ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

এক
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা-মা সহ আমাদের পরিবারের বহু সদস্য তাদের জীবন বাঁচাতে ভারতের ধুবড়ীসহ অন্যান্য অঞ্চলে রিফিউজি হিসেবে আশ্রয় পেয়েছিলেন। সেই সময়ে যদি তারা সেদেশে আশ্রয় না পেতেন, তাহলে হয়ত আমার বাবা-মা সহ আমাদের পরিবারের অনেকেই বেঁচে থাকতেন না। পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় রাজাকারদের হাতে- তারা আমাদের পরিবারের আরও অনেকের মত খুন হয়ে যেতেন। এমনকি সেক্ষেত্রে ‘আমার জন্মও হতো না’- এটাও নির্দিধায় ধরে নেওয়া যায়! অর্থাৎ আমি ও আমার পরিবার, ভারতের দেওয়া ‘রিফিউজী সুবিধার’ সুবিধাভোগী; যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা ভুক্তোভোগী! সেই কথায় পরে আসবো বা অন্যপোস্টে লিখবো।

আজ যখন মিয়ানমার থেকে দলে দলে নারী-শিশু সহ হাজার হাজার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ আসছে, তখন তাদের নিদারুণ কষ্ট ও করুণ মুখগুলো দেখে আমার সেই সময়ে আমার বাবা-মায়ের করুণ মুখের কথাই মনে পড়ছে! আজও সেই সময়ের কথা উঠলেই- আমার বাবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, “কীভাবে যে আমরা বেঁচে গেলাম এখনো সেটা বিশ্বাস হয় না। এখনো মনে হয় এই বুঝি যমুনা নদীতে টহলরত পাকিস্থানী সেনারা গানবোট থেকে আমাদের নৌকার দিকে গুলি ছুড়ে আমাদেরকে মেরে ফেললো! এই বুঝি ডাকাতের নৌকা এসে আমাদের যা কিছু অবশিস্ট আছে সেটাও নিয়ে গেলো। এই বুঝি রাজাকারদের হাতে ধরা পরে গেলাম! আতংক! চারদিকে আতংক! নৌকার পাটাতনে শুয়ে, খড়-ঘাস দিয়ে নিজেদের ঢেকেও সেই আতংক কমে না! কাকে বিশ্বাস করবো, আর কাকে বিশ্বাস করবো না, সেটাও একটা বড় বিষয় হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছিল সেই সময়টায়। সবশেষে, নাম না জানা এক নৌকার মাঝির অসীম সাহস আর বুদ্ধিমত্তায়, আমরা ভারতে পৌঁছাতে পারলাম”।

তিনি আরও বলেন, “এছাড়াও রিফুজী ক্যাম্পে যে কিভাবে আমরা কলেরা থেকেও বাঁচলাম, সেটাও এখনো অবিশ্বাস্য”।

এক্ষেত্রে আমার মা বলেন, “মাইনকার চরের রিফিউজি ক্যাম্পে’ পৌঁছে দেখি কলেরায় সমানে মানুষ মরেছে, আর নদীর ধারে লাইন ধরে রাত-দিন একের পর এক চিতায় সেই মরা মানুষ সৎকার করা হচ্ছে। এটা দেখে আমি তোর বাবার কাছে বায়না ধরলাম, যে করেই হোক তুমি আমাদের এই ক্যাম্প থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে চল। আমি আর একদিনও এখানে থাকবো না। আমার ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি কলেরা এসে আমাদের বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে। আমার কথায় তোর বাবা কয়দিন পর ধুবড়ীতে একটা বাসা ভাড়া করে আমাদের সেখানে নিয়ে রাখলেন, আর আমরাও বেঁচে গেলাম”!

দুই

কর্মসূত্রে মায়ানমারের সাথে আমার যোগাযোগ সেই ২০০৮ সাল থেকে। যেহেতু আমি বেসরকারি চাকুরীতে ‘এক্সপোর্ট ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্টের’ কাজের সাথে জড়িত সেহেতু আমি অনেক দেশ নিয়ে টুকটাক কাজ করি। অনেক মানুষের সাথে মিশি। ঘাট-অঘাটের অনেক তথ্য সম্পর্কে আছে জানাশোনাও। না চাইতেও সমাজের উঁচুস্তর থেকে শুরু করে একেবারে নিচু স্তরের অনেক তথ্যও আমি পাই। যার অনেক কিছুই লিখি না।

আমি ব্লগে লেখাই শুরু করেছিলাম ’ইয়াঙ্গুনে কয়েকদিন’ শিরোনামের একটা ভ্রমণ সিরিজ দিয়ে। সেটা লিখতে যেয়ে অনেক কিছু ঘেটে আমি বার্মার আদি ইতিহাস ও তাদের সাথে রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে যখন পড়তে থাকলাম, তখন এমন কিছু তথ্য পেলাম যা লিখলে বিতর্ক তৈরী হতে পারে ভেবে সেই লেখাটা নিয়ে আর এগোইনি। এমনকি এর অনেকটা লিখলেও তা ব্লগে প্রকাশ করিনি। পরে ল্যাপটপ হারানোর ফলে সেই লেখাগুলোও আর আমার কাছে নাই।

এখন যেহেতু আমার জানা অনেক তথ্যই বিভিন্ন মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি, সেহেতু আমার জানা কিছু কিছু তথ্য এই পোস্টে শেয়ার করছি। তবে মূল লেখা লেখার আগে একটা উদাহরণ দিয়ে নেই, যাতে করে বুঝতে সুবিধা হয়-

ধরুন- একজন পুরুষ ‘পাড়ার পর নারী গমন’ করে গণেরিয়া বাঁধিয়েছে, কিন্তু ধরা পড়ার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যেয়ে বললেন, আমার পেটে ব্যাথা! অসুখটা কী ধরা পড়বে? আমার ধারণা, এই রুগী পরদিনই বলবে, এই ডাক্তার ভাল না। রোগ ধরতে পারেন না। আসলে যে সে নিজে সত্য গোপন করেছে, সেটা কিন্তু সে কাউকে বলবে না। ফলাফল- সেও ভুগবে সাথে পরিবারের ভিতরেও গণেরিয়া ছড়াবে।

এই লেখা লিখতে লিখতে আমি মায়ানমারের থাকা আমার তিনজন বন্ধু, কলিগ ও পূর্বোক্ত কর্মসূত্রে ব্যবসায়িক পার্টনারের সাথে কথা বললাম। এরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং অনেকদিন ধরেই তারা সেই দেশে আছেন। এদের মধ্যে যেমন আছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, তেমনি আছেন ইসলাম ধর্মেরও। আরও একজনের সাথে কথা বলেছি, যিনি বাংলাদেশ ও বার্মা সম্পর্কে ভাল জানেন এবং তিনি কক্সবাজারের রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ। এছাড়াও আমার আরও দুইজন খুব নির্ভরযোগ্য মানুষ আছেন, যার একজন মিয়ানমারের ‘রাখাইন’ ও চট্টগ্রামে বাসবাস করা একজন ‘রোহিঙ্গা বংশদ্ভূত’। এদের প্রথমজন আমার বৈদেশিক ক্রেতা, পরেরজন আমাদের টেকনাফ ল্যান্ডপোর্টের সিএন্ডএফ এজেন্ট। চাকুরী চেঞ্জ করার কারণে ফোন নম্বর হারিয়ে ফেলায় এদেরকে পাচ্ছি না। তবে এই সমস্যা নিয়ে তাদের সাথে আমি অনেক কথা বলেছি এবং সেগুলোর সাথে নিজের জানা তথ্য যাচাই বাছাই করে নিচে এক এক করে বলবো যা অম্লমধুর হতে বাধ্য। কিন্তু ওই যে উদাহরণে বললাম, অসুখের চিকিৎসা চাইলে ডাক্তারকে সব খুলে বলতে হবে। নইলে রোগিও ভাল হবে না এবং সেটাকে ছড়ানো থেকেও ঠেকানো যাবে না।

Coxbazar-Rohingya-Residence

.

সমস্যা ঐতিহাসিকঃ
প্রথমদিকে রোহিঙ্গা সমস্যা একটা জাতিগত সমস্যা ছিল। পরবর্তীতে এটাকে ধর্মীয় সমস্যা বলে চিহ্নিত করে একশ্রেণীর মানুষ ফায়দা লুটেছে। এই ফায়দা লোটার দলে যেমন রোহিঙ্গারা আছে, তেমনি আছে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ আরব দেশগুলোর অনেক মানুষ। প্রথমদিকে এই ধর্মীয় জিগিরে রোহিঙ্গাদের কিছু আর্থিক লাভ হলেও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তা বুমেরাং হয়ে গেছে। এটা রোহিঙ্গারা হয়ত বুঝে ফেলেছে, আর তাই তো আরাকান অঞ্চলে বসবাস করা রাখাইন হিন্দুদের উপরও আক্রমণ হয়েছে। এই আক্রমণ আসলে কে করেছে? পত্রিকায় পড়া তথ্য, অনলাইনের ভিডিও থেকে কী আসলেই আমরা সঠিক তথ্য পাচ্ছি?

বিশ্বাসের অভাবঃ
মিয়ানমারের অপরাপর জাতিগোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গাদেরকে বিশ্বাস করে না। এর মূলে অনেক কিছু থাকলেও একদম হাতেনাতে প্রমাণ হিসেবে আছে- ভারত-পাকিস্থান স্বাধীনতা লাভ করার সময় রোহিঙ্গারা কায়দে আজম জিন্নাহ সাহেবের কাছে যেয়ে রাখাইন তথা আরাকান রাজ্যকে পাকিস্তানে যোগ করার ইচ্ছে পোষণ করেন। জিন্নাহ সাহেব তাদের সেই গোপন প্রস্তাব গ্রহণ না করে, উল্টো সেটা তৎকালীন বার্মা সরকারকে জানিয়ে দেন। ফলে তারা তখন থেকেই সেদেশে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। যার কারণে তারা কোনদিনই মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে তালিকাভূক্ত হতে পারেনি। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে ক্ষতি করেন কায়দে আজম জিন্নাহ।

মায়ানমারের নাগরিক আইনঃ
এদেশের নাগরিক আইন খুবই কড়া ও ভিন্নধর্মী। যেমন সেদেশে জন্ম হলেই কোন মানুষ এদেশের নাগরিক হতে পারেন না, যদি তার বাবা-মা উভয়েই জন্মসূত্রে সেদেশের নাগরিক না হন। এমনকি এদেশের কোন নাগরিক যদি অন্য দেশের নাগরিককে বিয়ে করেন তাহলেও নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও সেও অনেক সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। একই কারণে মিজ অং সাং সু কি বিদেশি নাগরিক বিয়ে করায় তার দুই সন্তান মায়ানমারের নাগরিক হতে পারেননি। এমনকি দলের প্রধান হয়েও মিজ সু কি সেদেশের সরকার প্রধানও হতে পারেননি। যেহেতু রোহিঙ্গাদের পূর্ব পুরুষদের কেউই সেদেশের নাগরিক ছিলেন না, সেহেতু পরে জন্ম নেওয়া কোন প্রজন্মই সেদেশের নাগরিকত্ব পায়নি।

এই আইন জেনে যাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে, কেন জন্ম নিলেও নাগরিকত্ব পাবে না? তাদের জন্য খুব ছোট প্রশ্নের আকারে উত্তর হলো, কোন ভিনদেশীর সন্তান যদি সৌদি আরবে জন্ম নেয়, তাহলে কি সে সেদেশের নাগরিকত্ব পায়? আমার জানা মতে পায় না।

একেক দেশের আইন একেকরকম। হোক সেটা ভাল বা মন্দ এবং সেটাকে মেনে নিতে হবে; যতক্ষণ না সেই দেশ উপযাজক হয়ে তাদের আইন পরিবর্তন করছে। হালের কফি আনান রিপোর্টেও এই আইন পরিবর্তন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

জন্মহার ও বহু বিবাহঃ
রাখাইন বৌদ্ধদের জন্মহার খুবই কম। তাদের ছেলে সন্তাদের অনেকেই সন্যাস নিয়ে ভিক্ষু হয়ে যায়। অপরদিকে রোহিঙ্গারা কোন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ধার ধারে না। ফলে প্রতি বছর একটা করে সন্তান জন্ম নিচ্ছে প্রতিটা রোহিঙ্গা বিবাহিত নারীর গর্ভে। এছাড়াও পুরুষেরাও একাধিক বিয়ে করছে। ২০১০ সালের দিকে আমি যখন ইয়াংগুনে ছিলাম, তখন একটা খবর শুনেছিলাম-

মিয়ানমার সরকার ও রোহিঙ্গাদের নেতাদের মধ্যে একটা মিটিং হবে। মিটিংটা অনেক কাঠখড় ও আন্তর্জাতিক চাপে এরেঞ্জ করা হয়েছে। সেই মিটিং বসবে এমন সময় খবর চাউড় হলো যে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে যিনি এই বৈঠকের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার চারটা বউ ও চল্লিশের বেশি সন্তান আছে। এই খবরের সত্যতা পাওয়া মাত্র সেই মিটিং বাতিল হয়ে গিয়েছিল। পরে আর হয়নি।

রাখাইনদের সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভীতিঃ

এমনও খবর আছে, দেখা গেছে ৩০ বছর আগে একটা গ্রামে একটা রোহিঙ্গা আর দশটা রাখাইন পরিবার ছিল। এখন সেই গ্রামে রাখাইনরা ভয়াবহ রকমের সংখ্যালঘু। ফলে রাখাইনরা নিজ দেশ থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় পাচ্ছে, আতংকিত হয়ে পড়েছে তারা। যদিও শোনা যায় রোহিঙ্গাদের বিয়ের ব্যাপারে কড়াকড়ি আছে, কিন্তু যখন রিফিউজিদের দলে অনেক শিশু-কিশোর দেখছি, তখন তা আর সত্য বলে মনে হচ্ছে না।

যদিও অনেক আগে আমি একটা খবরে পড়েছিলাম, রোহিঙ্গারা গোপনে বিয়ে করে তাদের যে সন্তান হয়, তাদের বাবা-মা নামের জায়গায় জন্মদাতার বাবা-মা’র নাম লিখে দেওয়া হয়। অর্থাৎ দাদা-দাদীর নাম লিখে দেওয়া হয়, যাতে করে বিয়ে করা ও সন্তান হওয়ার বিষয়টা গোপন রাখা যায়। (এই তথ্যটার আমি কোন লিখিত প্রমাণ দিতে পারবো না।)

ধর্মপ্রচার ও ধর্মান্তরের চেষ্টাঃ
সুযোগ পেলেই রোহিঙ্গা ছেলেরা রাখাইন মেয়েদের প্রেমের প্রস্তাব দেয়। উদ্দেশ্য একটাই বিয়ে করে ধর্মান্তর করা। এছাড়াও তাবলীগের নামে দলে দলে বাড়ীতে-রাস্তায় বৌদ্ধদের ধর্মান্তরের প্রস্তাব দেওয়া তো ছিলই! এই দলে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানুষও ছিলেন। এটা অনেকের কাছে ন্যায্য বলে মনে হলেও অন্য ধর্মালম্বী কাছে তা ভাল না লাগারই কথা। ফলে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়াও আছে রাখাইন মেয়েদের রাস্তায় ডিস্টার্ব ও ধর্ষণের ঘটনাও। এদেশে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি কর্মজীবী। তাই সব জায়গায় তাদের বিচরণ অবাধ।

অসততাঃ
আমার জানামতে মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষ অনেক সৎ ও নির্বিবাদী। এরা মিথ্যা কথা প্রায় বলেই না। চুরি জোচ্চুরি এদের মধ্যে নেই। এছাড়াও মুখের কথার বড়খেলাপ করে না। একটা উদাহরণ দেই-

আমি ইয়াঙ্গুনে যেয়ে একটা কাস্টমারকে বলেছিলাম, আপনি অর্ডার দিলে ৪৫ দিনের মধ্যে আমরা তা সরবরাহ করবো। আমাদের এই দেশের ইম্পোরটার সেটাকে ৬০ দিনের ‘লাস্ট ডেট অব ডেলিভারি’ বলে অর্ডার নিয়েছিল। কিন্তু প্যাকেজিং আর প্রোডাক্ট তৈরী করতে করতে আমাদের সেই পন্য ইয়াঙ্গুন পোর্টে পৌঁছেছিল ৮২ দিনে। ফলে সেই পার্টি সেই পন্য নেয়নি কারণ কথার বরখেলাপ। এ সম্পর্কে আরও অনেক কিছু আছে আমার ভ্রমণ কাহিনীতে পড়ে দেখতে পারেন।

আমি দেখেছি ছোট ছোট মেয়েদের লক্ষ লক্ষ টাকা মুল্যের ডায়ামন্ড ও সোনার গহনা হোলসেল মার্কেটে যেয়ে বিক্রি করে সন্ধ্যায় সেই টাকা ঠিকঠাক মত জমা দিতে। একটা ছোট ডায়ামন্ডের টুকরাও হারিয়ে গেছে বা চুরি গেছে এমন শুনিনি। মুসলিম মালিকানাধীন সেই প্রতিষ্ঠানে যাদের কাজ করতে দেখেছি তাদের মধ্যে বর্মী থেকে শুরু করে ভারত ও পাকিস্তানী বংশভুত মুসলিম মেয়েরাও ছিল। এই মেয়েরা এত টাকা ব্যাগে করে ওপেনে ঘুরছে দেখে আমি রীতিমত অবাক হয়ে জিগাসা করেছিলাম, ‘পরাগ ভাই (ছব্দনাম), এরা এভাবে টাকা ক্যারি করে?” উত্তরে তিনি মুচকি হাসি দিয়ে বলেছিলাম, এরা আমার চেয়েও সৎ। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। অল্প কথায় বললাম।

এটা কী মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মীয় ঝগড়া?
সঠিক পরিসংখ্যান আমার কাছে না থাকলেও এটা নির্দিধায় বলা যায় সাবেক রাজধানি ইয়াঙ্গুনের বর্তমান মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ২০% মুসলিম। এছাড়াও এদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী ও ধনীদের একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম। এই মুসলিম পপুলেশনের মধ্যে যেমন ভারত, পাকিস্তানের অভিবাসীরা আছেন, তেমন আছেন আরও অনেক উপজাতি- যারা মুসলিম ধর্ম পালন করেন। যেহেতু এরা বৈধ নাগরিক, তাই এদের নিয়ে কোন সমস্যা নেই। এমনকি এত এত গ্যাঞ্জামের মধ্যেও ইয়াংগুনে একটা ছোট ঘটনাও ঘটেছে বলে আমি অন্তত শুনিনি। আজ আমি যাদের সাথে কথা বললাম, তাদের প্রায় সবাই এই মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকুরি করেন এবং একযুগেরও বেশি সময় ধরে সেখানে আছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশি মালিকেরাও আছেন। তাই ঝগড়ার বিষয়ে আমি বলবো, রাখাইনের এই ঝগড়া এখন ধর্মীয় রূপ নিলেও আগে সেটা ছিল জাতীয়তার সমস্যা।

বাঙালি লিংকঃ
ঐতিহাসিকভাবেই রোহিঙ্গাদের সাথে বাঙালিদের একটা লিংক আছে। এটাকে অস্বীকার করা হবে ভুল।

উগ্রতাঃ
ঐতিহ্যগত ভাবেই বর্মী জনগোষ্ঠী খুবই উগ্র। এরা পাশে পেয়েছে রোহিঙ্গাদের। এরাও উগ্রতায় কম যান না। ফলে লাঠালাঠি থেকে খুন-খারাবি শুরু হয়ে গেছে। এখানে ধর্ম কোন বিষয় না। জাতিগতভাবে দুই দলই উগ্র তাই এদের মিল হওয়া প্রায় অস্বম্ভব। তবে দুই দলই ধর্মকে ব্যবহার করছে, যখন যার যেমন দরকার পরছে সেই ভিত্তিতে।

তিন

অনেকেই বলছেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেন চীন-রাশিয়া ভেটো দিলো? তাদের জন্য আমার উত্তর হলো- কেন দিবে না, ভেটো না দিয়ে ভোট দিলে চীন-রাশিয়ার লাভ কী হতো?

অনেকের জানার জন্য বলি গত ৪৫-৫০ বছর ধরে বার্মা তথা মিয়ানমার সামরিক শাসনে একটা বিচ্ছিন্ন দেশের মত করে চলেছে। একমাত্র চীন ছাড়া কেউই তাদের গোনার মধ্যেই ধরেনি। ফলে এদেশের সবকিছুতেই চীনের আধিপত্য। এছাড়াও এদেশে চীনের আছে বড় বড় বিনিয়োগও। ফলে চীন তার নিজ স্বার্থেই এদেশের পাশে থাকবে। আর চীন বাংলাদেশের পক্ষেইবা কবে ছিল? অপরদিকে রাশিয়া! হ্যাঁ! রাশিয়া বাংলাদেশকে একটা শিক্ষা দিতে চাচ্ছে। রাশিয়াকে বাংলাদেশ পাশে পাবে না কারণ এদেশ তাদের সাথে দুইবার ‘দুর্ব্যবহার’ করেছে।

প্রথমবার- ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা আজকের রাশিয়া সর্বোচ্চ ব্যাকআপ দেওয়ার পরেও ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে এদেশ তাদের চিরশত্রু আমেরিকার প্রিয়ভাজন হতে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়বার- রাশিয়া ‘বর্তমান সরকারকে’ পুড়ো ব্যাকআপ দেওয়ার পরও এই সরকার মধ্যপ্রাচ্যের রাশিয়া বিরোধী সৌদি নেতৃত্বাধীন একটা সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করেছে। ফলে এতেও রাশিয়া ব্যাপক মাইন্ড করে আছে। এছাড়াও অনেকেই বলছেন, কেন বাংলাদেশ এবিষয়ে অন্য বন্ধুদের পাশে পাচ্ছে না? তাদের জন্য ভাল উত্তর হলো-

১) ইউরোপিয় ইউনিয়ন এক লাখেরও বেশি অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর তোড়জোড় করছে। ইতিমধ্যেই সেই আলোচনা চলছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশ বানিজ্য নিষেধাজ্ঞার হুমকির মুখেও আছে।

২) ভারত ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়াও ভারত আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া বাংলাদেশীদের নিয়ে চাপে আছে। যেকোন সময় এই ইস্যুও সামনে চলে আসতে পারে।

৩) মালয়েশিয়া নিজেই বৈধ, অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিক ও সেদেশে যেয়ে সুযোগ বুঝে বিয়ে করে নাগরিক হওয়াদের নিয়ে বিপদে আছে। আছে সামজিক চাপেও।

৩) প্রতিদিন ভূমধ্যপ্রসাগর দিয়ে যে রিফিউজি ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছে, এদের মধ্যে একটা বড় অংশ হলো বাংলাদেশীরা। এরা পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে এবং অল্প কিছু আরবী বলে বা ভাষা না বোঝার ভান করে নিজেদেরকে সিরিয়ান বা অন্যকোন দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচিতি দিতে চাচ্ছে যা ইউরোপীয় দেশগুলো ভালভাবে নিচ্ছে না। এদের মূল রুট হলো, তুরস্ক, লিবিয়া। এছাড়াও আছে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়া! এর বাইরে, আমেরিকাইউরোপ এখন তাদের অভিবাসীদের নিয়ে নিজেরাই শঙ্কিত।

এরই সুযোগে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ পরিচয়ে নতুন করে ব্রান্ডিং করছে। ধরে রাখুন এটাকে তারা বিশ্বের কাছে খাওয়াতেও পারবে। এমনকি পাকিস্তান গোপনে এটাতে সমর্থনও দিবে। ’বাংলাদেশের ক্ষতি মানেই পাকিস্তানের লাভ’- বুঝতে হবে ভাইয়া! চীনও থাকবে মিয়ানমারের পাশেই। সৌদিআরবসহ মিডলইস্টের কোনদেশই বাংলাদেশের পাশে থাকবে না। হ্যাঁ, এরা কিছু এনজিও ও গ্রুপকে টাকা দিয়ে আরও গ্যাঞ্জাম লাগাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বাকী থাকছে আমেরিকা। আরে ভাই গ্যাঞ্জাম ভাল করে না লাগলে তেনারা আমাদের সেন্টমার্টিনে ঘাঁটি গাড়বে কিভাবে? অতএব তাদের চাই আরও গ্যাঞ্জাম, চাই তো চটজলদি আইএসও এসে পড়বে।

তাই আমার হিসেব বলছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ কাউকে পাশে পাবে না! পুড়োটাই নিজেকে গিলতে হবে। যেই মুহূর্তে আরও রিফিউজি এসে পড়বে, ঠিক সেই মুহূর্তেই তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া মুখ ফেরাবে। মালয়েশিয়া গতবারের মত এগিয়ে আসছে না, এই ভেবে যে যদি তাদেরকেও কিছু রিফিউজি নিতে হয়! থাইল্যান্ড নিজেও এই রোহিঙ্গা ও জঙ্গি ইস্যুতে জেরবার। ফিলিপাইনও ভাল নেই; তাদের একটা প্রদেশে আইএসের সাথে যুদ্ধ চলছে। এরা সবাই যাবে মিয়ানমারের পক্ষে।

তাহলে বাংলাদেশের পক্ষে কে? রোহিঙ্গারা? আমার তো মনে হয় এখনই যদি রিফিউজিদের বায়োমেট্রিক আর জন্মনিয়ন্ত্রণ না করা যায়, তাহলে আগামি ২০ বছর পর চিটাগাং-এর মানুষেরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। আজকের হাসি হবে আগামির কান্না!

শুভরাত্রি!

০৬/০৯/২০১৭