ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমাদের শৈশব ও কৈশোর কালটা কেটেছে পুড়োটাই পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে। আবার এক ধরনের স্বাধীনতাও আমরা উপভোগ করতাম। একে গ্রাম্য ভাষায় যদি বলি, তাহলে বলতে হয় “ছাড়া গরুর মত করে আমরা বড় হয়েছি”। অর্থাৎ গৃহপালিত ছিলাম ঠিকই কিন্তু গলায় দড়ি ছিল না! ফলে সুযোগ পেলেই ঘাস খাওয়ার সুযোগে অন্যের জমির দুই-চারটা ধান গাছও খেয়ে ফেলতাম। সেক্ষেত্রে গরু ছাগলকে যেমন মাঝে মাঝে খোয়াড়ে যেতে হতো, আমাদেরও একইভাবে মাঝে মাঝে বিচারের সম্মুখীন হতে হতো।

এই যেমন, আমাদের দলের একটা অংশ হঠাৎ করেই আমাদের কিছু না জানিয়ে আমাদেরই এক ঘরকুনো বন্ধু- শ্যামলদের গাছ থেকে লিচু মেরে দিলো। কারণ কেউ একজন দুই-চারটা লিচু পেড়ে খেতে চাইছিল, কিন্তু তা তাদের দেওয়া হয় নাই! দুই-একশত লিচু চুরি করলে না হয় মেনে নেওয়া যেত কিন্তু ওরা যেটা করেছিল, রাতের অন্ধকারে চটের ব্যাগ দিয়ে বেঁধে রাখা গাছের পাকা লিচুর প্রায় পুড়োটাই মেরে দিয়েছিল। প্রথমে কেউই টের পায়নি কাজটা কে করেছে, কখন করেছে? ফলে পাড়ার নেতৃস্থানীয় ‘বড় ভাই’ গ্রুপের দুই চারজনকে ‘কিনে আনছি’ বলে সেই লিচুর অল্প কয়েকটা সুযোগ বুঝে খাওয়ানো হলো।

আমি চুরিতে না থাকলেও জানাজানির আগেই সেই মালের ভাগ পেলাম এবং দলবেঁধে ফুর্তিতে সমানে লিচু গিলতে শুরু করলাম। এবার জানাজানির পর বিচারের পালা এলো। দল হিসেবে আমরা সবাই দোষী সাব্যস্ত হলাম কিন্তু দেখা গেল কেউই আমাদের শাস্তির বিষয়ে তেমন কিছু বলছে না, উল্টো হালকা ধমক-টমক দিয়ে ছেড়ে দিলো। কী কারণে এটা হলো বুঝলেন তো? ওই লিচু, বিচারকরূপী আমাদের বড় ভাইদের পেটেও ছিল। তারাও জানে আমাদের কিছু হলে তারাও যে সেই লিচু খেয়েছে সেটাও ফাঁস হবে।

এটা ছিল শত ঘটনার একটা মাত্র। সেই সময়ে আমরা সবাই যে যার মত করে কাজ সমাপ্ত করে পরে দলকে খবর দিতাম। অনেকটা আজকের স্লিপার সেলের মত করে। এই যেমন, একদিন মদন, আওয়ালরা মিলে ওদের পাড়ায় এক কাঁঠাল গাছের কাঁঠাল চুরি করলো। কিন্তু সমস্যা হলো- সেই কাঁঠাল ওদের পক্ষে বহন করা সম্ভব হলো না। গাছ থেকে চুরি করার সময় ওদের এই হুশ ছিল না। অগত্যা তারা সেই কাঁঠাল, পাশেরই একটা জংগলে নিয়ে গিয়ে মাটিতে পুতে রেখে আসলো। দুইদিন পর আমরা সবাই মিলে সেই কাঁঠাল তুলে খাবো বলে জংগলে যেয়ে দেখি পাকা কাঁঠালগুলো শেয়ালরা তুলে খেয়ে ফেলেছে। আবার পিকনিকে মজ্জেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে একটা মুরগী আনার। ও সেটা কেনার চেয়ে চুরি করাকেই বেঁছে নিলো। রাতের আঁধারে সে তাদের পাশের বাড়ীর মুরগীর খাঁচাটা মাথায় নিতেই সেটার তলা ভেঙ্গে ওর মাথাটা মুরগী বোঝাই খাঁচার মধ্যে ঢুঁকে আঁটকে গেল। ফলে যা হওয়ার তাইই হলো সে হুলস্থূল বাঁধিয়ে ধরা পড়লো। পরের দিনগুলোতে আমরা ওকে ক্ষ্যাপাতে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করতাম, হ্যাঁরে মজ্জেল! যখন তোর মাথাটা খাঁচার ভিতরে আঁটকে ছিল তখন তোর কেমন লেগেছিল? মুরগির গু খেতে ক্যামন স্বাদ বলতো দোস্ত? ও উত্তর না দিয়ে আমাদের মারার জন্য ধাওয়া করতো।

সেই সময়ে কোন বাড়ির গাছে পেঁপেগুলো কবে পাকবে? কোন গাছে কোন পাখির বাসায় ডিম আছে, কোন বাড়ির মেয়ের বিয়েতে গেট আঁটকে টাকা নিতে হবে? এই খবরগুলো ছিল আমাদের নিত্যকাজ। আর ছিল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ও আবাহনি-মোহামেডান ক্রেজ। স্কুল বাদে দিনের সারাটা সময় আমরা কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকতাম। খেলতাম ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, দাবা থেকে শুরু করে গোল্লাছুট পর্যন্ত। নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি করার কথা না হয় বাদই দিলাম।

সেই সময়েই আমি কয়েক ধরণের তাস খেলা শিখে ফেলি। আমার বড় কাকা ও ঠাকুরকর্তা যাদের কথা আগের লেখায় বলেছি- তারা ছিল আমাদের অঞ্চলের ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ’ খেলায় চ্যাম্পিয়ন। সেই সময়েই তারা এই খেলা খেলতে শহরে হায়ারে যেত। এছাড়াও আমাদের গ্রামে ছেলেদের যত বিয়ে হতো তার প্রায় সবগুলোতেই বরযাত্রী সেজে যাওয়ার চেষ্টা করতাম আমরা। পাশাপাশি দুর্গা ও সরস্বতী পুজার সিজনে চাঁদাও তুলতাম।

অবশ্য আমাদের একটা ভালোগুণও ছিল সেটা হলো কারো বিপদ হলে তাতে দলবেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। বিশেষ করে গরীবের মেয়ের বিয়েতে আমরা সাহায্য করতে কখনো পিছপা হতাম না। সেটা হোক চাঁদা তুলে টাকা দেওয়া অথবা নিজেরা গায়ে খেটে বিয়ে নামিয়ে দেওয়া। মোটকথা, সেই সময়ে আমরা গ্রামে ভলান্টিয়ার সার্ভিসও দিতাম।

সেই সময়ে আমাদের পাড়া ও গ্রামগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন বয়সের অনেকগুলো গ্রুপ ছিল। আমাদের বাবা-জ্যাঠা মশায়দের যেমন গ্রুপ ছিল, তেমনি ছিল আমাদের বড় ভাইদেরও গ্রুপ, ছিল আমাদের গ্রুপও। পূজাপার্বণ, ঈদ আর উৎসবে সব গ্রুপই যে যার মত করে তাতে অংশ নিতো। সেসময়টাতে আমাদের গ্রামের মানুষেরা নিজেদের কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি অনেকধরনের খেলাধুলা আর সামাজিক উৎসবে মেতে থাকতো। এই যেমন দুর্গাপূজা আর সরস্বতী পুজাতে আমরা ভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে তা আয়োজন করতাম। আমাদের ক্লাবের নাম ছিল নবীন সমিতি। এই সমিতির ব্যানারের আমরা সরস্বতী পুজো করতাম। আবার দুর্গাপুজোও করতাম কিন্তু সেটা হতো ভিন্ন নামে, অন্যগ্রামে। যাকে আমাদের এলাকায় ছোটদের পুজো বলে ডাকা হতো। আমাদের বন্ধু মানু পালবংশে জন্ম না নিলেও কেমন করে যেন প্রতিমা বানানো শিখে ফেলেছিল! তখন আমরা বড়জোড় ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ি। ও খুবই ছোট করে দুর্গা প্রতিমা বানাতো আর আমরা সবাই মিলে বিদেশদের বাড়ীতে সেই প্রতিমায় একটা বারোয়ারী পুজোর আয়োজন করতাম। আমাদের সেই পূজায় প্রচুর দানের টাকা উঠতো। তা দিয়েই প্রায় খরচটা উঠে যেত। এছাড়াও নিজেরাও চাঁদা দিতাম- যেটা আসতো পুজো উপলক্ষ্যে বাবার বাড়ী বেড়াতে আসা আমার দিদিদের কাছ থেকে। এছাড়াও বাবা-মা’র কাছ থেকেও নিতাম। শেষ পর্যন্ত যদি তাতেও না কুলাতো, তাহলে চোরাই মাল হিসেবে আমাদের বাড়ীতে জমানো পুরনো প্রত্রিকা বিক্রি করে দিতাম। এই পণ্যটা ছিল আমার ছোটবেলায় টাকা সংগ্রহের ইমার্জেন্সী খাত। কারণ আমার হাতে নগদ টাকা না দেওয়ার একটা কঠোর নির্দেশ দেওয়া ছিল আমাদের বাড়ীতে। আর সেটা দিয়েছিলো আমার বাবা। তার ধারণা ছিল- টাকা হাতে পেলেই ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে!

আবার দেখা যেত ঈদের দিনও আমরা ভিন্নগ্রুপে ভাগ হয়ে বন্ধুদের বাড়িতে খেতে যেতাম। ঈদের দিন আমরা প্রচুর সেমাই, খিচুড়ি আর মুরগীর মাংস খেতাম। আমাদের বন্ধু মনোয়ারদের বাড়ির দাওয়াত ছিল দুই ঈদে কমন, আর সেটা হতো রাতে খাসি মেরে। অন্যবন্ধুরাও সেই খাসিতে টাকা খাটাতো! মোটকথা, সেই সময়ের সামাজিকতায় মানুষে মানুষে ঝগড়া ফ্যাসাদ থাকলেও, তাদের মধ্যে খুব একটা ধর্মীয় বিদ্ধেষ ছিল না। আমাদের এলাকাটা কাপড়ের জন্য বিখ্যাত হওয়ায়- মানুষের কাজেরও কোন অভাব ছিল না। অধিকাংশ পরিবারই কোন না কোন ব্যবসায় জড়িত থাকায় হাতে কমবেশি সবারই টাকা থাকতো। আর ছিল অনেকগুলো ধনী পরিবার। একমাত্র নদী ভাঙনই ছিল আমাদের দুঃখের কারণ। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-গরীব নির্বিশেষ আমাদের সবারই কমন শত্রু ছিল একটাই, আর সেটা হলো- যমুনা নদী!

ভিসিআর আসার পর আমাদের কৈশোর জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এলো। হঠাৎ করেই আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের আরও একটা জীবন আছে; আর সেটা হলো যৌন জীবন। সেই ক্লাস এইটেই দেখা দিলো হস্ত মৈথুনের ভাইরাস। কারো কারো দেখা দিলো স্বপ্নদোষের মত এক ভয়াবহ রোগ। ফলে অনেকেই হাজির হলো রাস্তার কবিরাজের কাছে। আবার কেউ কেউ যমুনা নদী পার হয়ে উপস্থিত হলো টাংগাইলের বেশ্যাপাড়ায়। আমার অভিজ্ঞতা বলে, ’মানুষেরা এক থালায় ভাত খেতে আপত্তি করলেও, গ্লাসে জল আছে না পানি আছে তা নিয়ে ফ্যাসাদ বাঁধালেও, একই বেশ্যার কাছে লাইন ধরে যেতে কোন আপত্তি কেউ কখনো করেনি’!

আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই জেনে ফেললাম, আমাদের চেয়ে দুই-তিন বছরের বড়- ইঁচড়ে পাকা ছেলেদের সাথে আমাদের গ্রুপেরও এক দুইজন সেই পাড়ায় যেতে শুরু করেছে। তখন সময়টা ছিল এমন যে, ’কাজটা খুবই খারাপ’- সেটা আমরা সবাই জানতাম! কিন্তু ঐ যে, নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি মানুষের সেই আজন্ম লোভ?- সেটা আমাদের দলকেও আকৃষ্ট করলো।

প্রথমে যারা সেখানে যেতে শুরু করলো- তারা ঘুরে এসে তাদের অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করতো আর আমরা মাঠে-ঘাটে গোল হয়ে বসে তা মন দিয়ে শুনতাম। এমনি পর্যায়ে ওদের দল আরও ভারী হতে থাকলো আর আমরা কয়েকজন মিলে তাতে বাঁধা দিতে শুরু করলাম। ঠিক সেই সময়টাতেই আমরা এসএসসি পাশ করে যে যার মত করে গ্রাম থেকে শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়লাম। পাশাপাশি সময়ে আমাদের সোহাগপুর গ্রামসহ আশেপাশের কয়েকটা গ্রাম যমুনা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হলো। ফলে আমাদের সাজানো গোছানো ‘গ্রাম্য কৈশোর’ জীবনটা- ভিসিআর আর নদী ভাঙনে তছনছ হয়ে গেল।

পূর্বের লেখাঃ

১) বেওয়ারিশ কুকুর ও আমাদের লালু আর বাঘা
২) ভিসিআর আর শিরোনামহীন অনুভূতি

৩০/১২/২০১৬