ক্যাটেগরিঃ ব্লগার উৎপল চক্রবর্তী স্মরণে, ব্লগালোচনা

 

উৎপল দা, এই পোস্ট আমাকে লিখতে হবে কখনো ভাবিনি। আপনি আপনার স্বভাবসুলভ রসিকতায় একদিন আমাকে একটা পোস্টে বলেছিলেন, সুকান্ত, আপনিই আমার পোস্টে সবচেয়ে বেশি কমেন্ট করেছেন। আপনি আরও বলেছিলেন, সুকান্ত, আপনার সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল কিন্তু হলো না! আজ আজকের এই পোস্টটা লিখতে তেমন অনেক কথাই মনে পড়ছে।

তারিখ ৩০ শে এপ্রিল ২০১৭। সেদিন অফিস থেকে বাসে করে ফিরছি। রাত তখন ৯টা বা সাড়ে ৯টা। ‘গাজীপুরের নির্যাতিতা শিশুকন্যাসহ বাবার ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা করা’ – নিয়ে জাহেদ ভাই ফেসবুকে একটা পোস্ট করেছিলেন। সেই পোস্টে মন্তব্য করতে যেয়ে ‘ফিলিপাইনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট দুতারতে’কে নিয়ে আমার লেখাটা সেই পোস্টে শেয়ার দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ বাসে বসেই সেই লেখাটা পড়তে পড়তে হঠাৎ করে আপনার করা কমেন্টে আটকে গেলাম। আপনার করা কমেন্টটা পড়ছিলাম আর ভাবছিলাম, এর উত্তর অন্যভাবেও দেওয়া যেত। কী দেওয়া যেত? সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরলাম।

ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই সুমনদা’র পোস্টটা দেখা মাত্রই আমার শরীরটা ঝাঁকি খেলো। সঠিক তথ্য জানার জন্য উতলা হয়ে সুমনদাকে মেসেঞ্জারে কল দিলাম। প্রথমে তাকে পেলাম না। তার ফোন নম্বর চেয়ে মেসেজ দিয়ে রাখলাম। পরক্ষণেই সেই পোস্টে রিফাত কমেন্ট করছে দেখে তাকেও কল দিলাম। সে ফোন ধরামাত্র বললাম, সঠিক তথ্য জানবো কিভাবে? সেও কিছু জানে না। নিতাইদাকে ফোন দিলাম বাট কিছু বললাম না, কারণ তিনিও অসুস্থ। কথা বললাম, মিতুলের সাথেও! হয়ত জাহেদ ভাইকেও ম্যাসেজ দিয়েছিলাম!

অবশ্য পরে সুমনদা’র সাথে কথা বলে বুঝলাম আপনার দুর্ঘটনা নিয়ে সেও একটা ধাঁধার মধ্যে আছে। সিলেট থেকে তার পক্ষে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরে মেসেজ দিলাম আইরিন আপাকে। তিনি বললেন, আপনাকে লালমাটিয়ার সিটি হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তার শরীরে ৩০-৩৫ ভাগ পুড়ে গেছে। ইনসাইড বার্নিং-এরও চান্স আছে। শোনামাত্র আমার টেনশন আরও বেড়ে গেল। কারণ আমরা প্রায় সবাই জানি ইনসাইড বার্নিং-এর অর্থ কী? তখন রাত ১ টার মত হবে। আমার বউকে বললাম, আমি হাসপাতালে যাবো। সে বলল, এত রাতে তুমি অতদূর যাবে কিভাবে? তারচেয়ে ভোরে যাও। পরে অনলাইন থেকে হাসপাতালের ফোন নম্বর কালেক্ট করে ফোন দিয়ে জানলাম আইরিন আপার তথ্য ঠিক আছে। জানলাম আপনার অনেক বন্ধু-আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে এসেছেন। জেনে কিছুটা সুস্থির হলাম।

রাতে আমার ঠিকমত ঘুম হলো না । আমার বড় ভাইয়ের হার্ট এটাক হওয়ার পর আমি যেভাবে হাসপাতালে প্রথম রাতটা কাটিয়েছিলাম ঠিক একই অনুভূতি হচ্ছিল। এবারের বর্ষপূর্তির কোন পোস্টে আমাকে দেখতে চাওয়ার কথা বারবার মনে হচ্ছিল।

সারারাত অস্থিরতায় কাটিয়ে খুব ভোরে হাসপাতালে এসে হাজির হলাম। উদ্দেশ্য আপনার সাথে দেখা করা অথবা অবস্থা জানা। তখনও হাসপাতালে খুব একটা লোকজন আসেনি। রিসিপশন থেকে আপনার অবস্থান জেনে নিয়ে তিন তলায় গেলাম। গেটে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আর ভাবছি কে হতে পারে আমাদের উৎপলদা’র আত্মীয়? একটু পরই অমিত ও স্বরজিত দা’কে পেয়ে গেলাম। জানলাম, দাদার বোনও সেখানে আছেন। সকাল ১১ টায় ডাক্তারের কথা শুনে দেখলাম আপনার বোন অসুস্থ ফিল করছিলেন। ডাক্তার বলেছেন, তার অবস্থা ৮০:২০ এবং বার্নিং ৩৫-৪০ ভাগ। অর্থাৎ বেঁচে যাওয়ার চান্স কম। তবে সেটা ভালভাবে বলা যাবে ৭২ ঘণ্টা পর। আরও জানলাম আমাদের বৌদিও ‘চিকনগুনিয়া’ অসুখে ভুগছেন, আপনার মেয়ে দুটোও অসুস্থ। তাদের কেউই হাসপাতালে আসতে পারেনি। মনে মনে ‘বিপদ’কে গালি দিলাম!

আমি কাউকে কিছু না বলে নীচের লবিতে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলাম। পরে অমিত আর স্বরজিতের ফোন নম্বরগুলো নিয়ে মন খারাপ আর টেনশন নিয়ে চলে এলাম। তাদের বলে এলাম, মাঝে মাঝে ফোন করে আপনাদের বিরক্ত করবো! আর যে কোন প্রয়োজনে আমাদের জানাবেন! আরও বললাম, তাকে দেখতে আরও অনেকেই আসবেন। ততক্ষণে নিতাইদা ফোন করে আমাকে জানিয়েছেন যে, জুবায়ের ভাই ও আইরিন আপাসহ তিনি আসছেন। কিন্তু সেখানে অপেক্ষা করতে আমার ভাল লাগছিল না। অনেকদিন আগে টিভিতে দেখা- বাংলাদেশের স্বনামধন্য বার্ন স্পেশালিষ্ট ডাঃ সামন্তলাল সেনের একটা সাক্ষাৎকারের কথা বারবার মনে পড়ছিল, তিনি তার সেই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “বার্ন ২০% এর বেশি হলে সেই পেশেন্টকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যায়! আর সেটা যদি হয় আপার সাইডে তাহলে সেই হার আরও কমে যায়।” আপনার বার্নের হার শুনে আমি প্রমাদ গুনছিলাম। সেই সময়ে আর কাউকেই ফোন করতে ইচ্ছে করছিল না। কেমন যেন একটা ‘হারানোর’ অনুভূতি হচ্ছিল আমার!

তারিখ ২০ শে মে, ২০১৭। অফিসের কাজ শেষে থাইল্যান্ডের ফুলের দোকান নিয়ে একটা ফটো পোস্ট লিখছিলাম। ততদিনে আপনি ভাল হয়ে যাচ্ছেন এই বোধ আমাদের সবার মধ্যেই ফিরে আসছে। ১৮ তারিখে স্বরজিতদাকে ফোন করে জেনেছিলাম, আপনার স্কিন ড্রাফটিং হওয়ার কথা থাকলেও আপনার ব্লাড সুগার ও কিছু শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে সেটা হয়নি। সেটা শুনে আমি কিছুটা থমকে গেলাম। বারবার, স্বরজিতদাকে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। সেই সময়, অনেক আগে আমার মা’র বলা একটা কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তার কোন আত্মীয়ের আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া প্রসঙ্গে বলেছিলেন, আগুনে পোড়া মানুষ বাঁচে না। যদি সাথে সাথে মারা নাও যায়, কিন্তু যখন তাদের সেই পোড়া জায়গাগুলো শুখাতে থাকে সেই সময়ই তারা এর ‘টানে’ মারা যায়!

যখন শুনলাম, আপনার সাথে পুড়ে যাওয়া সোহেল নামের আপনার এক কলিগ ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন এবং অন্য আর একজনকে নতুন করে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে, যাদের পুড়ে যাওয়ার হার ছিল আপনার চেয়েও অনেক কম; ঠিক তখনই আমার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। আমি আতংকিত হয়ে সেই কথা আমার স্ত্রী’র সাথে শেয়ারও করেছিলাম। আবার তখনই- আপনি আরও ভাল যায়গায় চিকিৎসারত আছেন এবং আপনার ইনফেশন হয়নি ভেবে কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে নিলাম। ভেবেছিলাম, আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন!

তারিখ ২০ শে মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৪০ মিনিট। জুবায়ের ভাইয়ের ফোন। ফোন দেখেই ধরে নিলাম, বিডি ব্লগের ব্লগারদের আয়োজিত এদিনের কৃষ্ণচূড়ার আড্ডায় যায়নি বলে তিনি হয়ত আমাকে কিছু বলবেন! কিন্তু তার কাছ থেকে পেলাম আপনার মৃত্যু সংবাদ। কিছুক্ষণ থ হয়ে ডেস্কে বসে থাকলাম। তারপর সব ফেলে কলিগদের বললাম, আমার এক দাদা মারা গেছেন আমি চললাম। পাশের ডেস্কে বসা কলিগ স্বরূপ বলল, ’দাদা, কই যাবেন, চলেন আমি নামিয়ে দেই।’ সে তার মোটর সাইকেলে করে আমাকে লালমাটিয়ার আড়ং- এর কাছে নামিয়ে দিলো। তারপর রিক্সা নিয়ে চলে এলাম আপনাকে দেখতে! চিরবিদায় জানাতে।

দাদা, আপনার মৃত্যুতে শুধু আমরাই কাঁদছি না! কাঁদছে আপনার অগণিত বন্ধু-বান্ধব। আপনার জন্য খোলা হয়েছে একটা ফেসবুক পেজ ‘উৎপলের জন্য’, তাতে তাদের নানা অভিব্যক্তি প্রকাশ করছেন। আমি সেখান থেকে কপি করে আপনাকে জানাছি। যদিও আমি জানি আপনি চলে গেছেন এক অজানার দেশে!

আপনার প্রিয় বন্ধু মুসাব বিন খন্দকার বলেছেন-

উৎপল তার স্বভাবসূলভতার সাথে কিঞ্চিৎ উত্তেজনা যোগে গত পরশুদিন বোন গোপাকে অনেক কথাই দ্রুত বলতে চেয়েও পারেনি। তার শরীরের অবস্থাটা সে বুঝতে পেরেছিল হয়তোবা। সারাদিন ক্লিনিকে থাকত সরোজিৎ, উৎপলের মামাত ভাই। এর সাথে গোপা ও উর্মি থাকত বেশীরভাগ সময়েই। এই তিনজনই মূলত: ঢুকত ICU তে। যত কম মানুষ ঢুকবে ততই ভাল। গতকাল দুপুরের আগে আগে কাকতালীয় হোক বা ভগবানের লীলাখেলাই হোক, ঐ সময়টিতেই তিনজন অনুপস্থিত। উপস্থিত ছিল টিটু, উৎপলের একমাত্র ছোট ভাই, যাকে একটু সহজ সরল হবার কারণেই ভেতরে যাবার ব্যপারে চিন্তা করে নাই কেউই। উৎপল কথা বলতে চাইল, পেল ভাইকে। একটু অবাক হলেও ওকেই বলল –

– কিরে টিটু, আমি না থাকলে আমার বাচ্চা দুটো বউ আর বাকীদের কে দেখবে? তুই দেখে রাখতে পারবি না? দেখে রাখিস।

শারীরিক অবস্থার সাথে মনটাও হয়তোবা টেনেছিল তাকে। এরপরেই সর্বদা চঞ্চল উৎপল মনে হয় ধীর পায়ে যাত্রা শুরু করে স্থায়ী ঠিকানায়। মূলত তিনটার দিকেই সব আশা শেষ হয়ে যায়।

আমি যে উর্মিকে এড়িয়ে চলতে চাইছিলাম, সেই উর্মির সামনেই দূর্ঘটনাক্রমে শ্মশানের পুকুর ঘাটে পরে গেলাম। কি বলব? আমি মাথা নীচু করে আছি। উর্মিই জিজ্ঞেস করল –

– মুসাব ভাই, তুমি ভাল আছ?
এটি কেমন প্রশ্ন হল? তারচেয়েও বেশী অবাক হলাম যখন আমি উত্তরে বললাম –
– হ্যাঁ, ভাল আছি।
শ্মশানে রুপা ওর হাসবেন্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি থেকে পাশ করেছে। আলাপের খানিকক্ষণ পরেই হঠাৎই চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছে রুপা। ওর স্বামীও থামাতে পারছে না। হায়রে দুনিয়া! কে কাকে সান্তনা দেবে? জন্মদাত্রী মাসিমাই রুপাকে সান্তনা দিতে শুরু করেছেন! মাসিমা শব্দহীন মাঝে মাঝে হাল্কা পাতলা শরীরটা কাঁপিয়ে কাঁদার চেষ্টা করছেন, পারছেন না। বাকী জীবনটা তো কাঁদতেই হবে।

উৎপলকে শেষবার দেখে সবাই যখন বেরিয়ে আসলাম, দেখলাম উর্মি ফ্যালফ্যাল করে ভেতরে তাকিয়ে আছে আর ডান হাত দিয়ে বাম হাতের কব্জিতে ঘষছে। হাল্কা ক্ষত, শাখা ভাঙ্গতে গিয়ে হয়েছে, তাকিয়ে দেখলাম – অনভ্যস্ত হাতের কারণে হোক আর শেষবারের ইচ্ছার কারণেই হোক, বেশ মোটা করে যেন লেপ্টে দিয়েছিল আজ, সিঁদুর নেই।
এই মানুষগুলোর কেউই মূল কষ্টের ভেতরে এখনো প্রবেশ করেনি। সৃষ্টিকর্তা শক্তি দাও।
একটু বোকাসোকা মনে হওয়া টিটুকেই মনে হল আজ অনেক পরিণত। সৃষ্টিকর্তা ধাক্কা দিয়ে কোন বিপদে মানুষকে ফেলে, আবার কোন হাত দিয়ে টেনে বুকে নেবেন, কেউই বলতে পারে না। আশা করি আমরা সবাই –
– মানুষ আশার উপরেই পথ চলে, পথের উপরে নয়।

আপনার প্রিয় বন্ধু রুবায়েত হাসান তানভী বলেছেন-

নিজের কষ্ট তো কখনোই প্রকাশ করার মত মানুষ ছিলিনা। তুই কি ভেবেছিলি তিন সপ্তাহ ধরে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের এতো ছুটোছুটি, এতো কষ্ট? তাই হাসতে হাসতে, কাউকে কোনো সুযোগ না দিয়ে একদম নিঃশব্দে চলে গেলি? অরে পাগল! আমরা যে তোকে নিয়ে দীর্ঘ পথযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম! বন্ধুরা যে সব শপথ নিয়েছিল তোকে সেই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে যা যা করা প্রয়োজন তাই করবে! যে বন্ধু-সুহৃদদের কাছে তোর প্রাণভোমরাটি বাঁধা ছিল, তারাই আজ তোর জন্যে লড়তে মতভিন্নতা ভুলে গড়ে তুলেছিল এক সেনাবাহিনী।

তুই কি ভেবেছিলি তোর কাছে পরিবার, মানুষ, দেশ ও সমাজের সব চাওয়া পাওয়া শেষ হয়ে গেছে? মনে নেই সেই ১৯৯০ সাল থেকে “লিখিস না কেন?” “লিখিসনা কেন?” বলে জ্বালাতাম? কখনো তো গায়েই মাখতি না। কিন্তু তোর ভিতরের দুর্দমনীয় প্রতিভা, ব্যাক্তি ও সমাজের প্রতি দরদ ও দায়িত্ববোধ লুকাতে পেরেছিলি? কোননা কোনভাবে প্রকাশ পেয়েই যেত তোর আঁকা ব্যানার ও পোস্টারে, তোর স্যাটায়ারে, এমনকি তোর সেন্স অফ হিউমারেও। আর তোর মতো এমন করে জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের উর্ধে উঠতে পেরেছে ক’জন বলতো দেখি? সেই ছোটবেলা থেকেই তো তুই এমন ছিলি …তোর বন্ধুরাই তো এসবের সবচেয়ে বড়ো প্রমান।

…এই তো সবে ৩/৪ বছর মাত্র হলো ফেসবুকে আর ব্লগ এ লেখা শুরু করলি। যখন যেটাতেই হাত দিস সেটাই বাজিমাত! রম্যরচনা, স্যাটায়ার, প্রতিবাদ কিংবা গবেষণাধর্মী লেখা …. কত কৌতূহল, কত আইডিয়া তোর মাথায়? এমন সব বিষয় নিয়ে লিখলি যা আমাদের মতো সাধারণের কল্পনাতেও আসে না। এখন তো অতৃপ্তির সাগরে ভাসিয়ে গেলি হাজারো পাঠক কে। তোকে নিয়ে যে একদিন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পুরস্কারের স্বপ্ন দেখতাম!

আর দেখ, এসব কথা বলতে বলতে তোর সদাচঞ্চল, মায়াভরা পরিবারের কথা বলতেই ভুলে গেলাম? তোর ঘরের ফুটফুটে পরী মা দুটো? আগে তো বাইরে বাইরেই বেশি সময় কাটাতি। কিন্তু গত ক’বছরে বাবার সাথে বন্ধুত্বটা কেমন বেড়ে গিয়েছিলো বলতো? মেয়ে দুটো এখন সারা বাড়ি খুঁজে বেড়াবে তোকে … মাকে জিজ্ঞেস করেও কি তার উত্তর মিলবে? ও তো পাথর হয়ে গেছে। …আর তোর ভাই বোনগুলো? তুই তো ওদের মাথার উপর ছাতার মতোই ছিলি তাই না? আর মাসির কথা কি বলবো …মনে আছে সেই ছাত্রজীবনে অভাবের সংসারে হুটহাট করে ৭/৮ বন্ধু নিয়ে হাজির হতি রাত বিরেতে …এতো কষ্টের মাঝেও হাসি মুখ …মধ্য রাতের গরম খিচুড়ি! সেই মাকে আবারো পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো কষ্টটাই দিয়ে গেলি? কি করে বইবেন তিনি বাকি জীবনের বোঝা?

এ জীবনে অনেক ভালোবাসা দিয়েছিস, অনেক হাসিয়েছিস অনেক রাগিয়েছিসও বটে। কিন্তু এতো রাগ, এতো অভিমান, এতো কান্না আগে আর কখনো দিসনি বন্ধু। তবুও বলি তুই যেখানেই থাক শান্তিতে ঘুমিয়ে থাক। এই পৃথিবীতে রেখে যাওয়া তোর কর্মের গুনেই, তোর মায়ায় জড়ানো এই পৃথিবী দেখে রাখবে তোর রেখে যাওয়া পরিবারকে।

আপনার এক বোন, অনুসুয়া বড়ুয়া বলেছেন-

কালকে সকাল বেলায় ওভেনে খাবার গরম করতে গিয়ে যখন দেখলাম আমার নূতন প্লেটটা ৩ টুকরা হয়ে গেছে তখন মনের মধ্যে একটা অমঙ্গলের আভাষ পেয়েছিলাম । বিকেল প্রায় ৫ টার দিকে গ্রুপ মেসেজে চোখ পরতেই চমকে উঠলাম উৎপল লাইফ সাপোর্ট এ। ৫/১০ মিনিট পর জানলাম ও নেই । বিশ্বাস করতেই পারছিলাম না । সারা শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠল । উৎপল তোমার সাথে পরিচয় বছরখানেক । কেউ আমরা কাউকে চাক্ষুষ দেখিনি । কিন্তু অন্য অনেক বন্ধুর চাইতে তুমি আমাকে অনেক আপন করে নিয়েছিলে । তোমার টিপ্পনি ,বকুনি, বিদ্রুপ , হাস্যকর কথা মেসেজে শেয়ার করতে । তোমার অসাধারণ লেখা ,তথ্য বহুল লেখা , গবেষণা ধর্মী লেখা, সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়ে লেখা আর পড়তে পারব না এটা ভেবে মনটা ভেঙ্গে যাচ্ছে। কি এক অধিকার বোধ নিয়ে তুমি মানুষকে কত সহজে আপন করে নিতে যেমন নিয়েছিলে আমাকে । তোমার তো এমন মৃত্যু কাঙ্কখিত ছিল না । তুমি তো বাচতে চেয়েছিলে। ২০ দিন ধরে কি অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করেছ । সব যন্ত্রণার অবসান ঘটীয়ে তুমি এখন শান্তির রথে চড়েছ। আমরা তোমার বন্ধুরা আজকে কত অসহায় হয়ে তোমার শেষ যাত্রার ছবি দেখছি আর চোখের জল মুছছি সেটা দেখে তুমি নিশ্চয়ই তোমার চিরচেনা মুচকি হাসি হাসছ । যেখানেই যাও ভাল থেকো । মাঝে মাঝে রাতের আকাশে তারাদের ভীড়ে ঠিক তোমাকে খুঁজে নেব দেখ তুমি ।

আপনার আরও এক বোন, প্রতিমা সরকার বলেছেন-

আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না উৎপল নেই। কেবলই ওর মেয়ে দুটোর কথা মনে হচ্ছে। এত অল্প বয়সে ওরা এই পৃথিবীর নিষ্ঠুর বাস্তবতা দেখে ফেললো। ভগবান তোমাদের শোক কাটিয়ে উঠার শক্তি দিক, এই প্রার্থনা করি।

আপনার আরও এক বন্ধু, ইঞ্জিনিয়ার মোঃ হারুনর রশিদ বলেছেন-

রুপকথা ও চন্দ্রকথা,
পিতৃহারা এই দুই কন্যার জন্য আমাদের কিছু করতেই হবে। আমরা কি করতে পারি তা নিয়ে যখন ভাবছিলাম, তখনই আশার আলো দেখাল মাসুম কামাল। ও লিখেছে আই ই বিতে আবেদন করলে লেখাপড়ার খরচ বাবদ একটা মাসহারা পাওয়া যাবে। এ ব্যাপারে আই ই বির সাথে সম্পৃক্ত ডলি ও জিল্লুর কে একযোগ এ কাজ করার অনুরোধ জানাচ্ছি। এছাড়া ও আমরা যার যার অবস্থান থেকে চেষ্টা করে যাব। বউদির জন্য কিছু করা যায় কিনা সেটাও আমরা ভেবে দেখতে পারি।

আপনার শেষ বিদায়ের ছবি-
utpol-2

.

ভগবান অবশ্যই আপনাকে ভাল রাখবেন। আপনার প্রিয় পরিবার ও আপনার প্রানপ্রিয় কন্যাদুটোর জন্য আমাদের বুকভরা সমবেদনা ও ভালবাসা রইলো! এবং বিদায়বেলায় এই ছোটভাইয়ের কাছ থেকে পুত্রাঞ্জলী গ্রহণ করুন যেখানেই থাকবেন ভাল থাকবেন দাদা!

utpol-4
২২/০৫/২০১৭