ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

১৯৯১ সাল। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক কোয়ার্টারে দিদি’র বাসায় টিভিতে দলবেঁধে ফুটবল খেলা দেখছিলাম। সেখানে ছিল আমার জামাইবাবু ও তার কয়েকজন অনার্স পড়ুয়া ছাত্র। খেলার এক পর্যায়ে আমার দল একটা গোল দিতেই আমি বলে ফেললাম, “ওহ! পাইরা খাইয়া খেলতেছে!” আমার বলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমার জামাইবাবু কথাটা ধরে ফেললেন, ভীষণ রেগে যেয়ে বললেন, এসব কী বলছিস, ভাল ভাষায় কথা বল! বকা শুনে আমি পুরো থ বনে গেলাম! কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। আমার অবস্থা বুঝে জামাইবাবুর এক ছাত্র তার নাম ছিল পবিত্র, তিনি আমাকে উদ্ধার করলেন, বললেন, “ও কিছু না বুঝেই বলেছে স্যার! ছেড়ে দেন!” পবিত্রদা ঘুরে আমাকে বললেন, “বেয়াই আরও একটু শেখো!” তারপর আমি পুরো অফ গেলাম। খেলায় আর কোন কথা বললাম না, নিজে নিজে ভাবতে থাকলাম, আমি এখানে কী ভুল করলাম? এই কথা তো আমি আমাদের গ্রামে অনেকের মুখেই শুনেছি, নিজেরাও অনেকবার বলেছি! কই, কেউ তো কোনদিন এমন রিয়াক্ট করেনি? তাহলে আজ কেন আমি এটা বলে স্যাটারিং খেলাম! ‘পাইরা’ বলতে তো আমি জানি, পাইরা’র ছাতুকে!

এখানে বলে রাখি- আমাদের সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ‘যব’কে ‘পাইরা’ বলে। সেই ছোটবেলায় দেখেছি- আমার দিদিমা, চৈত্র মাস এলেই তার মাটির কোলা থেকে ‘পাইরা’ বের করে অথবা সদ্য ক্ষেতে ওঠা ‘নতুন পাইরা’ এনে বড় বড় পাথরের যাঁতায় ছাতু বানাতে বসে যেতেন। যবগুলোকে গুঁড়ো করার আগে তিনি তা একটা মাটির পাতিলে ভেজেও নিতেন। আমার দিদিমা তার ‘যক্ষের ধন’ খ্যাত মাটির কোলাগুলোতে যেসব শস্য রাখতেন; সেগুলোকে তিনি ‘আকালের সঞ্চয়’ বলতেন। ছাতু বানানোর পর সেই ছাতু আমরা জল দিয়ে তাতে গুড় আর লবন মিশিয়ে সমানে খেতাম। মাঝে মাঝে তাতে মুড়িও মিশিয়ে নিতাম। অপরদিকে, এটা যেন আমরা একটু বেশীই খাই; তার জন্য, “পাইরার ছাতু খেলে গায়ে অনেক শক্তি হয়”- বলে মা-দিদিমারা আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন। আজকের দিনে যেমন হরলিক্সের বিজ্ঞাপনে মায়েদেরকে উৎসাহ দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি ছিল সেইদিনগুলোও! এই হরলিক্সেও কিন্তু আছে এই ‘পাইরা’ অর্থাৎ ‘যব’? খেয়াল রাখতে হবে! সবকিছুকে একলগে গুলিয়ে ফেললে কিন্তু চলবে না; তাতে বাড়বে বিপদ? যেমনটা আমার হয়েছিল! অর্থাৎ “পাইরা খাইয়া খেলতেছে”- এই কথা বলে আমি হয়তবা বোঝাতে চেয়েছিলাম, পাইরার ছাতু খেয়ে শক্তি অর্জন করেই খেলোয়াড়’রা এমন ভালো খেলছে।

এবার মূলে আসা যাক-

স্যাটারিং খাওয়ার পর অনেক ভেবে ভেবে আমি বের করলাম- অনেক আগে, আমাদের প্রাইমারী স্কুলের পাশের মাঠে একদিন সাপ খেলা দেখতে গিয়ে দেখেছিলাম, এক সাপুড়ে হাতের তালুতে পারদ নিয়ে সবাইকে দেখাচ্ছে আর বলছে, “এই ‘পাইরা’র সাথে আমার ঔষধ মিশিয়ে খেলে আপনার লিঙ্গ খুব বড় ও শক্ত হবে, একবার সেক্স শুরু করলে আর থামবেন না, খালি … (ইশারায় দেখালেন)” বলেই সে একজনকে সেই পাইরা (পারদ) খাইয়ে দিলেন! ব্যস শুরু হয়ে গেল ঔষধ বিক্রি! কবিরাজ মশাই আরও বলেছিলেন, এই পারদ পুরুষের লিঙ্গ দিয়ে বের হলে, আপনি হয়ে যাবেন আসল মর্দা, আর পাছা দিয়ে বের হলে কিন্তু খবর আছে! অবশ্য আমার ঔষধ দিয়ে খেলে সেটা সামনে দিয়ে বের হবেই!” – এই গ্যারান্টি দিয়েই সে তার ঔষধ বিক্রি করছিল সেদিন। আর তার সামনে গোল হয়ে হাঁ করে ‘সক্ষম লিঙ্গ’ খুঁজতে থাকা পুরষদের মুখে পারদের গোল গোল টুকরাগুলোকে এক এক করে ঢেলে দিচ্ছিল। এছাড়াও সে পারদ খোরদেরকে একটা কায়দা করে বার কয়েক উঠ-বস করাচ্ছিল; যাতে করে সেগুলো পাছা দিয়ে বের না হয়ে লিঙ্গ দিয়ে বের হয়। সেই কবিরাজ তাদেরকে বেশী করে ডাবের জল খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছিল সেদিন। এছাড়াও- সেদিন সে তার ভাষায় নিষেধাজ্ঞা দিতেছিল- এই বলে যে, এই পাইরা যেন কোন ‘মেয়ে মানুষ’ না খান! তাতে করে উল্টো ফল হবে? অর্থাৎ তাদেরকে ঘরে রাখা যাবে না!

এই হলো- “পাইরা খাইয়া খেলতেছে”র আসল ম্যাজেজা! অর্থাৎ আমি বুঝেছি এক। আর এই কবিরাজের কথা যারা শুনেছেন তারা বুঝেছেন অন্যটা। আসলে আমিই ভুল ছিলাম, “পাইরা খাইয়া খেলতেছে”- এই বাক্যের আসল অর্থ সেদিন হয়েছিল- পাইরা (পারদ) খেয়ে খেলোয়াড়দের সেক্স পাওয়ার বেড়ে গেছে” ধরণের।

এই কথা মনে হওয়ার সাথে সাথেই আমি বুঝে গেলাম, আমি আসলে কী বলেছিলাম; সেটার অর্থ কী ছিল? মনে মনে ভীষণ লজ্জা পেলাম সেদিন। আর কোনদিনও সেই ভাষা ব্যবহার করিনি। আজ লিখলাম মাত্র।

কিন্তু ‘এই বাক্যটা’ আমাদের এলাকায় অনেকটাই প্রবাদে রূপান্তরিত হয়েছে বা মানুষের মুখে মুখে চলতে চলতে এক ধরণের কথ্য ভাষায় পরিবর্তিত হয়েছে। এখনো অনেককেই কোন ভাবান্তর না দেখিয়েই এই বাক্যটা বলতে শুনি। এইরকম আরও অনেক বাক্য ও শব্দ আমাদের ভাষায় আছে; যাদের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হয়। অঞ্চলভেদে পাল্টে যায় অর্থও।

উপরের উদাহরণ দিয়ে আমি আসলে বোঝাতে চেয়েছি। একই শব্দের বা বাক্যের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ হয়। সেই অর্থ নির্ভর করে যিনি বলছেন এবং যিনি শুনছেন তাদের উপর। যদি দুইজনেরই টোন এক হয়, তাহলে যেকোন ভাষা দিয়েই একে অপরের সাথে ভাবের আদান-প্রদান করা যায়, প্রকাশ করা যায় মনের ভাবও। কিন্তু যদি টোন ভিন্ন ভিন্ন হয়, ট্র্যাম্প-কিমের মত হয়, তাহলে কিন্তু পারমানবিক যুদ্ধও লেগে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে? আমাদের সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে ‘পাইরা’ বলতে যেমন ‘যব’কে বোঝায়, তেমনি ‘পারদ’কেও বোঝায়। অথচ এই ‘পাইরা’ শব্দ ব্যবহার করে আমি কিভাবে লজ্জা পেয়েছিলাম, সেটা তো দেখলেন? অপরদিকে, বানানে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও উচ্চারণে ‘পায়রা’ (আঞ্চলিকে পাইরা) বলতে কবুতরকেও বোঝায়। এটাকেও কিন্তু খাওয়া যায়?

‘শিবলিঙ্গ’ – এর প্রকৃত অর্থ না জেনে, অথবা জেনেও যারা বিতর্ক করে, আজেবাজে কথা বলে তার প্রকৃতপক্ষে হিন্দুধর্ম বিদ্বেষী। জ্ঞানপাপীরা ছাড়া, এদের বেশীর ভাগই এক ধরণের সুপারিওরিটি কমপ্লেক্সে (superiority complex) ভোগে। অর্থাৎ নিজের জানা বিষয় বা নিজের বিশ্বাসকেই এরা সেরা ভেবে বসে থাকেন! আর সেই কারনেই এরা অন্যদেরকে ছোট ভাবে অথবা মানসিকভাবে আঘাত করে ছোট বানাতে চেষ্টা করেন! খোঁজ নিলেই দেখা যাবে- এদের বেশীরভাগই সমাজে, পরিবারে, বিদেশে বা কর্মক্ষেত্রে খুব চাপে আছে অথবা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে আছে খুব নিম্ন পর্যায়ে। অপরদিকে এরা কনফিউজডও। এদের বেশীরভাগই ‘মিন মাইন্ডডেড’-এর মানুষ হন। তাই এরা কোন না কোনভাবে নিজেদেরকে ‘সেরা’ বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করতে চায়। আর এরই কারণে ফেসবুকে এত বিদ্বেষ দেখা যায়। এদেরকে দেখা যায় বাস্তব জীবনেও। যাদের বেশীর ভাগই আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ, কিন্তু কোনভাবে উস্কে দিতে পারলেই এদেরকে দিয়ে করানো যায় না এমন কোন আকাম পৃথিবী নেই! ফলে এরাই অতিচালাকদের খপ্পরে পরে হয়ে যায় ব্রেন ওয়াসড; হয় আত্মঘাতীও।

হালের ব্লু হোয়েল গেমসই তার প্রমাণ! লগে আছে ট্রাম্প-কিমও। একই ট্রেন্ড দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেও। আছে আমাদের ব্লগারদের মধ্যেও! পাক-বর্মী বাহিনীর চালানো গণহত্যাও সেই একই টেন্ডকে নির্দেশ করছে।

২৫/১০/২০১৭