ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

একঃ

আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মানুষটা আসলেই ভিন্ন। ঠিক অন্য কোন মানুষের বা আমেরিকার পূর্বের কোন প্রেসিডেন্টের সাথে তার আচরণ খাপ খায় না! মানুষটা আর দশটা রাজনীতিবিদের মতও নন। ইতিমধ্যেই খবর চাউড় হয়ে গেছে যে, ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম সরাসরি মিটিংয়ে বসতে যাচ্ছেন। অথচ মাসখানেক আগেও তারা একে অপরকে কী-না বলে গালি দিয়েছেন? ‘নতুন আরও একটা কোরিয় যুদ্ধ হবে না’- সেটা বিশ্বাস করেছেন বিশ্বে এমন খুব কম মানুষই আছেন। বরঞ্চ মানুষ হিসাব কষছেন- সেখানে আনবিক যুদ্ধ হলে সেটা কত ভয়াবহ হতে পারে- তা নিয়ে। খবরে পড়েছি চীন তার উত্তর কোরিয়ার সীমান্ত এলাকাগুলোতে রিফিউজি ক্যাম্প বানাচ্ছে, যাতে করে যুদ্ধের কারণে উত্তর কোরিয়া থেকে রিফিউজির ঢল এলে তাদেরকে সেখানে রাখা যায়। এই যখন অবস্থা, তখন হঠাৎ করেই দুই নেতার আলোচনায় বসার কথা শুনে বিশ্বের আপামর মানুষ এক কথায় অবাক হয়েছেন। অবশ্য কিছু মানুষের মন খারাপও হয়েছে! যারা চেয়েছিল ‘আনবিক যুদ্ধ’ হলে আমেরিকাও তাতে আক্রান্ত হবে এবং সে দেশ ধ্বংস হবে। অর্থাৎ তারা ‘আলুপোড়া’ খাবে। সেই আলুপোড়াখেকোদের জন্য আমার এই পোস্ট না।

যে কোনো যুদ্ধ জেতার মূলে থাকে বিপক্ষের মূল শক্তি সম্পর্কে জানা। ট্রাম্প এসেই যেটা করেছেন, তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা তরুণ কিমকে ক্ষেপিয়েছেন। আর তার ফল পেয়েছেন হাতেনাতে। কিমের কাছে কী কী অস্ত্র আছে সে সম্পর্কে একটা চাক্ষুষ ধারণা পেয়ে গেছে আমেরিকা। হ্যাঁ, তারা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে উত্তর কোরিয়ার কাছে হাইড্রোজেন বোমা আছে। আছে আমেরিকার সব জায়গায় আক্রমণ চালানোর মত ক্ষেপণাস্ত্রও। পাশাপাশি কঠোর থেকে কঠোরতম অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সেই দেশের অর্থনীতিকে চেপে ধরেছেন আমেরিকা। থামিয়ে দিতে পেরেছেন অস্ত্র বাদে অন্য খাতের অগ্রগতি। একটার পর একটা ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণে ইতিমধ্যেই বিশ্ব জেনে গেছে যে, উত্তর কোরিয়ার ওড়ানো ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মূলত রাশিয়া তথা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের হার্ডওয়্যার। অর্থাৎ চীন ও রাশিয়ার চ্যনেলেই বেশিরভাগ অস্ত্র পেয়েছে উত্তর কোরিয়া। এছাড়াও আরও অনেক গোপন অস্ত্র কিমের কাছে না থেকেই পারে না!

তবুও আমেরিকা জন্য যেটা জানার দরকার ছিল সেটা তারা জেনে গেছে। অর্থাৎ গত কয়েক দশক ধরে আমেরিকা জানতে চাচ্ছিল, উত্তর কোরিয়ায় তারা হামলা করলে সেদেশ তাদের দেশেও পাল্টা হামলা করতে পারবে কিনা? সেটা ইতিমধ্যেই তারা জেনে গেছে। এখন তারা জানে হ্যাঁ, উত্তর কোরিয়া সেটা পারবে। তাই এবার আমেরিকা আলোচনার পথ ধরেছে। অপরদিকে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমও পাল্টা গেম খেলেছেন। তিনি তার সক্ষমতা দেখিয়ে আমেরিকার সাথে হেড টু হেড কথা বলার সুযোগ করে নিয়েছেন। যা তিনি প্রথমদিন থেকেই চাচ্ছিলেন। এতে তিনি সফল হয়েছেন, যেটা তার বাবাও পারেননি।

এছাড়াও ট্রাম্প আরও একটা দাও মেরেছেন। সেটা হলো- তিনি জাপানকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে পেরেছেন। অথচ কে না জানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান সাংবিধানিকভাবে ‘আর কারো সাথে যুদ্ধে জড়াবে না’ এমন প্রতিশ্রুতি করেছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ক্রমাগত উস্কানিতে জাপান ভয় পেয়েছে। তারা তাদের সংবিধান সংশোধন করেছে এবং অস্ত্রখাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এই তো গতকালের খবর, জাপান নিজের জন্য আমেরিকার কাছ থেকে আরও ৬০টি এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান কিনছে। পাশাপাশি মিশাইল ডিফেন্স সিস্টেম আপগ্রেড করছে। অর্থাৎ কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা তৈরী করে ট্রাম্প এখন তাকে ‘ক্যাশ’ করছেন। ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের অস্ত্র কেনা বাড়িয়ে দিয়েছে। কে না জানে, এদের অস্ত্রে বিনিয়োগ মানেই আমেরিকার লাভ! অর্থাৎ ট্রাম্পের সেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের সফল বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, ট্রাম্প তার নির্বাচনে যেমনটা বলেছিলেন, “আমি প্রতিটা বিষয় থেকে আমেরিকার লাভ তুলে আনবো”- সেটা কিন্তু ইতিমধ্যেই বাস্তব রূপ নিচ্ছে।

 

দুইঃ

কোন মানুষ যদি নিজেকে হাইলাইট করতে চায়, তাহলে সে দুই ধরনের কাজ করতে পারে। প্রথমটাতে- নিজেকে সে পজিটিভলি তুলে ধরতে পারে। কিন্তু এতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। অপরদিকে, দ্বিতীয়টাতে সে নিজেকে নেগেটিভলি তুলে ধরতে পারে। আজকেরই খবর, ভুয়া সংবাদ সত্য সংবাদের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়, অর্থাৎ মানুষ সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি বিশ্বাস করে। সত্য প্রমাণ করতে একদিকে যেমন অনেক তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে হয়, তেমনটা মিথ্যায় দরকার হয় না। মানুষের মনে ধরে বা তাদের রাগান্বিত করে এমন একটা কথা মানব সমাজে বলে দিলেই হলো, বাকি কাজটা মানুষ নিজ উদ্যোগেই করবে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য ট্রাম্প নিজেকে নেগেটিভলি তুলে ধরেছিলেন। তিনি এমন কিছু বিষয় বেছে বেছে ঠিক করেছিলেন, যেগুলো তার দেশের নাগরিকদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাবে। আমার ধারণা- তিনি নির্বাচনে জেতার জন্য সেইসব বিষয়গুলিই বেছে নিয়েছিলেন, যেগুলোতে আগের প্রেসিডেন্টরা নজরই দেননি। অর্থাৎ আমেরিকার আগের প্রেসিডেন্টরা বিদেশে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে যতটা সময় দিয়েছেন তার ছিটেফোঁটাও দেননি তাদের দেশের জনগণের একটা বড় অংশ কী চায় তা জানতে। ফলে আমেরিকার মানুষের একটা বড় অংশের মনে শুণ্যতা তৈরি হয়েছিল। তারা ভাবতে বাধ্য হয়েছিল- ‘আমেরিকা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে, এথেকে তাদের নিস্তার নেই।’ কিন্তু ট্রাম্প এসে সেই জায়গাগুলোয় আঘাত করেছেন, ফলে সেসব মানুষ যারা ভোট দেওয়ায় আর কোন চার্ম খুঁজে পেত না, তারাই দল বেঁধে এসে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন।

আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে বলে, ট্রাম্প একজন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী ও একরোখা মানুষ। যিনি নিজের লাভ ছাড়া অন্যেরটা বোঝে না। পাশাপাশি তিনি নিজের কমিউনিটিকে সেরা ভাবে ও ভালোবাসে। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে এসেও তিনি তা করে দেখাচ্ছেন। ভাল হোক কিংবা খারাপ হোক, তিনি তার সিদ্ধান্ত থেকে সহজে নড়েন না। আবার কে তার সাথে থাকলো বা গেল, পর্ণ নায়িকা তার বিরুদ্ধে কী বলল, সেটা নিয়ে তার স্ত্রী কী ভাবলো- সেগুলো নিয়েও তার কোন ভাবনা-চিন্তা আছে বলে মনে হয় না।

সবশেষে বলবো- ‘যার জন্ম হবে কিনা তা নিয়েই মানুষের সন্দেহ ছিল’- গল্পের সেই শিশুটার মত করে- ‘রিপাবলিকান দলের একজন ডোনার, ট্রাম্প যে সেই দল থেকে নমিনেশন পাবে- এটাই তো কেউ বিশ্বাস করতো না। অথচ তিনিই কিনা মাইটি হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক বছর পার করে দিয়েছেন! ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরপরই আমার একজন বায়ার- বিপুল দেশাই; যিনি শতাধিক দেশ ভ্রমণ করেছেন, তিনি একদিন আমাকে তার হোটেল রুমে গ্যারান্টি দিয়ে বলেছিলেন, “ট্র্যাম্প প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তো কি হইছে, সে অচিরেই ইমপিচ হয়ে ক্ষমতা হারাবে”- সেই কথাটার ‘সময়কাল’ও ইতিমধ্যেই একবছর পার করে দিয়েছে। অথচ ট্রাম্প এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, এবং বড় ধরনের একটা বাণিজ্য যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা করছেন। আমার ধারণা, এখানেও তিনি ভালো খেলবেন, চীনকে একটা ভেল্কি দেখাবেন!

আগের লেখাঃ চীনের ডাম্পিং ও আমেরিকার অ্যান্টি ডাম্পিং

১০/০৩/২০১৮