ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

নোয়াখালীর ভাষাটা ‘কপি’ করে সেটা যদি বাংলার উপর ‘পেস্ট’ করা হয়; তাহলে কী সিলোটি আর চাটগাঁইয়া ভাইয়েরা তা মেনে নিবে? অথবা, আমাদের চাঁপাইয়ের বন্ধু কী বলে বসবে না, “সার, এটা কী করসেন সার”? রাজশাহী থেকে কি হাঁক আসবে না এই বলে যে, “আরে মামুর বুঠা! তোখে মারতে কী হাত লাগে না কী, তোখে তো চোখেই লিয়ে লিবো?”

আবার, আমাদের খুলনা অঞ্চলের বন্ধুরা কি ছেড়ে কথা বলবে? তারা কি বলবে না, “ভাইডি, ইডা কী করছো, মেরে দেবানি কিন্তু!”

বিষয়টা আসলে তা না। প্রতিটা ভাষাই অপভ্রংশ হয়ে হয়ে আজকের পর্যায়ে এসেছে। যুগের সাথে সাথে এগুলো বদলাবেই, কেউই তা ঠেকাতে পারবে না। মানুষের আগে বলা ভাষাটা বিলুপ্ত হবে, নতুনটা এগিয়ে যাবে। জনমানুষের কাছে যেটা ভালো লাগবে, যে ভাষায় তারা কথা বলে নিজের মনের ভাব সহজে একে অপরের সাথে আদান-প্রদান করতে পারবে, সেটাই বিস্তৃতি লাভ করবে। এটা যদি না হতো, তাহলে এখনো আমরা আকারে-ইঙ্গিতেই কথা বলতাম। তা তো করি না। কে না জানে- ভাষার উৎপত্তির মূলে আছে- ইঙ্গিত ও ইশারা।

এই যে আমি এই লেখার শুরুতেই ‘কপি’ ও ‘পেস্ট’ শব্দ দুটো ব্যবহার করলাম। দুটোই ইংরেজি শব্দ। কিন্তু বর্তমান যুগে এই শব্দ দুটো এত বেশি ব্যবহার হয় যে, তা দিয়ে আমি আসলে কী বুঝিয়েছি- সেটা পাঠক মাত্রই বুঝে নিচ্ছেন বলে ধরে নিচ্ছি। এটাই ভাষার অপভ্রংশ, এভাবেই যুগে যুগে নতুন শব্দ এসে ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। পুরোনোর হয় বিলুপ্তি। মানুষ যদি কোন ভাষায় কথা না বলে, না লেখে, তাহলে সেই ভাষা বা শব্দের বিলুপ্তি অবধারিত।

আবার ধরুন, নোয়াখালীর ভাষা- গল্প, কবিতায়, গানে, বাচনভঙ্গিতে এমন সহজ ও সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠলো যে, আমাদের দেশের অপরাপর অঞ্চল- যাদের কথ্য ভাষা লেখার শুরুতেই ব্যবহার করেছি, তারা খুশি মনে সেই ভাষা ব্যবহার শুরু করলো। তাহলে কিন্তু ধরে নিতে হবে, বাংলা ভাষার মূল কথ্যরীতি নোয়াখালীই হবে। তা যতদিন না হচ্ছে ততদিন নোয়াখালীর ভাষা, বাংলা ভাষায় একটা উপভাষার কথ্যরীতি হিসেবেই থেকে যাবে।

এই যে আজকের দিনে বাংলা ভাষার কিছু কথ্যরীতি নিয়ে এত ক্যাচাল; যাকে বাংরেজী বলা হচ্ছে, এর উৎপত্তির মূলে রয়েছে কিছু ব্যক্তি বিশেষের পরিবর্তনের ও ভিন্ন কিছু করে দেখানোর মানসিকতা। এই ভাষা যদি জনপ্রিয় হয়, ব্যাপক সংখ্যক মানুষ যদি তাতে কথা বলে, তাহলে কিন্তু আমাদের সেটা মেনে নেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। কিন্তু প্রতিটা নতুন বিষয়ের শুরুতে যা হয়, এতেও তাই হচ্ছে। আর সেটা হচ্ছে ক্যাচাল! যদিও অধিকাংশ মানুষই জানে, এক সময় ‘পরিবর্তন’ তাকে মেনে নিতে হবেই, তবুও মানুষ সহজে তা মেনে নেয় না। মেনে নেয় তখন, যখন তার ঘাড়ের উপর পরিবর্তনটা চেপে বসে। এটাকে অন্যভাবেও বলা যায়- মানুষ মূলত ছোট পরিবর্তনকে মেনে নেয় না, কিন্তু বড় পরিবর্তনের সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে খাওয়াতে এক সময় তা ঠিকই মেনে নেয়।

যেমন করে হঠাৎই প্রেমে পড়া এক প্রেমিক কোনো দিশা না পেয়ে উদ্ভ্রান্তের আচরণে বলে ওঠে, “আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেমই আমার উপরে পড়েছে”। অর্থাৎ কোন উপায় না পেয়ে সে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বড় পরিবর্তনটা মেনে নিচ্ছে।

ঠিক সেভাবেই আমরা একসময় পরিবর্তনটাও মেনে নিই! যেমন করে মেনে নিচ্ছি ভাষার পরিবর্তনও।

আসলে পরিবর্তনই ভাষার নিয়ম।