ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর পথে। বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে বিশ্বব্যাপী বর্তমানে যে বাণিজ্য ব্যবস্থা বিরাজমান আছে তা লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। এতেকরে একদিকে যেমন অনেক দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি লাভবান হবে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির দেশগুলো। তবে আমার ধারণা এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন! কেননা তারা বিশ্বব্যাপী এটা অনেক আগে থেকেই শুরু করে রেখেছে। সেটা তারা করেছে ‘কম দামে’ যেকোনো পণ্য বিক্রি করে। উন্নত দেশগুলো তাদের দেশের ভোক্তাদের কম দামে পণ্য দিতে পারছে- এই খুশিতে এতদিন তা ওভারলুক করে গেছে! কিন্তু ট্রাম্প সেটা ধরে ফেলেছেন!

 

 

এখানে বলে রাখি- গত বছর আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। [সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস]। অর্থাৎ গত বছর আমেরিকা যদি চীনে ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে থাকে, তাহলে চীন আমেরিকায় করেছে ৩৭৬ বিলিয়ন ডলার! একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, আমেরিকা ও চীনের বাণিজ্য অসম পর্যায়ে আছে এবং চীন পুরোপুরি মুক্ত বাণিজ্য থেকে ফায়দা লুটছে! ৩৭৫ বিলিয়নের ফিগারটায় ভালোভাবে নজর দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তাই তো ট্রাম্প বলেছেন, “বাণিজ্য যুদ্ধ ভাল!” কেন বলেছেন, সেই আলোচনায় পরে আসছি। আপাতত চীন কিভাবে বিশ্বব্যাপী ‘কম দামে’ পণ্য বিক্রি করে এই যুদ্ধ আগেই শুরু করেছে তা দেখে নেই। তবে সেই আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে রাখা দরকার আমেরিকা ও চীনের মধ্যে কেন বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হচ্ছে?

ছবি: রয়টার্স

প্রথমেই বলবো, এটা হচ্ছে কারণ, আমেরিকায় বহুদিন পর একজন ‘সত্যিকার ব্যবসায়ী’ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। যার বিশ্বব্যাপী নিজের ব্যবসা পরিচালনা করার অভিজ্ঞতা আছে। আমি বিশ্বাস করি তিনি তার ব্যবসা পরিচালনা করতে যেয়ে পদে পদে চীনের ‘অনৈতিক’ ব্যবসা পদ্ধতির দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। চীনের ব্যবসা পদ্ধতিকে অনৈতিক বলছি কারণ, চীন তার পণ্য বিদেশে রপ্তানি করার জন্য হেন কোন ‘অনৈতিক’ পদ্ধতি নেই যা করে না। যেমন-

১) পাইরেট করাঃ কোন দেশ বা বিদেশের কোন প্রতিষ্ঠান অনেক টাকা খরচ করে একটা পণ্য তৈরি করলো। যেহেতু সে এই পণ্যটা তৈরি করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেছে, সেহেতু সে সেই খরচের টাকাটা অবশ্যই সেই পণ্য বিক্রি করে তুলতে চাইবে। ফলে তার পণ্য মূল্যে সেই টাকাটা যোগ হবে। কিন্তু চীন করবে কী? সেই পণ্য বাজারে আসা মাত্র তার নকল তৈরি করবে। যেহেতু সে নকল করছে, তাই তার RND- তে খরচ হয়নি। ফলে তার পণ্যের বিক্রয়মূল্য অবশ্যই কম হবে।

২) ক্যাশ ইনসেন্টিভঃ বিদেশে পণ্য বিক্রি তথা রপ্তানি করলেই চীন প্রায় সব পণ্যেই ক্যাশ ইনসেন্টিভ তথা নগদ সহায়তা দেয়। সেটা কত পার্সেন্ট পর্যন্ত দেয় তা জানা না গেলেও মি. ট্রাম্প বলেছেন, “চীন ৫০% পর্যন্ত ক্যাশ ইনসেন্টিভ দেয়!” এখন জানা দরকার এই ক্যাশ ইনসেন্টিভ কী? ধরুন- চীনের কোন প্রতিষ্ঠান বিদেশে ১ লক্ষ ডলারের ‘কাগজ পণ্য’ রপ্তানি করলো। এক্ষেত্রে চীনের সরকার সেই রপ্তানিকারককে তাদের FOB (Freight on Board) ভ্যালুর (১ লক্ষ ডলার) উপর ১৮% ক্যাশ ব্যাক দেয়, অর্থাৎ ১৮ হাজার ডলার নগদ দেয়। ফলে এই রপ্তানিকারক তার উৎপাদন খরচের চেয়েও ১৮% কম দামে এই পণ্যটা বিক্রি করার চেষ্টা করতে পারবে! ঠিক এই কারণেই আরও যেসব দেশ এই ‘কাগজ পণ্য’ তৈরি করে, তারা বাজারে অসম প্রতিযোগিতায় চীনের কাছে হেরে যায়।

এখানে বলে রাখি- পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের রপ্তানিকারকদের ‘ক্যাশ ইনসেন্টিভ’ দেয় না, ফলে চীনের পণ্যের দাম কম হওয়ায় তারা প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। ফলে দিন দিন তাদের ব্যবসায় গ্রোথ কমে যায়, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং এক পর্যায়ে সেই শিল্প প্রতিষ্ঠানটি লোকসান দিতে দিতে বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যারা এরপরেও টিকে আছে তারা নিজ দেশের শিল্প কারখানাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তাদের আমদানির ট্যাক্স স্ট্রাকচার বাড়িয়ে রেখেছে। আর তাই তো ট্রাম্প রয়টার্সকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “বাণিজ্য ঘটতির নামে বছরের পর বছর অনেক ডলার আমাদের দেশ থেকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে আমরাই চীনকে গড়ে উঠতে দিয়েছি!”

যেমন, বাংলাদেশ সরকার কাগজ জাতীয় পণ্যের আমদানির উপর ৭০-৭৬ শতাংশ ডিউটি ও আনুষাঙ্গিক চার্জ বসিয়ে রেখেছে। যাতে করে চীন পণ্যের দাম অনেক কমালেও তা যেন এদেশে ঢুকতে না পারে। তারপরেও সেসব পণ্য ঢোকে! প্রশ্ন করতে পারেন সেটা কীভাবে হয়? আমি বলবো সেটা হয় এভাবে-

ক) আন্ডার ইনভয়েসিং করে। অর্থাৎ, চীন তাদের পণ্যের FOB ভ্যালু ডকুমেন্টে কম দেখায়। এই মূল্যটা যায় ব্যাংকিং চ্যানেলে, আর বাকিটা যায় হুন্ডির মাধ্যমে। অবৈধ হলেও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে আন্ডার ইনভয়েসিং একটা কমন ফ্যাক্টর, কিন্তু বেশিরভাগ দেশ বা প্রতিষ্ঠানই সেটাও একটা নিয়মের মধ্যে করে। অর্থাৎ ১০% থেকে ৩০% পর্যন্ত আন্ডার ইনভয়েসিং করে; কিন্তু শোনা যায় চীন ৫০% পর্যন্ত আন্ডার ইনভয়েসিং করে! অর্থাৎ, তাদের পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক খুব একটা কার্যকরি হয় না।

খ) পণ্যের মিথ্যা ডিক্লারেশন দিয়ে। অর্থাৎ, ভুয়া HS Code ব্যবহার করা হয় যাতে আমদানি শুল্ক কম আসে। এখানে বলে রাখি, বিশ্বব্যাপী পণ্য চেনার মূল মাধ্যম হলো এই HS Code। এটা ব্যবহার করেই সারা পৃথিবীতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য হয়ে থাকে।

গ) বন্ড সুবিধার মাধ্যমে। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন রপ্তানিকারকদের বন্ড সুবিধা দিয়ে রেখেছে যাতে করে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে বিনা শুল্কে পণ্য আমাদানি করতে পারে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে অনেকেই ভুয়া HS Code ব্যবহার করে পণ্য আমাদানি করে গোপনে তা আমাদের দেশের খোলা বাজারে বিক্রি করে দেয়।

৩) ইউটিলিটিতে সাবসিডিঃ চীনের একজন শিল্পপতিকে তার শিল্প স্থাপনের জন্য জমি কিনতে হয় না। এটা তারা পায় সরকার থেকে একদম ফ্রি-তে। কিন্তু আমাদের দেশের কথাই যদি বলি, তাহলে দেখতে পাই, এখানে একজন শিল্পপতিকে শুধু নানা হাঙ্গামা করে জমিই কিনতে হয় না, একটা গ্যাসের লাইনের জন্যও মাসের পর মাস নানা জায়গায় ধরণা দিতে হয়। ফলে আমাদের শিল্পকারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ‘কস্ট অফ প্রোডাকশন’ চীনের চেয়ে বেশি হয়। তাদের আছে লো ব্যাংক লোন ইন্টারেস্টের সুবিধাও। এছাড়াও আরও অনেক হিডেন বিষয় আছে যা জানা যায় না! তবে এলন মাস্কের কথায়, এ বিষয়ে কিছুটা জানা যায়-

Musk noted that a U.S. car “going to China pays 25 percent import duty, but a Chinese car coming to the US only pays 2.5 percent, a tenfold difference.” He asked Trump: “Do you think the US & China should have equal fair rules for cars? Meaning, same import duties, ownership constraints other factors.” ……… “China, which is making a major push toward electric cars, requires foreign automakers to build factories in 50-50 joint ventures with domestic Chinese automakers and not allowed them to establish wholly owned factories.

৪) মুদ্রার মান কম রেখেঃ চীন তার মুদ্রা- ‘ইউয়ানের’ মান গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে কম রেখে তাদের রপ্তানিকে প্রমোট করছে। আমেরিকা অনেক চেষ্টা করেও সেই মান বাড়াতে পারেনি। ফলে ট্রাম্প চীনকে শায়েস্তা করতে ‘এন্টি ডাম্পিং ট্যাক্সের’ নামে সহজ রাস্তা ধরেছেন।

বাণিজ্য যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা কী?

প্রথম পর্যায়ঃ প্রথমে আমেরিকা চীনকে টার্গেট করে এলুমিনিয়াম পণ্যের উপর ২৫ ট্যাক্স ধার্য করেছিলেন। এর পাল্টা জবাব হিসেবে চীন আমেরিকার ১২৮ টা পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ ট্যাক্স ধার্য করেছেন। এবার ট্রাম্প চীনের পণ্যের উপর ৫০ থেকে ৬০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ট্যাক্স ধার্য করতে যাচ্ছেন। এবারের টার্গেট চীনের হাইটেক ইলেকট্রিক পণ্য।

দ্বিতীয় পর্যায়ঃ ধারণা করছি, দ্বিতীয় পর্যায়ে চীনও পাল্টা আমেরিকার আরও কিছু পণ্যের উপর ট্যাক্স ধার্য করবেন এবং আমেরিকা আরও নতুন পণ্যকে ট্যাক্সের আওতায় আনবেন। আমি ধারণা করছি এই পর্যায়ে আমেরিকা চীনের গার্মেন্টস পণ্যের উপর ট্যাক্স ধার্য করবেন। যদি এটা হয়, যদি সত্যিই চীনের গার্মেন্টস পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ ডিউটি আমেরিকা দেয়, তাহলে একটা বড় সুযোগ আসবে বাংলাদেশের সামনে। এই পণ্যের বাজারে আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম ‘চীন’। যদি চীনের পণ্যের দাম আমেরিকায় বেড়ে যায় তাহলে সে দেশের সব ক্রেতা চলে আসবে বাংলাদেশে।

তৃতীয় পর্যায়ঃ এই পর্যায়ে আমেরিকা তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে প্রলুব্ধ করবে চীনের পণ্যের উপর এন্টি ডাম্পিং ট্যাক্স বসানোর জন্য। এটা যদি হয় তাহলে চীনের সামনে একটা ভৌতিক সময় অপেক্ষা করছে। কেননা অতিরিক্ত এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড শিল্পকারখানা স্থাপন করে চীন মূলত বিদেশে নির্ভর হয়ে গেছে। যদি পৃথিবীর বড় বড় দেশগুলো তাদের উপর খড়গহস্ত হয় তাহলে চীনে হাজার হাজার শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের মুদ্রার মান পড়ে যাবে। বেকার হবে কোটি কোটি মানুষ। এখানে বলে রাখা দরকার, পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সাথেই চীনের বাণিজ্য অসম। অর্থাৎ সব দেশই সে দেশ থেকে বেশি পণ্য আমদানি করে থাকে। এখন সবাই মিলে যদি চীনের পণ্যের উপর ট্যাক্স বসাতে থাকে তাহলে এর রেজাল্ট চীনের জন্য হবে ভয়াবহ!

এই যুদ্ধের ফলাফলঃ আমেরিকার ক্রেতারা এখন থেকে আর আগের মত সস্তায় ভোগ্য পণ্য কিনতে পারবে না, ফলে ট্রাম্প ব্যাপক চাপে পড়বেন। পাশাপাশি আমেরিকার দেশিয় প্রোডাকশন অনেক বেড়ে যাবে। তাদের ব্যালান্স অব পেমেন্টে সুবাতাস বইবে। অনেক শিল্প লাভবান হবে। কেউ কেউ হবে লুজার- যাদের মধ্যে বেশিরভাগই হবে আমেরিকার কৃষক, তবে সেটা হবে সাময়িক। চীনকে যেহেতু সয়াবিন ওয়েল আর মাংস খেতেই হবে? সেক্ষেত্রে তাকে তা অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হবে। ফলে আমেরিকার এই পণ্যগুলো সেই দেশগুলিতে রপ্তানি শুরু হবে। এবং শেষ বিচারে এই যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে চীন!

এবিষয়ে আগের লেখাঃ

চীনের ডাম্পিং ও আমেরিকার অ্যান্টি ডাম্পিং