ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

 

১)

২৫ শে আগস্ট, ২০১৭ সাল। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে, সেনা-পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুষ্টিমেয় কিছু রোহিঙ্গা যুবক, সেদেশের পুলিশ ও সেনাচৌকিতে রাতের আঁধারে আক্রমণ করে বসে। সেই আক্রমণে দুই পক্ষেরই অনেকেই হতাহত হয়। এরই প্রতিক্রিয়ায় ‘বর্মী সেনাবাহিনী’ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষের উপর ভয়াবহ অত্যাচার চালাচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে। নিরীহ নিরাপরাধ মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করছে। এছাড়াও নারী ও শিশুদের উপরও চালানো হচ্ছে নির্মম অত্যাচার। তারই প্রতিক্রিয়ায়, ৪ লাখেরও বেশী মানুষ জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পার হয়ে রিফিউজি হয়ে আমাদের দেশ তথা বাংলাদেশে এসেছে। আর এইদেশ কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত তাদেরকে এদেশে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছে। বলতে গেলে বলতে হয়- অনেকটা জনমত ও আন্তর্জাতিক চাপে পড়েই বর্তমান সরকারকে এতে রাজী হতে হয়েছে। অবশ্য এতে মানবিক বিষয়টাও ছিল; এভাবে তো মানুষকে মরতে দেওয়া যায় না? তবে সেটা ছিল সেকেন্ড চয়েস। আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী প্রথমদিকে অনেক চেষ্টা করেছে- রিফিউজিরা যেন এদেশে না আসে। সেইসময় অনেককে সীমান্ত থেকে ফিরিয়েও দেওয়া হয়েছিল।
Rohingya 2017 refugee
ঠিক তিনবছর আগে, অর্থাৎ ২০১৪ সালে প্রায় একইরকম ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে ইরাকের ইয়াজিদী সম্প্রদায়ের উপরও। এছাড়াও এই একবিংশ শতাব্দীতেই মারণাস্ত্রের নামে ভুয়া অভিযোগ তুলে- আমেরিকা ও তার সার্বক্ষণিক সাথী ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইরাক ধ্বংস করেছে। ধ্বংস করেছে সিরিয়া।

yazidi refugee 2014
এই রাষ্ট্র দুটোকে ধ্বংস করতে এরা পাশে পেয়েছিল- মধ্যপ্রাচ্যেরই কয়েকটি দেশকে। এদের মধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, আমিরাত, কুয়েত তাদেরকে সরাসরি সহযোগিতা করেছে। শোনা যায়, এক ইরাকেই নাকি মারা গেছে প্রায় ১০ লক্ষের উপর মানুষ! সিরিয়ায় মারা গেছে আরও প্রায় ৪ লাখ। লিবিয়ায় কত মানুষ মারা গেছে তার কোন হিসেবে কোথাও দেখিনি। তবে ধারণা করি সেখানেও লক্ষাধিক মানুষ মারা গেছে! অর্থাৎ জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এই তিনটে দেশেই প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষের মত মানুষ। যাদের অধিকাংশই প্রতিবেশী ও ইউরোপে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এক্ষেত্রে মিজ মার্কেল এক অনন্য কাজ করেছেন, ৮ থেকে ১০ লাখ সিরিয়ান রিফিউজিকে তিনি তার দেশ তথা জার্মানিতে আশ্রয় দিয়েছেন।

Syrian Refugee
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেটা করেছেন সেটা নিঃসন্দেহে একটা বড় মানবিক কাজ করেছেন। এই যাত্রায় তিনি প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গার জীবন বাঁচিয়েছেন। এই কাজের জন্য এদেশের প্রায় ৯৫% মানুষই তার প্রশংসা করছেন, করছি আমিও। একইভাবে ১৯৭১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাঁচিয়েছিলেন এই বাংলার প্রায় এক কোটি মানুষের জীবনও।

২)

বিশ্ব পরিস্থিতি যেদিকে আছে তাতে করে ধারণা করি, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত দেওয়টা এত সহজ হবে না। সবাই আছে যার যার লাভ নিয়ে। মিয়ানমার এখন বিশ্বের বড় বড় দেশের কাছে ‘লাভের খনি’। সবাই চাচ্ছে এদেশে থাকা আন্টাচড সম্পদে ভাগ বসাতে। ফলে তাদের কাছে লাখ দশেক মানুষের হিসেব গৌণ হয়ে গেছে।

ঘটনাক্রমে রোহিঙ্গা মানব গোষ্ঠীকে যদি বাংলাদেশে রেখে দিতেই হয়, তাহলে এখন থেকেই তাদের শিশুদেরকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া উচিত। যাতে করে এই জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখাপেক্ষী হয়ে না থেকে নিজেরাই নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। এছাড়াও তাদেরকে “স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি” গ্রহণেও বাধ্য করতে হবে। বিবাহিত সকল পুরুষ ও নারীকেই পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, এদের পরবর্তী জেনারেশন যেন “বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহ” করতে না পারে- সেটাও কঠোরভাবে দেখা দরকার। সবচেয়ে ভাল হয়- যদি এদের জন্য পরিবার প্রতি “দুই সন্তান নীতি” বাস্তবায়ন করা যায়!

বর্তমান পৃথিবী ক্রমেই সাম্প্রদায়িক হয়ে যাচ্ছে, এক দেশের মানুষ অন্য দেশের মানুষকে গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। মানুষ সম্প্রদায় ও গোত্রে গোত্রে আবারো ভাগ হয়ে যাচ্ছে। “এক বিশ্ব এক মানুষ”- এই থিয়োরী মার খেয়েছে। জার্মানীতে হওয়া গত পড়শুর নির্বাচনের পর সেদেশের মানুষেরা নিজেরাই ভ্যাবচ্যাকা খেয়ে গেছে। মিজ মার্কেলের শরণার্থী আশ্রয় দান প্রকল্প সেদেশের মানুষ ভালভাবে নেয়নি। এই টার্মে যদি মিজ মার্কেল তার দেশের জনমতের আকাঙ্খা বিবেচনায় না নেন; তাহলে অচিরেই জার্মানীতে আরও একটা ‘ব্রুটাল মিয়ানমার মডেল’ দেখতে হতে পারে বিশ্বকে!

সোমবারের সংবাদ সম্মেলনে গাউল্যান্ড বলেছেন, “দশ লাখ মানুষ- বিদেশি- তাদের এদেশে আনা হয়েছে; যারা এ দেশের একটি ‍অংশ নিয়ে নিচ্ছে। আমরা এএফডি এটি চাই না।” “আমি বলতে চাই, ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা বিদেশিদের করাল গ্রাসে আমরা জার্মানিকে হারিয়ে ফেলতে চাই না। বিষয়টি খুবই সহজ।

এইমতাবস্থায়, আবেগকে বেশী প্রশ্রয় না দিয়ে, সবার আগে বাস্তবতাকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত! পাশাপাশি “রোহিঙ্গা রিফিউজি ম্যানেজমেন্টে” আধুনিকতা আনতে হবে! তা না হলে, বলা যায় না- এই রোহিঙ্গাদের কারণেই বিশ্বে আগামীতে বাংলাদেশীদের ভিসা পেতে আরও সমস্যা হতে পারে। খেতে হতে পারে মিস্টার প্রেসিডেন্টেরট্রাভেল ব্যানও’!

… একজন রোহিঙ্গা রহমত আলীর বয়স ৭৫ বছর৷ ৭০ এর দশকে তিনি মিয়ানমার থেকে পাকিস্তানে এসেছিলেন৷ তিনি জানালেন এখনকার পরিস্থিতি সেসময়ের চেয়ে ভয়ংকর৷ তবে এও বললেন পাকিস্তানে থাকাটাও অনেক কষ্টকর৷ জানালেন, ‘‘আমি রাখাইনে থাকতাম, গণহত্যা শুরু হলে ৭০ এর দশকের শুরুতেই বাংলাদেশ হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে আসি৷ আমার এক মেয়ে জোহরা খাতুন এখনও ঢাকায় থাকে৷” আলী বললেন, ‘‘আমি পাকিস্তানে আছি ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, কিন্তু পাকিস্তান আমাকে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেয়নি৷ পাকিস্তানিদের কাছে আমরা বাঙালি এবং শরণার্থী৷”

৩)

লিখতে লিখতেই জানলাম, জাপানও মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে! তাই এই পর্বে বেশী কিছু না লিখে কয়েকটি বেয়াড়া প্রশ্ন রাখি-
Refugee in 1971 -2
১৯৭১ সালে, এই বাংলার প্রায় এক কোটি মানুষকে রিফিউজি হিসেবে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ঠিক কত পার্সেন্ট বাংলাদেশী ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন?

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে যদি ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি দেওয়া যায়; তাহলে তার ২৫ গুণ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে কী উপাধি দেওয়া উচিত ছিল? আমাদের দেশ কি তা দিয়েছে?

আমরা বাংলাদেশীরা যদি “ইন্দিরা গান্ধীর করা উপকার” বেমালুম ভুলে যেতে পারি, তাহলে কী আগামীতে রোহিঙ্গারাও “শেখ হাসিনার করা উপকার” ভুলে যাবে?

আগের লেখাঃ
১) রোহিঙ্গা সমস্যা: ভাল খবর নেই
২) রোহিঙ্গা সংকট ও একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ প্রচেষ্টা

ছবিগুলো গুগল থেকে নেওয়া হয়েছে

২৬/০৯/২০১৭