ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

তখন ইন্টারে পড়ি। থাকি কলেজের ছাত্রাবাসে। শীতের এক অন্ধকার রাতে, হোস্টেলের সবকয়টা মিলে চাঁদা তুলে গোপনে একটা টিভি আর ভিসিআর ভাড়া করে আনলাম। একটা ইংরেজি ছবি দেখার পর রাত যখন গভীর হলো, রুমের সব লাইট নিভিয়ে দিয়ে বন্ধু মোমেন নীল ছবির ক্যাসেটগুলোর মধ্য থেকে একটা চালিয়ে দিলো।

গভীর মনোযোগ সহকারে আমরা ছবি দেখছি। হঠাৎ মোমেন লাফ দিয়ে উঠে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে জলভর্তি একটা বদনা নিয়ে এলো সে। আমরা ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, জল দিয়ে কী করবি? ও উত্তর না দিয়ে ছবিতে মন দিলো। অবশ্য আমাদেরও সেইসময় নষ্ট করার মত সময় ছিল না! ছবিতে ডুবে গেলাম। হঠাৎ দেখি আমাদের বন্ধুটি বদনাটি লুঙ্গির নীচে নিয়ে বাম হাতে চেপে ধরে ডানহাত দিয়ে ওটার মাথায় জল ঢালছে!

তখন ক্লাস এইট বা নাইনে পড়ি। আমাদের এলাকার ক্লাবে ভিসিআর এসেছে। ক্লাবটা কিছুটা লোকালয়ের বাইরে একটা মাঠের মধ্যে। কাঠ-টিনের দোতালা ঘর ছিল সেটা। তিন শো করে হিন্দি সিনেমা চলে সেই ভিসিআর হলে। আর রাতে চলে ইংলিশ ছবি। এই ক্লাবের পরিচালনার সাথে আমাদের এলাকার এলিট শ্রেণীর সব বড় ভাইরা জড়িত। হঠাৎ করেই সেই বড় ভাইরা আমাদের কাছে হিরো হয়ে গেল। তখন কেবল শুরু হয়েছে হিন্দি ছবির ক্রেজ! সারাদিন তাদের পিছনে পিছনে ঘুরি একটা ছবি মাগনা দেখার লোভে! মাঝে মাঝে অবশ্য তারা একটু নরম হয়ে আমাদের ম্যাটিনি শো’র ছবি বিনা টিকেটে দেখতে দিতো অথবা ছবির অর্ধেক শো শেষ হলে ঢুকতে দিতো। কিন্তু সাথে সাথে রাতে এদিকে না আসার জন্য শাসিয়েও দিতো!

তাদের এই শাসানোই আমাদের রাতের দিকে গভীর মনোযোগী করলো। ততদিনে মুখে মুখে চাউড় হয়ে গেছে, “রাত ১২ টার পর নীল ছবি চলে”! এটা শুনে আমাদের কিউরিসিটির মাত্রা আরও বেড়ে গেল! নিজেরা আলোচনা করলাম, এই নীল ছবি আবার কী ছবি? সাদাকালো জানি, জানি রঙিনও? কিন্তু নীল রঙের ছবি হয় এটা কেমন? আর ছবি নীল রঙের হলেই সেটা রাত ১২টার পর দেখাতে হবে কেন? রঙ্গিন ছবিগুলো দেখাতে তো এটা করা হয় না?

সেই দিনগুলোতে আমাদের রাতে বাড়ী থেকে বের হওয়ার অনুমতি ছিল না। কিন্তু তাতে তো আর আমাদের কিউরিসিটির মাত্রা আঁটকে থাকতে পারে না? দলবেঁধে যুক্তি করে বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বেয়াড়া নিতাই আর মজ্জেলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো এই নীল ছবির রহস্য ভেদ করার জন্য। সিদ্ধান্ত হলো- রাত ১২টার পর চাদর মুড়ি দিয়ে ওরা ক্লাবে যাবে! যদি ওদের ভিতরে ঢুকতে না দেয় তাহলে তারা ক্লাব ঘরের টিনের ফুটো দিয়ে সেই ছবি দেখে আসবে।

পরদিন সকালেই আমাদের জানা হয়ে গেল, এই নীল ছবি আসলে কী ছবি। এবার কিভাবে এই ছবি দেখা যায় তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলাম। স্কুল পালিয়ে মধুদের বাড়ীর বড় টিনের ঘরটার চালে আস্তানা গাড়লাম আর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে নানা কুযুক্তি করলাম। ভাবলাম, কী করা যায়? শুধু আমরাই না। দেখলাম, আমাদের এক-দুই ব্যাচ সিনিয়ররাও আমাদের মত করেই চিন্তা করছে!

উদ্দেশ্য যখন এক তখন আর কী? আমদের বঞ্চিত সব ব্যাচ এক হলো এবং একদিন রাতে ক্লাবে সব দল মিলে হামলা চালানো হলো! ক্লাবের গেটম্যান, যে আমাদের সিনেমা হলে ঢুকতে বাঁধা দিতো, সে ছিল এলাকার কুখ্যাত লোক। নীল ছবির লোভের কাছে তার সেই কুখ্যাত ব্র্যান্ড তুচ্ছ হয়ে গেল, আমাদের সিনিয়ররা তাকে চ্যাংদোলা করে খোলা মাঠে ধরে এনে অন্ধকারে পিটাইয়া হাড়গোর নড়বড় করে দিলো। পাশাপাশি চলল ক্লাব ঘরের উপর একটানা ইটের ঢিল।

পরদিন বিচার। কিন্তু বিচারে কোন বিচারকই এলো না। ফলে যে মার খেলো, সে তা নগদ পেলো আর আমরা জিতে গেলাম। উল্টো সে এতদিন যে কারণে কুখ্যাত ছিল মার খাওয়ার পর তার সেই কারণটা আর খুঁজে পাওয়া গেল না! ওর প্রতি মানুষের যে ভয় ছিল সেটাও ভেঙে গেল। ওরও আত্মবিশবাস কমে গেল। বলা যায় সবদিক থেকেই আমাদের জয় হলো। এরই প্রভাবে আমাদের বিনা পয়সায় সিনেমা দেখার সুযোগটা আরো বেড়ে গেল। কিন্তু যেহেতু এলাকার সব বড় ভাইরা মিলে ওটা চালায়, তাই সেই ক্লাবে রাতের ছবি দেখার আশা আমাদের পরিত্যাগ করতেই হলো! ততদিনে নীল ছবির নামে লজ্জা পেতে শুরু করেছি। কিন্তু ইচ্ছাটা থেকে গেল ষোল আনা।

অবশ্য সবাইকে আটকানো গেল না, আমাদের বন্ধুদের মধ্য থেকে দুই-একজন যারা একটু বেশী বেয়াড়া ছিল তারা এই ছবি দেখতে সক্ষম হলো। কারণ বড় ভাইরাও ততদিনে ব্যবসায় ক্ষতি আর গ্যাঞ্জামের ভয়ে চোখ বুঝে ফেলেছেন।

এর কিছুদিন পর। দুর্গাপূজার উৎসবের রাতে। রাতের শোতে আমি আর আমার বন্ধু স্বটন ‘তেরী মেহেরবানী’ ছবি দেখার জন্য সেই ক্লাবে গেলাম। ইচ্ছা, ওই ছবি শেষ হলে পরের শো’টাও দেখবো। শো চলাকালীন সেই সময়ে ক্লাবের আশেপাশের সব লাইট নিভিয়ে রেখে এলাকাটাকে অন্ধকার করে রাখা হতো- যাতে করে লেট নাইটের শোতে দর্শকদের আসতে কোন সমস্যা না হয়। একে অপরের সাথে গুঁতা খেলেও যেন কেউ কাউকে চিনতে না পারে! আর পারতপক্ষে সেখানে কেউ কারো মুখের দিকে তাকাতো না কারণ সেটা বিশাল রিস্কি।

সিনেমা শুরুর কিছুটা পর আমরাও চুপ করে গেটম্যানকে টাকা দিয়েই টুপ করে হলে ঢুকে পড়লাম। অন্ধকার হলরুমে প্রথমে চোখে কিছু দেখলাম না। শুধু দেখলাম দূরে একটা রঙিন টিভিতে জ্যাকী স্রফের ছবিটা চলছে। তখন আমাদের বয়স কত আর হবে? এই ধরেন চৌদ্দ কি পনের। আমরা দুজন সবার পিছনে বসে পড়লাম। আমি ছোটবেলা থেকেই লম্বু হওয়ায় পিছন থেকেও টিভিতে চলা ছবিটা দেখতে পাচ্ছিলাম কিন্তু আমার বন্ধু টেঙ্গু হওয়ায় সে কিছুই দেখতে পারছিলো না। কুলি ছবির সেই যুগে সবাই আমাদের দুইজনকে এই নামেই ডাকতো। আর আমারও থাকতাম একই সাথে, একই বাড়ীতে। পড়তাম একই ক্লাসে।

সেখানে চোখ কিছুটা ধাতস্থ হওয়ার পর, আমরা বসে থাকা দর্শকদের ফাঁকফোঁকর দিয়ে অনেকটাই সামনে চলে এসেছি। তখন অবস্থা এমন ছিল যে চাদর, মাফলার দিয়ে মুখ ঢেকে থাকা দর্শকবৃন্দরা যেন পন করেই এসেছে- আর যাই হোক কারো মুখের দিকে তাকানো যাবে না। কিন্তু আমাদের অত চিন্তা নাই। ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে সামনের দিকে ক্লাব ঘরের একটা বড় কাঠের খুঁটির কাছে এসে আঁটকে গেলাম। সামনে দুই তিনজন বিশালদেহী মানুষ বসে থাকায় ঠিকমত টিভিতে চলা ছবিটা দেখতে সমস্যা হচ্ছিল আমাদের। বিশেষ করে আমাদের ঠিক সামনের খামটার সাথে হেলান দিয়ে থাকা লোকটা খুব সমস্যা করছিলো।

আমরা দুই বন্ধু মুখ চাওয়া চাওয়ী করলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম সামনের লোকটাকে সরতে বলবো! পিছন থেকে আস্তে করে দুই-তিনবার বললামও কিন্তু সে ছবির কুকুরটার ভেল্কীবাজীতে এমন ডুবে গেছে যে কিছুই শুনতে পেল না! অগত্যা তাকে সরানোর জন্য তার কাঁধের দিকে যেই হাত বাড়িয়েছি ওমনি বন্ধু স্বটন আমার হাতটা চেপে ধরলো। আতঙ্কিত চোখে ওর ঠিক সামনে বসে থাকা লোকটাকে দেখিয়ে ফিস ফিস করে বলল, দেখ এটা কে?

হ্যাঁ! দেখলাম উনি আমাদের এলাকার মহামান্য ঠাকুর কর্তা। এবার আমরা প্রমাদ গুনলাম কারণ উনি যখন আছেন তখন আমার বড় কাকা আর আমাদের ভয়াবহ প্রাইভেট স্যারও আছেন। যার হাতচলা মানেই বেতচলাকে বোঝায়? এছাড়াও তিনি মুখে জ্ঞান দেওয়ার চাইতে বেতে জ্ঞান দিতেই বেশী পছন্দ করেন। এমনিতে পড়ায় ভাল কিন্তু একবার বেত মারা শুরু করলে আর থামতে চাইতেন না, যতক্ষন না তা উত্তম মধ্যমে পরিণত হচ্ছে! আবার এই তিনজন হলেন মানিক জোড়। জীবনে যা তারা করেন, তা তিনজন মিলেই করেন! অতএব এখানেও ওনারা এক সাথেই আছেন!

হুশ ফেরার সাথে সাথেই খেয়াল করলাম স্বটনের বামপাশে আমার কাকাবাবু বসে আছেন। আর আমি যাকে সরাতে ঠেলা দিতে যাচ্ছিলাম তিনি আমাদের স্বয়ং স্যার। মনে মনে ওরে বাবা! বলে চিৎকার করে উঠলাম! দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে ছবি শেষ করেই ভোঁ-দৌড়ে এলাকা ছাড়লাম।

আমাদের এই স্যার সিনেমার ফ্যান ছিলেন। জীবনে তিনি যত ছবি দেখেছেন তার নাম একটা খাতায় লিখে রেখেছিলেন। পড়ার শেষের দিকে আমরা ইচ্ছা করেই স্যারের সাথে সিনেমার গল্প জুড়ে দিতাম। ঘটনার প্রায় দু বছর পর ক্লাস টেনে ওঠার পর, ব্যাচে পড়ার সময় একদিন মুখ ফসকে বন্ধু চূড়া স্যারকে আমাদের এইদিনের ঘটনা বলে দিলেন। আর যাই কই? স্যারের প্রিয় বাঁশের কঞ্চিটা দিয়ে আমার আর স্বটনের উপর উত্তম মধ্যম দিতে শুরু করলেন। আমাদেরটা শেষ হওয়ার পর শুরু হলো চূড়ার উপর। চূড়া মার খেতে খেতে কোনরকমে বলতে পেরেছিল, স্যার আমাকে মারেন কেন আমি তো কিছু করি নাই! করেছে ওই সুকান্ত আর স্বটন! “তুঁই আমাকে আগে বলিস নাই কেন?” বলতে বলতে স্যার ওকে ধোলাই করলেন।

আমরা একা খাবো কেন? পরে আমাদের সাথে থাকা আরও যে কয়টা ছিল সব কয়টারে ধোলাই খাওয়ালাম এই বলে যে, স্যার ওরাও বিষয়টা জানতো কিন্তু আপনাকে বলে নাই!

পুনশ্চঃ আমাদের সবার প্রিয় দাদু ‘ঠাকুর কর্তা’ আর আমার ‘বড় কাকা’ ইতিমধ্যেই স্বর্গীয় হয়েছেন। আর নদীতে বাড়ী ভেঙে যাওয়ার পর এক প্রকার ভূমি ও অর্থহীন অবস্থায় পরিবার পরিজন নিয়ে ভারতে চলে গেছেন আমাদের প্রিয় স্যার। তার কাছে আমরা সবাই ব্যাচে পড়তাম। জানি না তিনি এখনো বেঁচে আছেন কিনা! আমার শিক্ষার ভিত গড়ে দিয়েছেন এই স্যার! বাংলা ও ইংরেজী গ্রামার থেকে বাক্য গঠন পর্যন্ত সব শিখিয়েছেন এই স্যার! আমি যত প্রবাদ বলি তার প্রায় সবই এই স্যারের শিক্ষা! ওনাদের সবার প্রতি শ্রদ্ধা!

২৫/১২/২০১৬