ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

বাণিজ্য যুদ্ধ্যের দ্বারপ্রান্তে আমেরিকা-চীন। এ রকম একটা খবর ট্রাম্প যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হন তখন থেকেই শোনা যাচ্ছিল, এখন তা বাস্তবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এটা হওয়ারই কথা। আমরা যারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাজ করি তারা জানি- এটা শুধু অবশ্যম্ভাবীই নয়, এটা আরও আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল! হয়ত আমার কথা শুনে বলবেন, কেন? আমি বলবো, তার আগে কিছু উদাহরণ দেই, তাহলে আপনি নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই পেয়ে যাবেন।

আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্পোরেটে গত ১২ বছর ধরে শুধু রপ্তানি বিভাগেই কাজ করছি। বলতে গেলে বলতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘কাগজ ও টিস্যু পণ্য’ বিদেশের বাজারে যে যাচ্ছে- এর জন্য যারা শ্রম দিয়েছেন তাদের মধ্যে আমি তৃতীয় ব্যক্তি। মানে সবচেয়ে জুনিয়র হিসেবে শুরু করেছিলাম। অর্থাৎ একটা নতুন পণ্য বাংলাদেশের এক্সপোর্ট বাস্কেটে সংযোজন করতে যে তিনজন ব্যক্তি ডাইহার্ড কাজ করেছিলেন, দুই অগ্রজের সাথে সেখানে একজন জুনিয়র হিসেবে আমিও ছিলাম। আরও বলতে হয়, বাংলাদেশ থেকে ‘আলিবাবা ডটকমে’ রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেলস শুরু করার প্রথম ব্যক্তি ছিলাম আমি।

এই রপ্তানী বিভাগে কাজ করার আগে আমি কাজ করেছিলাম সনি-র‌্যাংগসে। সেখানে আমার মূল দায়িত্ব ছিল জাপানি ব্রান্ড ‘সনি টিভি’ ও চাইনিজ ব্র্যান্ড ‘হাইসেন্স টিভি’, যার বাংলাদেশী ব্রান্ড নেম ‘র‌্যাংগস টিভি’ নিয়ে। আরও একটা জাপানি ব্র্যান্ড নিয়ে কাজ করতাম, সেটার নাম ছিল ‘আইওয়া’।

আমার কাজের ফিরিস্তি দেওয়ার কারণ হলো, আমি প্রতিটা কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ‘মেইড ইন চাইনা’ পণ্য দ্বারা আক্রান্ত হয়েছি। সেটা কিভাবে বলছি-

যেমন ধরুন- চীনের একজন টিস্যু উৎপাদনকারীর প্রতিটন টিস্যু পেপারের মাদার রোলের উৎপাদন খরচ হয় ১,০০০ ডলার। আমাদেরও উৎপাদন খরচ একই এবং বিক্রিও করি একই দামে। অর্থাৎ ১,০০০ ডলার হলো আমাদের ব্রেক-ইভেন এবং সেই দামেই রপ্তানী করি। এবার একজন বিদেশি ক্রেতা আমার কাছ থেকে দাম নিয়ে চীনের সেই উৎপাদনকারীকে বলবে, দাম কমাও। বলার পর- সেই একই পণ্য চীনা প্রতিষ্ঠানটি সর্বনিম্ন ৮৫০ ডলারে বিক্রি করবে। সেটা কিভাবে? চীনের সরকার সেই রপ্তানীকারককে ১৮% ক্যাশ ইনসেন্টিভ দেয়। অর্থাৎ প্রতি টন ৮৫০ ডলারে তারা রপ্তানী করেও সেই প্রতিষ্ঠান সরকার থেকে পাবে প্রতিটনে আরও ১৫৩ ডলার। অর্থাৎ এক টনে সে পাবে নেট ১,০০৩ ডলার। কিন্তু আমাদের পক্ষে আর এক ডলার কমেও সেই পণ্য বিক্রি করা সম্ভব না, করলে উৎপাদন খরচও উঠবে না।

আরও একটা অবাক করা বিষয় এখানে বলি। সেই একটন উৎপাদনের জন্য সম পরিমাণ মণ্ড আমরা ও সেই চিনা প্রতিষ্ঠানটি ইন্দোনেশিয়া থেকে কিনেছি একই দামে। ধরুন, প্রতিটন ৭০০ ডলারে। এবার এর সাথে উৎপাদন খরচ, ইউটেলিটি বিল, বেতন-ভাতা সহ আরও ৩০০ ডলার ব্যয় হয় সেই পণ্য তৈরিতে। অর্থাৎ আমাদের যেখানে ব্যাপক লস হয়, সেখানে চীনের সরকারের দেওয়া ইনসেন্টিভ নামক সাবসিডিতে ব্যাপক লসে বিক্রি করেও আমার চেয়েও অতিরিক্ত ৩ ডলার লাভ করে চীনের উৎপাদনকারী।

এছাড়াও আমাদের দেশের একজন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিককে চড়া দামে জমি কিনতে হয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ লাইনের জন্য ঘুষ দিতে হয়, অথচ চীনে সেগুলো পাওয়া যায় একদম ফ্রি-তে। এতে করেও তাদের উৎপাদন খরচ অনেক কমে যায়। চীন এই কাজ করছে তাদের সব উৎপাদন সেক্টরে, সারা বিশ্বজুড়ে। এছাড়াও আছে- যেকোন জিনিস নকল করে বানানোর অভ্যাস। অর্থাৎ RND-তে এক টাকাও খরচ না করে তারা ক্লোন করছে বিশ্বের সব পণ্যই, এমনকি চাইলে তারা যেকোন ব্রান্ডের লোগোও লাগিয়ে দেয় তাতে!

যেমন আমি যখন সনিতে ছিলাম তখন দেখেছি। জাপানীরা শত শত কোটি টাকা রির্সাসে খরচ করে একটা পণ্য বানানোর ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সেই পণ্যের নকল তৈরি করে মূল খরচের তিন ভাগের একভাগে বিক্রি করছে চীনারা। চোখের সামনে আমি সনি ইলেক্ট্রনিকসের বহু প্রজেক্ট বন্ধ হতে দেখেছি।

আজ যদি বাংলাদেশ সরকার আমাদের দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রক্ষাকল্পে ডিউটি স্ট্রাকচারটা বাড়িয়ে না রাখতো, তাহলে কবে আমাদের দেশের শিল্প ধ্বংস হয়ে যেত? আর আমাদের হাতে থাকতো হারিকেন!

অর্থাৎ চীন নিজেদের পণ্য লসে বিক্রি করে সারাবিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প ধ্বংস করে দেওয়ার টার্গেট নিয়ে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যেই তারা এতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর তাইতো মুক্ত অর্থনীতির ঝাণ্ডাধারী আমেরিকাকেও শেষবেলায় ‘ট্র্যাডিশনাল বিজিনেসের হাতিয়ার’ অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স বসাতে হচ্ছে নিজেদের এলুমিনিয়াম সেক্টর তথা দেশীয় শিল্পকে বাঁচানোর জন্য।

চীনের অ্যালুমিনিয়ামের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করা হবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ওই মন্ত্রণালয় বলছে, চীন থেকে ওই পণ্য কম দামে বা সরকারি ভর্তুকিতে বিক্রি করা হচ্ছে, এতে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অসম্ভব হয়ে উঠছে। …… বিভিন্ন চীনা কোম্পানির ওপর এই শুল্ক আরোপ হবে। এই শুল্ক হার হতে পারে ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত। (সূত্র: প্রথম আলো)

বিশ্বাস করছি অচিরেই এটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। দেশে দেশে চীনের পণ্যের উপর অ্যান্টি ডাম্পিং ট্যাক্স বসবে। আর তাহলেই একটা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমাদের পণ্যও সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। বাড়বে আমাদের রপ্তানীও!