ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

এসএসসিতে আমি খুব একটা ভাল রেজাল্ট করতে পারলাম না। সেটা যতটুকু না পড়ালেখার কারণে তারচেয়ে বেশী ছিল পরীক্ষার হলেও আমাদের দুষ্টুমিটা বজায় রাখার কারণে। আগের বছরগুলোতে পাবলিক পরীক্ষায় নকলের মহাৎসব চলার কারণে ৮৯ সাল থেকে এই পরীক্ষাগুলোতে ব্যাপক কড়াকড়ি শুরু হয়। আমরা ছিলাম ১৯৯০ সালের ব্যাচ এবং পড়তাম শত বছরের পুড়নো শ্যামকিশোর হাইস্কুলে। এটা ছিল আমাদের অঞ্চলের সবচেয়ে নাম করা স্কুল। সেসময়ে পরীক্ষাগুলোতে পাশ করা এখনকার মত এত সহজ ছিল না। ছিল না এমসিকিউ পদ্ধতিও। ফলে আমাদের সবই জেনে বুঝে ও মুখস্থ করে লিখতে হতো। আর ছিল- এক বিষয়ে ফেল করলেই ‘পরীক্ষায় ফেলের’ নিয়ম, ছিল না কোন গ্রেস মার্কও।

এরই চক্করে পরে আমাদের আগের ব্যাচের কয়জন বন্ধু ইংরেজিতে দুই-তিন মার্কের জন্য ফেল করে আমাদের ব্যাচে চলে আসে। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে আমাদের সবার রোল অনুযায়ী সীট পড়েছে এবং আমরা সেই অনুযায়ী পরীক্ষা দিচ্ছি। বন্ধু নিতাই আর পরিতোষ বসেছে আমার এক বেঞ্চ পিছনে। ইংরেজী প্রথম পর্বের পরীক্ষা চলছে আমি সবার সামনের সিটে বসেছি। একটা প্রশ্ন বুঝতে না পেরে নিতাই পিছনে থেকে আমাকে একটু জোরে জিজ্ঞাসা করলো, আর ঠিক সেই সময়েই ম্যাজিস্ট্রেট মজিবর রহমান এসে আমার খাতা নিয়ে গেলেন। ভয়ে আমি আধমরা হয়ে গেলাম। অবশ্য তিনি আমার খাতাটা আমাদের স্যারের কাছে দিয়ে গেলেন। স্যার আমাকে দশ মিনিট পরে তা ফেরত দিলেন কিন্তু ততক্ষণে আমি আমার জানা সব উত্তর ভুলে গেছি। সেই পরীক্ষা আমার খুব খারাপ হলো। পরবর্তী পরীক্ষাগুলো ভাল হলো কিন্তু বুককিপিং পরীক্ষায় আবারো একই ভুল করলাম।

আমরা বাণিজ্য শাখায় হওয়ায় এই পরীক্ষার সব ছাত্রদের এক হলরুমে বসতে দিয়েছে এবং কোন সিট ফেলেনি স্যারেরা। ফলে যা হওয়ার তাই হলো আমরা পুড়ো গ্রুপ একটা জায়গায় পাশাপাশি সিটে বসলাম। প্রশ্ন পেয়েই আমি বুঝলাম এই পরীক্ষায় আমি কমপক্ষে ৯৫ পাবো। ৮০ মার্কের উত্তর কারেক্ট করার পর আমার মধ্যে আবারো দুষ্টামি জেগে উঠলো। এবার আমার ঠিক পিছনে বসা বাঁশীকে ঘাড় ঘুড়িয়ে আস্তে করে বললাম, শালা এতক্ষন খাতা দেখে দেখে ভালই লিখছোস, এবার রেওয়ামিলের যোগফলটা তুঁই কর আর বল আমি লিখি? অথচ এটা করতে আমার মাত্র ১ মিনিট লাগতো পুড়ো অংকটা খাতায় লিখে ফেলেছি জাস্ট যোগ করে ফল বসাতে হবে। ফলটা বসালেই পাক্কা ৯০ মার্ক। কিন্তু আমার মাথায় ভুত চাপলো! আমার বলতে দেরী হয়েছে কিন্তু ম্যাজস্ট্রেট মজিবর রহমানের তা দেখতে দেরী হয়নি। যেহেতু হাইটে লম্বা ছিলাম তাই দূর থেকে সে আমার ঘাড় ঘোরানো দেখেছে। তখনো পরীক্ষার ৩০ মিনিট বাকী। হটাৎ করেই তিনি পিছন থেকে ছুটে এসে আরও অনেকের সাথে আমার খাতাটাও নিয়ে গেলেন এবং স্যারদের বলে গেলেন আর ফেরত না দিতে। আমি ৫ মার্কের জন্য ফার্স্ট ডিভিশন পেলাম না এবং এই বুক কিপিং-এ ৮০ পেলাম। শুধুমাত্র যোগটা নিজে করলেই পেতাম ৯০। ওরা আমার খাতা দেখে লিখে বেশীর ভাগই পেল ৮৮, আর কেউ কেউ পেল ৯০ প্লাস। আমি শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে বড় হোঁচটটা খেলাম। সেই থেকে আমার জিদ চাপলো আমিও ম্যাজিস্ট্রেট হবো। অবশ্য পরে বড় হয়ে ‘কচু’ হয়েছি!

আমার যখন এসএসসি রেজাল্ট হয়, তখন আমাদের সোহাগপুরের বাড়ির ৯০ ভাগই ভেঙ্গে গেছে। চোখের সামনে আমাদের বারোয়ারী বাড়িটা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। এই বাড়িটা ছিল আমার মামাতো বোনের বরের পৈত্রিক বাড়ি। তাদের চার শরিকের মধ্যে বিভক্ত ছিল বাড়ীটা। কিন্তু তাদের বংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রায় দশ বিঘার এই বাড়ীটাই ছিল একটা গ্রামের মত। এর মধ্যে এক শরিক নিঃসন্তান ছিলেন। এই দম্পতির স্ত্রী’টি হটাৎ করেই মই থেকে পড়ে মারা গেলেন। বৃদ্ধ পুরুষটি নিঃসঙ্গ হয়ে যাওয়ায় তাকে দেখার আর কেউ থাকলো না। এমনই অবস্থায় ভারত থেকে তার আপন ভাতিজা এসে তাকে নিয়ে যেতে চাইলেন। এবার আসলো বাড়ী বিক্রী করার বিষয়। সেই সময় আশেপাশে নদী ভাঙন চলছে। কেউই সেই বাড়ি কিনতে চাইলো না। আর কেউ কেউ কিনতে চাইলেও শরিকরা তাদের কাছে তা বিক্রি করতে রাজী হলেন না। সেই সময় আমাদের দেলুয়া গ্রামের দুটো বাড়িই নদীতে ভেঙ্গে গেছে। আমার বাবা-জেঠা নতুন একটা জায়গা কিনলেন চালার অফিস পাড়ায় ইউএনওর বাসার সামনে। কিন্তু কেনার পর কিছু মানুষের শয়তানীতে সেই জায়গাটা সরকার একোয়ার করে নিলেন ভবিষ্যতে তাদের লাগবে বলে। শয়তানীটা করলেন, যার কাছ থেকে আমরা সেই জমিটা কিনেছিলাম সেই ব্যক্তি। তিনি আমাদের কাছে জমি বিক্রি করেই সরকারের উপর লেভেল চিঠি লিখলেন, এই বলে যে এই জায়গাতে বাড়ী হলে তা সরকারের কাজে ব্যাঘাত ঘটাবে। তখন এরশাদের আমল চলছিল উনিও সম্ভবত তখন তার দলে যোগ দিয়েছিলো!

আমাদের বাবা-জেঠা তখন উভয় সংকটে পড়লেন। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ঠিক তখনই আমার জামাইবাবু জেঠাকে এই অংশটা কিনে নিতে বললেন। একবছর আগেই আমাদের ব্যবসাটা এই বাড়ীরই একটা বিল্ডিং ভাড়া করে তাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেই ব্যবসার হাল ধরে রেখেছেন আমার বড় দাদা। তিনি তখনো বেঁচে ছিলেন। বাড়ী কেনার প্রস্তাবে আমার বাবা-জেঠা উভয়েই রাজী হলেন। এদিকে নদীতে দুই গ্রামেরই সামনের দিকের অনেকটা অংশ ভেঙ্গে যাওয়ায় আমরা দেলুয়া গ্রামের বাড়ী থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম, সোহাগপুরের যে বাড়ীটা আমরা কিনতে যাচ্ছি তার পূর্ব দিকের রফিক তালুকাদার ও মোয়াজ্জেম সাহেবের বাড়ীগুলো যা ছিল মূলত ছিল জমিদার বাড়ী, সেগুলো নদীতে ভেঙ্গে যাচ্ছে। বড় বড় দালান শব্দ করে ইট কাঠের চাই নিয়ে নদীতে পরে যাচ্ছে। তারপরও আমাদের সেই বাড়ীর অংশটা কিনতে হলো কারণ তখন আমাদের মাথা গোঁজার আর ঠাই ছিল না। একদিন অবস্থা বেগতিক দেখে, কেনার প্রস্তুতি চলাকালীন সময়ই মা-বড়মাসহ নৌকায় করে আমরা সোহাগপুরের বাড়ীতে চলে এলাম। পরে এখানে প্রায় ৯ বছর থাকতে পেরেছিলাম।

দেলুয়া-সোহাগপুর ছিল পাশাপাশি দুটো গ্রাম। মানিক জোড়ের মত করে সবাই এদের একসাথে ডাকতো। দুটোই ছিল প্রাচীন গ্রাম। সোহাগপুর ছিল সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু। এই গ্রামের জমিদার কালিদাস চৌধুরী ও তার আরও চার ভাইয়ের মোট পাঁচটা বৃহৎ আকারের বাড়ী ছিল এক সারিতে। দক্ষিণ সদরি সবগুলো বাড়ীর সামনে ও পিছনে দুটো করে ঘাট বাঁধানো পুকুর ছিল। সারি সারি সব বড় গাছের ছায়ায় রাজকীয় বিল্ডিংগুলো ছিল, সেগুলোতে নানারঙের নকশা ও কারুকাজে ভর্তি ছিল। দেশ বিভাগের পর মূল মালিকরা ভারতে চলে গেলেও শুধুমাত্র যতিন চৌধুরীর কিছু বংশধর এদেশে থেকে গেলেন। পূর্ব দিকের সবচেয়ে বড় বাড়িটি কিনে বা লিজ নিলেন রফিক তালুকদার, তারপরেরটা নিয়েছিলেন মোয়াজ্জেম সাহেব। পরেরটাতে ছিল আমাদের আত্মীয়রা যাদের একটা অংশ আমরা কিনে নিয়েছিলাম। চতুর্থটাতে ছিল সরকারের ভূমি অফিস আর সবশেষের কালিদাস চৌধুরীর বাড়ীতে ছিল বেলকুচি থানা।

সোহাগপুর কাপড়ের হাঁটের জন্য বিখ্যাত ছিল। সেই সময়ে তাঁতের কাপড় ক্রয়-বিক্রয়ের সবচেয়ে বড়কেন্দ্র ছিল এই হাঁট। সারাদেশ থেকে পাইকাররা এখানে আসতো তাদের পন্য কেনার জন্য। আর এই অঞ্চলের সব তাঁত ফ্যাক্টরীর মালিকেরা তাদের কাপড় বোনার যাবতীয় সুতা রং কিনতো এখান থেকেই। মঙ্গলবারের বিকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকাররা এই মালিকদের বা তাঁতিদের কাপড় কেনার অর্ডার দিতো আর বুধবার সারদিন চলতো হাঁটের মূল বেচাকিনি। চলতো টাকার লেনদেন। হাটের পর অবশ্য মহাজন বাড়ী থেকেও বেচা বিক্রি চলতো। আমাদের পরিবার ছিল সুতা-রঙের সবচেয়ে বড় হোলসেল ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে অন্যতম। আবার আমাদের মহাজন ছিল নারায়ণগঞ্জে। টানবাজারের দারোগা বিল্ডিং-এ ছিল আমাদের গদি। তখন আমাদের দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না, ছিল না ভাল রাস্তা-ঘাট। ফলে নগদ টাকা নিয়ে রাস্তায় চলাচল করা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়ই লঞ্চে, বাসে ডাকাতি হতো সেই সময়ে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য নরসিংদী, কুমিল্লা অঞ্চলসহ বাবুর হাঁটের বড় বড় পাইকাররা তাদের নগদ টাকা নারায়ণগঞ্জে প্রথম দিকে আমার বাবার হাতে দিতো, পরবর্তীতে তা আমাদের কর্মচারী সুভাষদা ও দাদাদের কাছে দিতো। তারা সেই টাকা দিয়ে পণ্য কিনে তা কার্গো জাহাজে করে সোহাগপুর হাঁটে পাঠিয়ে দিতো। এবং সেই টাকা পরবর্তীতে হাঁট বারে আমাদের গদি থেকে তারা বুঝে নিতো। এটাকে বলা হতো বরাতি ব্যবসা।

আমাদের পূর্ব পুরুষদের বাড়ি ছিল কীর্তিখোলা। সেখানেই আমার বাবার জন্ম। সেই বাড়ী যমুনায় ভেঙ্গে গেলে আমাদের ঠাকুর দা চলে আসেন বরংগাইল গ্রামে। সেটাও ভেঙ্গে গেলে চলে আসেন এই দেলুয়া গ্রামে। আমাদের জন্ম এই বাড়ীতে। ভাঙন অভিজ্ঞতা থেকে আমার বাবা-জেঠা দেলুয়া গ্রামে আরও একটা বাড়ি কিনে রেখেছিলেন কিন্তু দুটো বাড়িই একই সাথে ভেঙ্গে যাওয়ায় পুরো পরিবার ও ব্যবসা নিয়ে পড়েছিলেন মহাবিপদে।

ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সোহাগপুরের বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই বাবা-জেঠা মিলে আমাদের বর্তমানের বাড়ির জায়গাটা কিনে রাখেন। যা ছিল সোহাগপুর থেকে প্রায় দেড় মাইল পশ্চিমে। আমাদের বর্তমানের বাড়ীটা বেলকুচি আদালত ও থানার মধ্যখানে। অর্থাৎ আমাদের বাড়ীর দুই দেয়ালের দক্ষিণ পাশে আদালত, পোষ্ট অফিস, আর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টার আর উত্তর পাশে বেলকুচি থানা। পুলিশ অফিসাররা থাকতেন অফিসার কোয়ার্টারে। ম্যাজিট্রেট সাহেবও সেই একই বিল্ডিং-এ থাকতেন। আমাদের বাড়ীর উপর দিয়ে দুই অফিসের অফিসারদের চলাচলের শর্টকার্ট রাস্তা ছিল। এবং পারিবারিকভাবে সরকারী কর্মকর্তা ও তাদের পারিবারের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক ছিল। আমাদের বাড়ীতে তাঁতের ফ্যাক্টরি থাকায় তারা প্রায়ই দল বেঁধে কাপড় কিনতে আসতেন। এছাড়াও সেইসব পরিবারগুলোকে আমাদের বাড়ীতে সবসময়য় ওয়েলকাম করা হতো। নিমন্ত্রণ করা হতো যেকোন অনুষ্ঠানে। তারাও সময় কাটানোর জন্য মাঝে মাঝে বেড়াতে আসতেন। আমাদের যৌথ পরিবার হওয়ায় আমাদের বাড়ীতে অনেক মানুষ ছিল, আর অফিসারদের স্ত্রীদের সাথে আমার বৌদিদের ছিল ভাল সম্পর্ক।

সেই সময়েই একদিনে, তখন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। একদিন বাড়ির গদিঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় এই রাস্তা দিয়ে ওসি বাবার হাত ধরে থানায় যেতে যেতে তিনি অর্থাৎ থানার বড় বাবুর ছোট মেয়েটা আমাকে দেখামাত্র নজর বর্ষণ করলেন!

৩০/১২/২০১৬