ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 
23_Rice+Market_150917_0003

 

“দাম কম হলেও আতপ চাল খাবো না”- এটা আমার কথা না, ওএমএসে সরকার সিদ্ধ চালের পরিবর্তে আতপ চাল বিক্রি শুরু করায় কেউ কেউ বলছেন এসব! তারা আরও বলছেন, “আমরা আতপ চাল খাই না; খাই সিদ্ধ চাল! আর এটা খেলে কষা হয়!”- এগুলো হলো বাঙালির নতুন ‘নক্তা’! অথচ আমার জানামতে- এই আতপ চালের ভাত সারাবছর ধরেই খায় আমাদের দেশেরই চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের মানুষেরা। কষা হলে তাদেরও তো হওয়ার কথা? এছাড়াও এই চালের ভাত খায় থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে দক্ষিণ ভারতের মানুষেরাও। তাদের কারো এই চাল খেয়ে ‘কষা’ হয়েছে এটা এখনো আমার জানা হয়ে ওঠেনি। আমিও এই চালের ভাত এইসব জায়গাতেই বহুত খেয়েছি- মাগার আমিও কিছুই মালুম করতে পারি নাই! এছাড়াও পোলাও-বিরিয়ানী খেয়ে আজ পর্যন্ত বঙ্গসন্তানদের একজনেরও কষা হয়েছে বলেও শুনিনি! এদের ‘চাল’গুলোও কিন্তু আতপই ভাইয়েরা?

শ্যামলীতে একজন ক্রেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকার কেন যে আতপ চাল দিতে গেল, তা বোধগম্য নয়। ঢাকায় কোথাও আতপ চাল সিদ্ধ করে ভাত খেতে শুনিনি। “আগে সিদ্ধ চাল যেখানে ১৫ টাকা দিয়েছে সেখানে হঠাৎ করে দেওয়া হলে আতপ চাল, দামও করা হল দ্বিগুণ। এনিয়ে ক্রেতাদের আসলে তেমন উপকার হবে না। বেচা-বিক্রিই তার প্রমাণ।”

তাই যারা কষা হওয়ার ভয়ে এই চাল খেতে ভয় পাচ্ছেন? তাদেরকে বলি- ভায়েরা, এই ভাতে কাঁচা পেঁপে সিদ্ধ দিয়ে খান, আর খান পাকা কলা! কষা কেটে যাবে! মাইরি কইতেছি। এতে করে টাকাও বাঁচবে, আবার দেশে চালের বাজারে স্থিরতাও আসবে! আর জানেন তো- অভাবের দেশে ফুটকালাইও সন্দেশের মতই লাগে? নিখিল চাল বিক্রেতাদের কারো কাছেই অল্প বা আমাদের টার্গেট দামে আর সিদ্ধ চাল পাওয়া যাচ্ছে না; যা কিছু কমদামে মানে আমাদের কেনার ক্ষমতার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো হচ্ছে এই ‘আতপ চাল’! এখনই আরও আতপ চাল কিনে ফেলতে না পারলে আগামীকাল কিন্তু ভাতের ফ্যানও পাওয়া যাবে না, ভাইয়েরা? তখন কিন্তু “কামলার ডালে আবার সম্ভার” প্রবাদটাই আমাদের উপর জারি হবে? দিনকাল কিন্তু ভাল না!

বাজারে চালের দাম প্রতি কেজি সর্বনিম্ন ৫৫ টাকায় পৌঁছায় শহরগুলোর সীমিত আয়ের মানুষদের জন্য খোলাবাজারে চাল বিক্রির এই উদ্যোগ সরকারের। সোমবার দুপুরে আগারগাঁও বিএনপি বস্তি এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওএমএসের ট্রাকে অলস সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতা। বস্তির বাসিন্দা, রিকশা চালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ ট্রাকের কাছে এসে চাল দেখে আবার চলে যাচ্ছেন। ‘ট্রাক সেলের’ কর্মী সাদ্দাম সাজী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার গুদাম থেকে আতপ চাল দেওয়ায় লোকজন কিনতে চাচ্ছে না। তারা বলছে, এই চাল ভাত খাওয়ার জন্য নয়, পিঠা তৈরির জন্য।”

নক্তা শব্দটা হলো আমাদের গ্রাম্য শব্দ অর্থাৎ যারা নিজের অক্ষমতা জেনেও ভাব দেখায়, তাদেরকে আমাদের গ্রামে এই ভাষায় চিহ্নিত করা হয়। যেমন বরযাত্রী বেশে কনে বাড়ীতে এসে অনেকেই ভাব দেখাতে শুরু করে- এই বলে যে “আমি ইলিশ মাছ খাই না, এতে এলার্জি হয়”, আবার অনেকে পোলাও খেতে খেতে তাতে দারুচিনি দেখে বলে ওঠে, “ভাতে দেখি গাছের ডাল দিছে!” অনেক আগে- আমার বোনের বিয়েতে আমারই বেয়াই বলেছিল, “কী! এত বড় সাহস? আমি হলাম ছেলের ভাই; আর আমাকেই দিছে গরম চা!” আসলে উনি ভাব নিয়ে চা খেতে গিয়ে ঠোঁট পুড়িয়ে ফেলেছিলেন, আর তাতেই রেগে গিয়ে তিনি এই নক্তাটা করেছিলেন।

বঙ্গসন্তানদের সবচেয়ে বেশী নক্তা দেখা যায় বিয়ে বাড়ীতে গেলে। আমি এই ছোট্ট জীবনে কমপক্ষে ৫০ টা বিয়েতে বরযাত্রী হয়েছি এবং কমপক্ষে ৫০ টা মেয়ের বিয়েতে উপস্থিত হয়ে ভলেন্টিয়ারী সার্ভিস দেওয়ার পাশাপাশি ফাওও খেয়েছি। তাই নিজেকে ও আমার সমজাতীয় বঙ্গসন্তানদের খুব ভাল করেই চিনি। যেমন আমার দুই বন্ধু ছিল- যাদের একটা কমন স্টাইল ছিল “খাবারের প্লেট অপরিষ্কার”-এই বলে একটা নক্তা হাজির করা। আর এরই অজুহাতে ঠিক কতবার যে কত কন্যাপক্ষকে আমরা হেনস্থা করেছি তার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। খুব কম বিয়ে গেছে যাতে আমরা এই বিষয়টা নিয়ে প্লেট ঢেলাঢেলি করিনি। এছাড়াও আমার একবন্ধু ছিল, যার বিয়ে বাড়িতে খাওয়া শেষে হঠাৎ করেই এক পাতিল দই খাওয়ার শখ হতো। ফলাফল আরও নক্তা করার উপলক্ষ তৈরী হওয়া। এছাড়াও কারো কারো ছিল পোলাও থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে বিয়ে বাড়ীতে ‘সাদা ভাত’ খাওয়ার নক্তা। আর “পোল্ট্রি মুরগী খাই না” এই নক্তার বোধহয় সীমা-পরিসীমা নাই।

এই পোল্ট্রি মুরগী নিয়ে আমাদের জাতীয় জীবনেও চলে অভিনব নক্তা। সেই প্রথম দিককার সময় থেকেই, যখন এই বাংলার বুকে প্রথম ফার্মের মুরগীটা ডিম পাড়তে শুরু করলো, ঠিক তখন থেকেই। একশ্রেণীর বঙ্গসন্তান বলতে শুরু করলেন, আমরা পোল্ট্রি ডিম খাই না; এমনকি এর মাংসও খাই না! অথচ খোঁজ নিলেই দেখা যেত, সেইসময়ে সেই ব্যক্তিবর্গের ঘরের চালায় টিনও ছিল না। আজ দেশের আর্থিক উন্নতি হয়েছে। মানুষের আয় বেড়েছে। কিন্তু সেই নক্তার উপসর্গ কিন্তু শেষ হয়নি। এখনো “পোল্ট্রি মুরগী খাই না”- এই গোত্রের সন্ধান সর্বত্র। অথচ এদের যদি বলা হয়- তাহলে কেএফসি খান কেন? সিপি’র চিকেন ফ্রাই কেমন লাগে? তাহলেই উত্তর না দিয়ে তেনারা আরো নক্তা শুরু করেন।

সিলভার কাপ ও পুকুরের পাঙাস মাছ নিয়ে বঙ্গসন্তানদের করা সব নক্তা দিয়ে এই লেখা ভরে ফেলাটা আমার ইচ্ছে না। তাই সেটা থেকে আপাতত বিরত থাকলাম।

এখন এই বঙ্গের নতুন উপদ্রপ হলো- আতপ চালের ভাত খাওয়া নিয়ে ‘নক্তা’। আর তাই তো জনাব তৌফিককে বলতে হয়-

“আমি নিজে এই চাল রান্না করেছি। দেশের ট্রাডিশনাল আতপ চালের মতো এগুলো নয়। এটা সিদ্ধ চালের কাছাকাছি মানের।”

১৯/০৯/২০১৭