ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমাদের সমাজের প্রচলিত বিশ্বাস- “রাস্তার কুকুর মানেই সে খারাপ তাই তাদের মেরে ফেলো! অথবা বন্ধা করে দাও!” নিতাই দা তার সিটিজেন জার্নালিজম ভিত্তিক পোস্ট “বেওয়ারিস কুকুরের আক্রমণ থেকে নারায়ণগঞ্জবাসীদের বাঁচাবে কে?” পোস্টে আমার উল্লেখিত ধারণাকেই উল্লেখ করেছেন। যেখানে শুধুমাত্র মানুষকেই বাঁচানোটাকে মূখ্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে আমি যেমন পশুপ্রেমী নই। তেমনি নই, অপ্রয়োজনে এদের হত্যা করাতেও। তবে আমি নিজের কিছু লজিক মেনে চলি। যেমন মশা-তেলেপোকা মারতে আমি দুইবার চিন্তা করি না! কিন্তু আমার বাসার ছোট্ট পাখিটা খেতে পেলো কিনা অথবা বারান্দার ফুলগাছে প্রতিদিন জল দেওয়া হলো কিনা- সেটা নিয়ে টেনশন করি।

তেমনি রাস্তার বেয়ারিশ কুকুর নিয়ে আমার ছোটবেলার কিছু স্মৃতি আছে যা আমি নীচে বলছি-

ছোটবেলায়, তখন আমার বয়স হবে বড়জোড় ৫-৬। আমাদের দেলুয়া গ্রামের বাড়ীতে লালু আর কালু নামে দুটো কুকুর ছিল। লালু ছিল পুরুষ আর কালু ছিল মেয়ে। গায়ের রঙের কারণে ওদের নামকরণ করা হয়েছিল। কালুকে চোরেরা রাতে খাবারের সাথে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলেছিলো। তার সেই মরে যাওয়ার সময়ের কুঁকড়ে যেতে যেতে কাঁন্নার শব্দ ও সময়টা এখনো মনে আছে।

আর ছিল লালু। সে ছিল খুব ডেয়ারিং। ওকে চোর ডাকাতরা মারতে পারেনি। আমাদের বাড়ীতে তখন প্রায়ই চোর আসতো। মাঝে মাঝে ডাকাত পড়বে শুনে বাড়ীর বড়রা চিন্তাগ্রস্ত হতো। আমাদের ছিল যৌথ পরিবার ও অনেক বড়বাড়ী। লালু সারারাত ঘুরে ঘুরে আমাদের বাড়ী পাহাড়া দিতো আর দিনের অধিকাংশ সময়ই ঘুমাতো।

সেই সময়ে আমার বাবা প্রতি সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের আসতেন। শনিবার আসতেন আর মঙ্গলবার ফিরে যেতেন। বুধ ও শুক্রবার ছিল ছিল আমাদের হাটের দিন। সেই দিনদুটোতেই মূলত বেশী বেচা বিক্রি হতো। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মত ছিল না। এছাড়া আমাদের এলাকাটা ছিল যমুনা নদীর পাড়ে। দূরের পথের জন্য লঞ্চই ছিল তখন একমাত্র বাহন। বাবা মধ্যরাতে উঠে কয়েক মাইল পথ পায়ে হেঁটে লঞ্চ ধরতেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে কাপড়ের সুতা-রং কিনে এনে আমাদের এলাকায় পাইকারী ও খুচরা বিক্রয় করতেন। বাবা যখন বাড়ী থেকে মোকামের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হতেন, ঠিক তখন থেকেই এই লালু তার পিছন নিত। সাথে সাথে যেত অনেকটা পাহাড়াদারের মত করে। বাবা যতক্ষন না লঞ্চে উঠতেন ততক্ষন পর্যন্ত সেও সেই ঘাটে বসে থাকতো। আমাদের বাড়ীর কেউ ওকে এটা করতে বলে দেয়নি বা সে আমাদের পোষা সৌখিন কুকুরও ছিল না। শুনেছিলাম আমাদের বাড়ীরই কেউ তাকে রাস্তা থেকে নিয়ে এসেছিল ওর ছোট সময়ে। এছাড়াও সে বাবার মোকামে যাওয়ার দিন ঠিক বুঝতে পারতো। সেইদিন সে আমাদের ঘরের সদর দরজার বাইরে এসে শুয়ে থাকতো। আমার মা-বড় মা লালুকে খুব পছন্দ করত।

তারপর হটাৎ করেই সে একদিন শেষরাতে ঘেউ ঘেউ করে কান্না করতে শুরু করে দিলো। আমাদের বাড়ীর সবাই খুব আতংকিত হয়ে রাতে ওকে তাড়া করে বাড়ী থেকে বের করে দিতো তখন। কারণ প্রচলিত আছে- দুঃসংবাদ সবার আগে টের পায় কাক আর কুকুর। আর কুকুর ডাকলে বাড়ির অমঙ্গল হয়! এর অল্প কিছুদিন পরই যমুনা নদীর প্রবল কাঁটালে আমাদের সেই বাড়ীর অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেল। পিছনবাড়ীর অল্প একটু অংশে তখন আমরা কোনরকমে আছি, এমন সময় আমার বড় দাদা মাত্র ২৪ বছর বয়সে হার্টের অসুখে মারা গেলেন। ঠিক তার কয়দিন পর লালুও রোগে ভুগে মারা গেল! আমার বাবা-মা আর সবকিছুর সাথে এখনো তার কথাটাও মনে রেখেছেন।

দেলুয়া গ্রামের বাড়ী ভেঙে যাওয়ার পর আমরা চলে এলাম পাশের সোহাগপুর গ্রামে। তখন ক্লাস টু বা থ্রীতে পড়ি। সেই বাড়ীটা ছিল আমাদের এক জমিদার আত্মীয়’র এক অংশ। ১৯৮৮ সালের বন্যায় যখন আমাদের এলাকার সব কিছু ডুবে গেছে। তখন আমাদের এই বাড়ীর বিল্ডিংটায় শুধু জল ওঠেনি। কারণ আগের জমিদাররা বন্যার কথা মাথায় রেখেই তাদের বাড়ী বানাত। সেই সময়টাতেই এই বিল্ডিংটা ছিল প্রায় শত বছরের পুরাতন কিন্তু ছিল ঝকঝকে।

বন্যার মধ্যেই একদিন দেখলাম, আমাদের সেই বিন্ডিংটার বারান্দায় একটা বড় কাঠের আলমারির পিছনে একটা কুকুর মরার মত শুয়ে আছে। কুকুরটাকে চিনলাম। ওকে আমরা বাঘা নামে ডাকতাম। আমাদের বাড়ীর পাশের বাজারটার কসাই খানায় ওর আড্ডা ছিল। ওকে কেউ ঘাটাতো না। কেউ সামান্য ভয় দেখালেই সে তেড়ে যেত। আমাকেও অনেকবার ধাওয়া করেছে কামড়ানো ভঙ্গীতে। কিন্তু এবার দেখলাম সে না খেয়ে প্রায় শুকিয়ে গেছে।

প্রথমে বাঘাকে দেখে মরা মনে হলো। তারপর আলমারিটা টানাটানি করার পর সে একটু নড়ে উঠলো। বুঝলাম অনেকদিন খায়নি সে। এবং পুড়ো বন্যার সময়ে কারো কাছে সে খাবারও চায়নি। কারণ ওই সময়ে আরও কয়েকটা কুকুর আমাদের সেই বিল্ডিঙে ছিল এবং ওরা অল্প কিছু খেতে পেয়ে ভাল ছিল।

আমার বাবা-মা তখন দিদির বাড়ীতে ছিল। মা একটা সড়ক দুর্ঘটায় ও বন্যার কারণে আঁটকা পড়েছে সেখানে। আমি বড়’মার কাছে ভাত খেতে চাইলাম। বড় মা ভাত দিলে সেখান থেকে কিছু ভাত দলা করে ভয়ে ভয়ে কিছুটা দূর থেকে বাঘার মুখের সামনে ছুঁড়ে দিলাম।

ভাতটা দেখে বাঘা সাথে সাথে তা না খেয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছু সময় চেয়ে থাকলো। আমি বললাম, ভাত খা! ও ভাত খেলো এবং বেঁচে থাকলো। তারপর সেই বাঘা আশ্রয় নিলো আমাদের বাড়ীতে। দিনে বাজারে আর রাতে আমাদের বাড়িতে থাকতো সে। ওর আচরণ ছিল ঠিক আগের মতই কিন্তু সে আর কোনদিন আমাকে কামড়াতে আসেনি। এমনকি বন্ধু ও বাড়ীর ছোটদের দেখানোর জন্য আমি ওকে পা দিয়ে পাড়িয়েছি কিন্তু সে চুপচাপ শুয়ে থাকতো। কিন্তু অন্য কেউ কাছে আসা মাত্র লাফ দিয়ে উঠে সে ধাওয়া করত।

তার কিছুদিন পর ১৯৯০ সালে, আমি এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর এই কুকুরটাও কাঁদতে শুরু করলো এবং আমাদের সোহাগপুরের বাড়ীটাও নদীতে ভেঙেচুরে বিলীন হয়ে গেল।

কুকুর নিধন করুন আর বাঁচিয়ে রাখুন! সমস্যা কিছু নেই। কিন্তু আমার গল্পটুকু জানিয়ে রাখলাম।

২৫/১২/২০১৬