ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

কয়েক মাস আগে আমাদের প্রিয় ব্লগার জাহেদ ভাইয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাসে আমি কমেন্টসে বলেছিলাম, একটা মোটামুটি নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ আগামি জাতীয় নির্বাচনে ২০টা আসনও পাবে না! অন্যভাবে বলেছিলাম, নির্বাচন যত বেশি ম্যানুপুলেটেড হবে আওয়ামী লীগের জেতার হারও ততটাই বাড়বে। কেন বলেছিলাম, তা বিস্তারিত আলোচনা করার দরকার আছে বলে মনে করি না। কেননা, আমরা যারা মোটামুটি দেশের চলমান ঘটনাগুলো দেখতে পাই; তারা চোখ বুঝেও তা বলে দিতে পারবো। তাই আমি এই পোষ্টে সেই কারণগুলো পয়েন্ট আকারে এক এক করে লিখছি, কারো মন চাইলে মিলিয়ে নিতে পারেন।

১) দেশের প্রতিটা পাড়ায়, মহ্ললায়, গ্রামে আওয়ামী লীগের নেতা, পাতিনেতা ও তাদের আত্মীয়, ভাই-বেরাদারদের জ্বালায় মানুষ অতিষ্ঠ। আর যেখানেই ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো ঘটছে; সেখানেই দেখা যাচ্ছে তাতে হয় ছাত্রলীগ, না হয় যুবলীগ জড়িত আছেই। আবার কোন কারণে এদেরকে দেখা না গেলেও সেখানে ইদানিং শ্রমিক লীগকে পাওয়া যাচ্ছে। (অতীতে শ্রমিক শ্রেণি ধর্ষণ করার মত সাহস পেত না; কিন্তু ইদানিং এদেরকে বেশ দেখা যাচ্ছে! কারণটা কী?)

২) গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটা সরকারী কাজ, ভাতা, অনুদান এদের দখলে। আর সব সরকারি কাজ পাচ্ছে হয় মন্ত্রী-এমপি’র আত্মীয়-স্বজন নয়ত তাদেরকে বড় ভাগ দিয়ে অন্য পাতি নেতারা। আর সেই সব কাজের মান হচ্ছে ভয়াবহ রকমের নিম্নমানের। ‘রডের বদলে বাঁশ’ তো এই আমলেরই সৃষ্টি।

৩) সাধারণ মানুষ এখন বুঝে গেছে- ‘আসল উন্নয়ন’ কাদের হচ্ছে? হ্যাঁ, সরকার বিদ্যুৎ, অবকাঠামোতে ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। কিন্তু যখনই দেখে একটা প্রোজেক্টের মুল্য বার বার শত থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হচ্ছে, তখনই মানুষ উন্নয়নের নাম শুনলেই ধরে নেয় এর মধ্যে মারিং-কাটিং আছেই! সেটা কত কোটি তা নিয়েই মূলত মানুষ আলোচনা করে! অর্থাৎ সরকার যত উন্নয়নের কথা বলে, সাধারণ মানুষ  এর পুরোটা না হলেও বেশির ভাগই চুরি হচ্ছে বলে ধরে নেয়। সরকারি দল এতে ‘চাপাবাজি’ করছে বলেও বিশ্বাস করে। যখন দেখি কেউ না চাইতেও সরকারি স্কুলগুলোতে হাজার কোটি টাকার ‘ইলেক্ট্রিক সিঁড়ি লাগানোর’ প্রস্তাব পাশ করা হচ্ছে, যখন দেখি ঢাকায় সিকিউরিটি ক্যামেরা লাগানোর জন্য ‘ছয় হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট’ নেওয়া হয়, যখন দেখি ফ্লাইওভারটা ভুল ডাইরেকশনে বানানো হচ্ছে জেনেও বার বার কয়েক শত কোটি টাকার ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। তখন ‘লালসালু’তে বলা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ স্যারের মত করে বলতে হয়, ’পা দেখে মায়া মমতা উঠে আসে না; উঠে আসে বিষ!’

৪) গত টার্ম আর এইবার, এই দুই টার্ম মিলিয়ে আওয়ামী লীগের লোকজন যে পরিমাণে হিন্দু তথা আদিবাসীদের উপর অত্যাচার করেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মন্দির পুড়িয়ে দেওয়া, বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, জমি-জমা দখলে নেওয়ার একটা হিড়িক লেগে গেছে সারাদেশ জুড়ে। রামু, নাসিরনগর থেকে শুরু করে যতগুলো বড় ঘটনা ঘটেছে, তার প্রতিটাতে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী,এমপি, স্থানীয় নেতাদের যোগ পাওয়া গেছেই। কী ঘটতে যাচ্ছে সেটা আগে জানার পরও প্রশাসন তা ঠেকানোর চেষ্টা করেনি- এটা তো পত্র পত্রিকাতেও এসেছে।

৫) দেশে মেজরিটি মানুষের মধ্যে হঠাৎ করেই পাকিস্তানি ও আরবীয় ভাবধারা বেড়ে গেছে। যা মূলত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গেছে। হেফাজতসহ অন্যান্য দলকে যতই তোষামোদ করা হোক না কেন, এরা ঠিকমত ভোট দিতে পাড়লে তার সব যাবে এই দলটার বিপক্ষে। এছাড়াও দ্রব্যমুল্য, গুমের নামে বাহানাও হবে অন্যতম বড় কারণ।

৬) যে ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের আগে আওয়ামী লীগের নেতাদেরও যে আত্মীয়-স্বজন আছে সেটা জানতামই না! বরঞ্চ আমরা জানতাম, এই দলের নেতারা সামান্য কিছু পোস্টার ছাপানোর জন্য হলেও সাধারণ মানুষের তথা বঙ্গবন্ধু প্রেমিদের কাছে হাত পাততো। কিন্তু যেই এরা ক্ষমতায় এলো, ওমনি এদের একে একে- শত শত, হাজার-হাজার আত্মীয় বের হতে থাকলো! কেমন আত্মীয়? কী তাদের সম্পর্ক? তার কোন বাছবিচার নাই! বলা হতে থাকলো- ‘ওরা আত্মীয়’, তাই এদের অবস্থান বিনা পাশে অন্দরমহলে। আর সেই নেতারা যারা এতদিন গ্রামের সাধারণ মানুষের অনুদানে বেঁচে ছিলেন, তার হয়ে গেলেন সব আত্মীয় প্রেমী! অপরদিকে, বঙ্গবন্ধুপ্রেমীরা যারা এদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তারা সব থেকে গেলেন গেটের বাইরে। হাইব্রিডের জয় জয়কারের কথা আর নাইবা বললাম।

৬) অঞ্চলভিত্তিক গড়ে ওঠা গড ফাদারদের কথা বলার আর দরকার আছে কী? মিথ্যা প্যাঁচে ফেলে, একজন নিরীহ প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানোর দৃশ্য তো এখন ট্রেডমার্ক!

৭) ফেসবুক তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মূলত নেগেটিভ খবরগুলো বেশি প্রচার পায়। এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশেরই মাথা ব্যথার কারণ নয়; এটা আমেরিকা ইউরোপকেও ভোগাচ্ছে। তাই যেহেতু এদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কমবেশি এই মাধ্যমে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত আছে, তাই নির্বাচনের আগে ‘ভুলোমনো’ এই জাতিকে তা বার বার মনে করিয়ে দেওয়ার মত মানুষের অভাব হবে না। আবার তা ঠেকানোর মত সামর্থ্যও এই দলের নাই। আর সেটা থাকবেই বা কিভাবে? আগামি নির্বাচনে হেরে গেলেও যাতে বেশি মার খেতে না হয়, সম্পদ গচ্চা না যায়, তারই লক্ষ্যে এরা অনেক আগে থেকে বিএনপি-জামাতের সাথে মিলতাল, টেণ্ডার-চাকুরি বানিজ্য শেয়ার করা, ছেলে-মেয়ের বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার নতুন চ্যানেল ডেভেলপ করায় ব্যস্ত আছেন। আবার কেউ কেউ আছেন দেশ থেকে কিভাবে পালানো যায়, সেই ধান্ধায়ও। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে এদের দিয়ে দল ফাইট দিবে কীভাবে? টাকা? শুধু টাকায় মনে হচ্ছে এবার আর কাজ হবে না! আবার সেটাও তো ম্যানুপুলেশন!

৮) আগে লুট করা- শেয়ার বাজার, সোনালি, বেসিক, জনতা, অগ্রণী ব্যাংকসহ বাংলাদেশ ব্যাংক তো আছেই। হাল আমলে দেওয়া এই সেইদিনের ফার্মারস ব্যাংকও নাকি লুট হয়ে গেছে। ’চার হাজার কোটি কোন টাকা না’ টাইপের মত আরও একটা অমর বাণী আমাদের আমজনতাকে শোনানো হলো, ’ফার্মারস ব্যাংকের মালিকেরাই সেই ব্যাংক লুট করেছে’। লুটের কথা যত খুশি মনে আমাদের বলা হয়; ততটাই খুশি মনে কিন্তু আবার জনাব বাচ্চু-আলমগীরদেরকে প্রশ্রয়ও দেওয়া হচ্ছে। রাখা হচ্ছে তাদেরকে জামাই আদরেও! আর সেই ব্যাংকগুলোর গ্রাহকরা আছেন প্রতি পদে পদে বিপদে! ফিলিপাইনের রিজল ব্যাংক তো বলেই দিয়েছে, ’তাদের কাছে চুরি করে যে টাকা পাঠানো হয়েছিল, তার সাথে সেই দেশের লোকজনই জড়িত। অর্থাৎ বাংলাদেশের সরকার তা জেনেও গোপন করে রেখেছে! লালসালুর সেই বাক্যের মত করে- আমরাও কিন্তু রিজল ব্যাংকের কথাটাকে ফেলে দিতে পারছি না, বিশ্বাস করতেও মন চাইছে! আপনাদের কী মনে হয়? একটার পর একটা ব্যাংক লুটের নজির কী বলে?

৯) বিএনপির অনেক কাজকেই আমি সমালোচনা করি। কিন্তু তাদের তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জনাব এহসানুল হক মিলন সাহেবের নকলের বিরুদ্ধে নেওয়া অবস্থানের কথা আমি সর্বদা সম্মানের সাথে স্মরণ করি। তিনি তাঁর একক প্রচেষ্টায় আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নকল উচ্ছেদ করেছিলান। কিন্তু এখন আমরা কী দেখতে পাই? “শিক্ষার হার বাড়ানোর এক নকল উপায়” হিসেবে প্রথমে লিখলেই নম্বর দেওয়ার মাধ্যমে গণ ’এ’ প্লাসের সাথে সাথে গণপাসও করানো হলো। তাতেও খুশি না হয়ে এখন তো ক্লাস ওয়ান থেকেই প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে! আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হতো কিন্তু তা এখকার মত এত ব্যাপকভিত্তিক ছিল না! যখন দেখি, একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের একজন ছাত্রী সামান্য ক্লাস টু-এর বাংলা বানান লিখতেও হিমশিম খাচ্ছে, ইংরেজি পড়াতে থতমত খাচ্ছে! তখন বুঝে যাই, আমাদের বর্তমান শিক্ষার মানের কী হাল! এই পাস করা লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রী আগামী নির্বাচনে ভোট দিবে, যাদের বেশির ভাগই তখনও বেকার থাকবে। যেহেতু তারা পাস করেছে তাই তাদের মনে একটা ভাল চাকুরি পাওয়ারও আকাঙ্খা তৈরি হয়েছে! আবার যেহেতু সেটা তারা পাচ্ছে না, তাই এরা বিদ্রোহ করবেই। ফলাফল, এদের ভোট যাবে এইদলেরই বিপক্ষে।

১০) সরকারের মূলকেন্দ্রের আশেপাশে একটা মাফিয়া কার্টেল গড়ে উঠেছে, ফলে ‘কেন্দ্র’ দেশের প্রকৃত তথ্য পাচ্ছেন না। যাওবা পাচ্ছেন সেটাও ম্যানুপুলেটেড! আর চাটুকারেরা সেটাও চাটু মেরে মেরে আরও হালকা করে দিচ্ছে! ফলাফল, বিপর্যয়!

এরপরও যারা রংপুরের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী, যিনি ছিলেন ক্ষমতাসীন মেয়রও, তার ব্যাপক ভোটে ডিফিট খাওয়ায় অবাক হচ্ছেন, তাদেরকে উপরের কারণগুলো আবারো পড়তে অনুরোধ করছি। আবার যারা বলছেন, এই নির্বাচন নয়, আসল নির্বাচনের দেখিয়ে দেবো- তাদেরকে পোষ্টের সূচনাটা আবারও পড়ার অনুরোধ জারি থাকলো!

২৩/১২/২০১৭