ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

নতুন ডিজিটাল আইন করার আগে সরকারের উচিত ছিল বাংলাদেশে ব্যাংকের রিজার্ভ লুটের তদন্ত রিপোর্টটা প্রকাশ করা। এতে করে ‘অন্তত সরকার মুখে যা বলছে’- তার কিছুটা ভিত্তি পেত! সেটা না করে, ৩২ ধারার মত আরও একটা অনৈতিক আইন করে মানুষকে হয়রানী করার নতুন ফাঁদ পাতার মানে কী? নিশ্চয় এর একটা বড় উদ্দেশ্য আছে?

পূর্বে প্রকাশিত খবরঃ অর্থ ফেরেনি, বিচারও হয়নি

খবরের চুম্বক অংশঃ

এর মধ্যে শ্রীলঙ্কায় যাওয়া ২ কোটি ডলার কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসে। আর ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের মধ্যে ফিরে এসেছে মাত্র ১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ফলে চুরির দুই বছরেও ফিলিপাইনে থাকা বাকি ৬ কোটি ৬৪ লাখ (৫৪৪ কোটি টাকা) ডলার ফেরত আসেনি। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ হয়নি, মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে আসামি করা হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত কারও শাস্তিও হয়নি।

মাননীয় মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাহেব তার কিছুটা ফাঁস করেছেন। তিনি বলেছেন, “আপনারা (সাংবাদিকরা) গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই এগুলো ঠেকাতেই এ আইন করা হয়েছে।”

পূর্বে প্রকাশিত খবরঃ ‘ব্যাংকে ভীতি সৃষ্টি করেছিলেন বাচ্চু’

খবরের চুম্বক অংশঃ

বহুল আলোচিত বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক শিপার আহমেদ বলেছেন, বেসিক ব্যাংকে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছিলেন চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। ব্যাংকে তার ছিল একচ্ছত্র দাপট ও খামখেয়ালিপনা।

মন্ত্রী সাহেবের এ কথার মানে হলো- যারা ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেট, প্রজেক্ট, ব্রিজ, রিজার্ভ লুট করছেন, বিদেশে টাকা পাচার করছেন, নিরীহ মানুষের জমি-জমা দখল করছেন, সাওতাল পাড়ায়, পাহাড়ে, হিন্দু বাড়িঘরে আগুণ দিচ্ছেন, সর্বোপরি দেশের ‘উন্নয়নের রডে’ বাঁশ দিচ্ছেন; তারা সবাই ক্ষমতাশালী! তাই তাদের এই লুটের খবর ফাঁস হলে তাদের মান সম্মান থাকে না! কথা তো সত্য! সেক্ষেত্রে আমরা নতুন এই আইন- ‘৩২ ধারা’কে বড়জোর বলতে পারি, “ক্ষমতাশালী লুটেরাদের মানসম্মান রক্ষার আইন!”

আরও একটা ব্যাংক লুটের নতুন খবরঃ একক ব্যক্তির ঋণে বৃহত্তম কেলেঙ্কারি

খবরের চুম্বক অংশঃ

অনুসন্ধানেও জানা যাচ্ছে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংকের এই পর্ষদের উৎসাহই ছিল বেশি। পর্ষদের সিদ্ধান্তে বারবার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো। ব্যাংকের উদার আনুকূল্য পাওয়া এই গ্রাহক হচ্ছে এননটেক্স গ্রুপ। এর পেছনের মূল ব্যক্তি হচ্ছেন মো. ইউনুস (বাদল)। তিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তাঁরই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে সব ঋণ নেওয়া হয়। তাঁর মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রপ্তানি।

মো. ইউনুস (বাদল) একসময় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য কর্মচারী ছিলেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এখন ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তার উত্থান ঘটেছে। এ সময় ব্যাংক যেমন ছিল উদারহস্ত, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন একাধিক মন্ত্রীর। পর্ষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অনেকে তো ছিলেনই, পিছিয়ে ছিলেন না ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। এমনকি সিবিএ নেতারাও আছেন তার সঙ্গে। ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণ পেতে পরিচালনা পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক করে দিতে ভূমিকা রেখেছিলেন সিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম। ১৯৭৩ সাল থেকে জনতা ব্যাংক গণতান্ত্রিক কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ, জাতীয় শ্রমিক লীগের অন্তর্ভুক্ত) সভাপতি তিনি। তার নামে করা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝাওয়াইল ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে নির্মিত হচ্ছে ২০১ গম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘বাদল হেলিপ্যাড’। রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানালেন, ‘মসজিদ বানাতে সব মিলিয়ে ২৫০ কোটি টাকা লাগবে। ইউনুস (বাদল) সাহেব পুরো টাইলস দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে তার অনুদান শতকোটি টাকা ছাড়াবে।’

আমাদের পোড়ামন বুঝতে চায় না যে, বিষয়টা ওনাদের মান সম্মানেরই বিষয়ই। ওনারা ব্যাংক, বীমা, প্রোজেক্ট লুটে শত শত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। লুটের মালে- এতদিনে দেশে, সমাজে ওনাদের একটা স্ট্যাটাস দাঁড়িয়ে গেছে। গাড়ী-বাড়িতে ওনাদের এখন রমরমা অবস্থা। ছেলে-মেয়েদের দেশে-বিদেশে সেট-আপের প্ল্যান নিয়ে যখন ওনারা এগোচ্ছেন; ঠিক সেইসময় তাদের লুটের খবর প্রকাশ করাটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত- সেটা সহজেও অনুমেয়? আফটার অল, ওনারা হচ্ছেন গিয়ে ‘আপার ক্লাস’। আমাদের মত লোয়ার ক্লাসের লোকজন ওনাদের ডিস্টার্ব করবে- এটা কী ওনারা মেনে নিতে পারেন? পারেন না! আর পারেন না বলেই এই ‘৩২ ধারার’ ফন্দি বের করেছেন।

পাদটীকাঃ

আরও একটা ভাল ব্যাংক লুট হওয়ার খবরে মনটা বিষাদগ্রস্থ হয়ে আছে। যদিও ঐ ব্যাংকে আমার কোন টাকা নেই, বাস্তবে ব্যাংকে আমার তেমন কোন টাকাই নেই। তারপরেও এক একটা ব্যাংক লুটের খবর আমাকে কষ্ট দেয়। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয় আছে সেই ব্যাংকগুলোতে। যেহেতু আমি ব্যাংকিং-এর ছাত্র তাই জানি- এই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণা করাটা এখন সময়ের ব্যপার মাত্র! তারপর যারা এতে টাকা রেখেছেন তারা হয়ে যাবে একেবারেই রিক্ত-নিঃস্ব।