিক ভোর পাঁচটায় আমরা রওনা দিলাম, উনি আমার রেসিডেন্টে এসে আমাকে তার গাড়ীতে তুলে নিলেন। তখনও ঘোর অন্ধকার আর বৃষ্টি হচ্ছিল। আমাদের প্ল্যান ছিল ঐদিনই ফিরে আসবো। গাড়ীতে উঠতে উঠতে বললাম, স্যার ভোরে ওঠার চিন্তায় আমার কিন্তু রাতে ঘুম হয়নি! উনি বললেন, আমারও হয়নি। কোন চিন্তা করবেন না চলেন, উপরআলা ভরসা! তার পাশের সীটে বসে সীটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে বললাম, চলেন যাই।

ক্রমাগত জার্নি আর রাতে ঘুম না হওয়ার কারণে একটু পরই খেয়াল করলাম, আমার চোখে চলতি পথের সেই আঠালো ঘুম লেগে যাচ্ছে। প্রমাদ গুনলাম, কারণ আমি জানি ঘুমও অনেকটা সংক্রামক ব্যধির মত। পাশের মানুষ ঘুমালে অন্যদেরও তা চলে আসে। অবশ্য বিজ্ঞানীরা বলেন, এটা বেশি হয় যাদের মধ্যে জেনেটিক্যালী ও আত্মিক সম্পর্ক বেশি থাকে তাদের মধ্যে।

আমি জেগে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। এক পর্যায়ে আমরা দুইজনই একটি কফি শপের খোঁজ করলাম কিন্তু এত ভোরে কোন রেস্টুরেন্টই খোলা পেলাম না। দুপুরের একটু আগে আমরা কুয়ান্তাং-এ নেমে সেখানে কাজ ও নাস্তা সেরে আবারো হাইওয়েতে উঠলাম।

গাড়ী চলছে ফার্স্টলেনে একশত চল্লিশ প্লাস কিলোমিটার গতিতে। ঘুম আমাকে অনেক আগেই ছেড়ে গেছে এবং একটার পর একটা গল্প করে সালেহ স্যারকেও জমিয়ে রেখেছি। একটা রাইট টার্নিং-এ হঠাৎ খেয়াল করলাম আমাদের গাড়িটা ডানে মোর নেওয়ার বদলে ক্রমেই ডানে চেপে যাচ্ছে অর্থাৎ সোজা চলছে। দেখলাম সালেহ স্যার সজ্ঞানেই স্টিয়ারিং ধরে আছেন এবং আমার সাথেও কথা বলছেন। অন্য উপায় না দেখে আমি গাড়ীর বনেটে খুব জোড়ে থাপড় দিয়ে বললাম, স্যার ব্রেক! ততক্ষণে গাড়ী পাশের স্টিলের রোড প্রটেক্টরের সাথে সজোড়ে ধাক্কা খেয়েছে এবং স্যারও সাথে সাথেই স্টিয়ারিং বামে টার্ন করিয়েছে। আমাদের ভাগ্য ভাল ছিল, ঐ স্টিলের রোড প্রেটেক্টরটা রাউন্ড শেফ ও রাইট টার্নিং-এ থাকায় সেটা অনেকটা ক্যারাম খেলার স্ট্রাইকারের মত করে আমাদের গাড়ীটাকে গুঁতা দিয়ে আবারো রাস্তার মধ্যে ফিরিয়ে দিয়েছে। সেদিন আমাদের ভাগ্য আরও ভাল ছিল, কারণ ছুটিরদিন থাকায় রাস্তায় বেশী গাড়ীও ছিল না। ফলে আরও একটা সিরিজ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেলাম। অপরদিকে পিছন দিক থেকেও অন্য কোন গাড়ি আমাদের গাড়িটাকে মেরে দিলো না।

রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে স্যার বললেন, সুকান্ত কী হলো? আমি বললাম, আমিও তো তাই ভাবতেছি! আপনি তো ঠিকই ড্রাইভ করছিলেন তাহলে হঠাৎ করেই গাড়িটা ডানে চেপে গেল কেন?

রাস্তার বামপাশের ঘাসে গাড়ি দাঁড় করিয়ে আমরা চুপচাপ বসে আছি এমন সময় আমার ফোনে রুপা ফোন দিলো, স্যার বললেন, কে ফোন দিয়েছে, বললাম, বউ! স্যার হেঁসে বললেন, একেই বলে ভালবাসা! সে ঠিকই খবর পেয়েছে! দেখলেন? পরে গাড়ী থেকে নেমে ক্ষতিটা দেখে উনি বললেন, সুকান্ত আজ আপনার উছিলায় বেঁচে গেলাম। আমি বললাম, না স্যার! তারচেয়ে বলেন, একসাথে দুইজনই সজাগ থাকায় একত্রে বাঁচলাম!

ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে কিভাবে বাঁচলাম? আমাদের গাড়িটা তো উড়ে যাওয়া কথা ছিল।

পরদিন সেই ভাঙ্গা গাড়িটা তেরেঙ্গানুর প্রোটনের সেন্টারে নিয়ে গেলে সেখানকার মেকানিক চেক করে বলল, গাড়িতে কোন সমস্যা নেই এবং স্টিয়ারিংও ঠিক আছে। আমাদের ধারণা ছিল- হয়ত স্টিয়ারিং জ্যাম হয়ে গেছিল। সেই মেকানিক আমাদের দুর্ঘটনার জায়গার নাম শুনেই বলল, ঐ জায়গায় প্রায়ই এক্সিডেন্ট হয় এবং ওখানে ভূত আছে। ওনার কথা শুনে আমি আর সালেহ স্যার হেঁসে ফেললাম। আমাদের তেরঙ্গানু’র জোনাল ম্যানেজার মোবারকও দেখি তার সাথে তাল দিচ্ছে।

এখানে একটা বিষয় বলে রাখি, মালয়রা ‘ভূত আছে’ এটা খুব বিশ্বাস করে।

চলবে >>>

আসুন দেখি সেই জায়গা ও রাস্তাটা (পরদিন ফেরার পথে তোলা)

ইউটিউব লিংক- https://www.youtube.com/watch?v=AQjobJAMF_o