ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

ঠিক কবে থেকে আমি ব্রাজিলের সাপোর্টার! সেটা সঠিক করে বলতে পারবো না। তবে ধারণা করি-  ক্লাস টু বা থ্রী’তে আমাদের পাঠ্য বইয়ে ‘ফুটবলের কালোমানিক’ নামে ব্রাজিলের পেলে’র একটা গল্প ছিল, সেটা পড়েই আমার মাইন্ড “ব্রাজিল কন্ট্রোল্ড” হয়ে থাকতে পারে। বলতে গেলে বলতে হয়- হালের ‘ব্লু হোয়েলের’ মত করে, সেই আমলেই আমি ব্রাজিলের খপ্পরে পড়েছি। তবে সেটা আমার ভিতরে সুপ্ত হয়েই ছিল অনেকদিন; আত্মহনন ঘটায় নাই! কিন্তু এর ম্যাজেজা টের পেলাম ১৯৮৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপটা টিভিতে দেখতে যেয়ে। সেই সময়টায় ‘ম্যারাডোনা যাদু’র বিপক্ষে যেয়েও আমি ব্রাজিল সাপোর্টার বনে গেলাম। কপালে জুটলো বড়দের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর টিটকারী। সাথে ফাও হিসেবে খেলাম বন্ধুদের পেটাতন। এতে অবশ্য আমি সাথে পেলাম আমার বাল্য বন্ধু বাঁশীকে। আর্জেন্টিনা’র সমর্থকগোষ্ঠী নামক পুরো পাঙ্গোপালের বিপক্ষে আমরা দুইজন একলগে লড়ে গেলাম। পাশাপাশি আমাদের এলাকায় “আর্জেন্টিনা তথা ম্যারাডোনা সমর্থকগোষ্ঠী” নামক এক ‘অবুঝ’ গোষ্ঠীর বিপক্ষে এলাকার সচেতন বন্ধুদের নিয়ে ‘ব্রাজিল সমর্থকগোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করলাম।

সবচেয়ে বেশী পেটাতন খেয়েছিলাম, ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কাছে ব্রাজিল হেরে গেলে। সেই খেলার পরদিন সকালে- আমি আর আমার বন্ধু বাঁশী, বাড়ি থেকে পালিয়ে এক গোপন জায়গায় মন খারাপ করে বসে আছি, এমনসময় আমাদেরই বাল্য বন্ধুদের ‘আর্জেন্টিনা গ্রুপ’ আমাদের খুঁজতে খুঁজতে এসে হাজির হলো। তারপর আর কী! শুরু হয়ে গেল কিলাকিলি! ওরা পিটিয়ে আমাদের দুইজনকে তক্তা বানালেও ওদের কেউই পাল্টা কিল না খেয়ে ফিরতে পারেনি সেদিন! সেকেন্ড রাউন্ডের সেই খেলায় ম্যারাডোনার বাড়িয়ে দেওয়া বল থেকে ক্যানিজিয়া যখন গোলটা দিলো, ঠিক সেইসময়- সত্যি বলতে কী, আমার হার্টটা বন্ধ হয়ে গেছিল। ব্রাজিলের তৎকালীন ক্যাপ্টেন ডুঙ্গারটাসহ চার-চারটা শ্যুট আর্জেন্টিনার বারে লেগে ফিরে আসার ‘মনপোড়া কষ্টটা’ এখনো ফিল করি! সেই থেকে ক্যানিজিয়াকে আমি ‘দুই চোখে’ দেখতে পারি না! সেই আসরেই ম্যারাডোনা ‘ড্রাগে ধরা’ খেয়ে নিষিদ্ধ হওয়ায়, এক নির্মল আনন্দ অনুভব করেছিলাম! পাশাপাশি ম্যারাডোনার সাপোর্টারদের পচানোর এই সুযোগটাকে আজ পর্যন্ত একচুলও হাতছাড়া করিনি। তাই বলে কি আমি ম্যারাডোনার খেলা পছন্দ করি না? উত্তরটা গোপনই থাক! সব কথা সবসময় বলতে হয় না! এই লেখা আমার ব্রাজিল সাপোর্টার বন্ধুরা যেমন পড়বে, তেমনি পড়বে আর্জেন্টিনা নামক এক ‘হুদাই সাপোর্টার’ গোষ্ঠীও! তাই জেনেশুনে তাদের কারো হাতে অস্ত্র তুলে দিতে চাই না! এছাড়াও নিজের ‘রাজাকার’ ট্যাগ খাওয়ার চান্স তো আছেই!

অবশ্য ফুটবল নিয়ে আমাদের এই কিলাকিলি নতুন কিছু ছিল না। কারণ আবাহনি-মোহামেডান নিয়ে আমাদের মারামারি করাটা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক একটা বিষয়। এই দুই দলের খেলা চালাকালীন সময়ে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরতে আমরা দলবেঁধে মারামারি করতাম। আবার মারামারি শেষে সবাই হাত-পিঠ ফুলিয়ে একই সাথে গলাগলি করে বাড়ি ফিরতাম। একটা পর্যায়ে দেখলাম- আমাদের সবারই দুহাতেরই কনুয়ের হারের মাংসগুলো ফুলে ফুলে ‘ট্যামা ট্যামা’ হয়ে গেছে। তবে আমরা আমাদের মারামারি করাটাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলাম সেইসময়ে। যেমন- স্কুল থেকে দলবেঁধে ফেরার ও তর্কাতর্কীর এক পর্যায়ে সবাই এক জায়গায় বইগুলো গুছিয়ে রেখে দুইদলে ভাগ মারামারি শুরু করতাম এবং মারামারি শেষে আবারও যেভাবে বাড়ী ফিরছিলাম ঠিক সেইভাবেই বই-খাতা গুছিয়ে নিয়ে গলাগলি করে বাড়ী ফিরতাম। কিল যেন কারো নাকে-মুখে না লাগে, সেইবিষয়ে সবাই সতর্ক থাকতাম। এখানে বলে রাখি- আমি আর আমার বন্ধু বাঁশী আবারও একই দলে ছিলাম, অর্থাৎ আমরা দুইজনই ছিলাম মোহামেডানের সাপোর্টার। অবশ্য আমি কেন মোহামেডানের সাপোর্টার হয়েছিলাম সে বিষয়ে কোন স্মৃতি আমি এই মুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছি না! সম্ভবত কায়সার হামিদকে ভাল লাগতো! অপরদিকে আমি ছিলাম- আসলামের ঘোরতর বিপক্ষে!

যে কথা বলতে আজকের এই লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম, তা এখনো শুরু করতে পারিনি। আমরা জানি- বর্তমানে ৩২ টা দল নিয়ে ৪ বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে। এবারের, মানে ২০১৮ সালের আসর বসবে রাশিয়ায়। ইতিমধ্যেই কারা কারা এবারের বিশকাপ খেলবে তা নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে। গতকাল রাতে- অনেকটাই মরতে মরতে বেঁচে গেছে আর্জেন্টিনা। মেসি একাই ৩ গোল করে একটা বাজে দলকে বিশ্বকাপে নিয়ে এলেন! অথচ চিলির মত একটা ভাল দল বাদ পড়ে গেল! কী আর করার আছে! ফুটবল গোলের খেলা, তাই মেনে নিতে হবে! আবারো প্রমাণ হলো- আর্জেন্টিনা ওয়ানম্যান শো টিম!

 

 

আমি আসলে এসব লিখতেও এই লেখার অবতারণা করিনি! আমি আসলে একটা প্রস্তাব দিতে চাচ্ছি-

দেখা যায়, প্রতিবারই বিশ্বকাপে অনেক ভাল ভাল দল বাদ পড়ে যায়। আবার দুর্বল হয়েও অনেক দলই কোয়ালিফাই করে। আবার দেখা যায়, দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা না পাওয়ায় অনেক দুর্দান্ত খেলোয়াড় কোনদিনই বিশ্বকাপ খেলতে পারেন না; অথবা তুখোড় ফর্মে থেকেও অনেক খেলোয়াড়ই এই আসর মাতাতে পারেন না। যার ফলে একদিকে ভাল খেলোয়াড়েরা যেমন তাদের খেলোয়াড়ি জীবন আক্ষেপ নিয়ে শেষ করেন! অপরদিকে আমরা দর্শকরাও ভাল খেলোয়াড়ের খেলা দেখা থেকে বঞ্চিত হই। এই যেমন এবার? যদি গতরাতে মেসি দুর্বল ইকুয়েডরকে ৩ গোল দিতে না পারতেন, তাহলে কী হতো? নিশ্চিত করে বলা না গেলেও- ধরে নেওয়া যায় আজের্ন্টিনার বিশ্বকাপ খেলা এবার ফিকে হয়ে যেত। অপেক্ষা করতে হতো প্লে-অফ ম্যাচের জন্য! সেটা এই দলের জন্য সম্মানের ব্যাপার হত না নিশ্চয়। যদিও এই দলের হাত দিয়ে গোল করার অভ্যাস আছে। আর প্লে অফ হারলে মেসিকে টিভিতে রাশিয়া আসর দেখতে হতো। বিষয়টা এই খেলার আমরা যারা ভাল দর্শক আছি- তাদের জন্য ভাল হতো না মোটেই। আবার চিলির বাদ পড়ে যাওয়ায় কয়েকজন ভাল খেলোয়াড়ের খেলা দেখা থেকে এবার আমরা বঞ্চিত হবো নিশ্চিত।

এই সমস্যা কাঁটাতে আমার প্রপোজাল হলো- ভাল খেলোয়ার থাকা সত্ত্বেও যেসব সব দল বাদ পড়ে গেল, তাদের ভাল খেলোয়াড়দেরকে দুর্বল দল হয়েও ঘটনাচক্রে যেসব দল চান্স পেয়েছে- সেইসব দলে খেলতে দেওয়া উচিত। তাতে করে বিশ্বকাপে দুর্বল দলগুলোর শক্তি যেমন বাড়বে, তেমনি আমরা ভাল খেলা দেখে আনন্দও পাবো!

উদাহরণে বলা যায় চিলির ৩-৪ জন খেলোয়াড়কে যদি এবার আর্জেন্টিনা দলে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার শক্তি বাড়বে; তেমন আমরা খেলা দেখেও আনন্দ পাবো! কারণ বিশ্বকাপ জিততে হলে তাদেরকে তো ব্রাজিলকে ফেস করতেই হবে। তখন একা মেসি কী তা পারবে?