ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

প্রথমে আমরা দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা থেকে জানলাম- বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে সোনা চুরি গেছে। কিভাবে, কী কায়দায় সেটা চুরি গেছে তার কিছু নমুনা সেই রিপোর্টে দেওয়া আছে, আর সেটাও দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ সরকারেরই একটা প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সোনা চুরি গেছে- এটা বলেছে মূলত শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। খবরটা ফাঁস হওয়ার পর পরই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র গতকালই সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, সোনা চুরি হয়নি, হয়েছে স্বর্ণকারের মাপায় ভুল। কেরানির লেখার ভুল। আর সবশেষে হয়েছে- সোনা মাপার যন্ত্রের ভুল।

সোনা কারসাজি হোক আর অর্থ – এমন ঘটনা কিছুদিন পর পর নিয়ম করেই ঘটছে। তারপর এগুলো নানা প্রশ্ন আর নানা উত্তর রেখে একসময় হারিয়েও যাচ্ছে।

শেয়ার বাজার

২০১০ সালের শেষের দিকে যখন আমাদের শেয়ার বাজার উঠছিল তখনও দেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলো বার বার বলছিল, সেখানে কারসাজি হচ্ছে। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে বাংলাদেশের গভর্নর পর্যন্ত সেই সময় সেই রিপোর্টগুলোকে মিথ্যা, ভাওতা বলে বাতিল করে দিয়েছিল।

তারপর দেখা গেল দেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিয়োগকারীদের লোভের ফাঁদে ফেলে শেয়ার মার্কেটে ডেকে এনে  বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেল। এর কোন সুরাহা আজ পর্যন্ত হয়নি। হয়নি একজনেরও বিচার।

সোনালী ব্যাংক ও হলমার্ক

সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক নামের একটা অপরিচিত শিল্প গ্রুপ ভুয়া এলসি দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়। খবরটা প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলোতে। প্রকাশ হওয়ার পর এই খবরকে সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার থেকে পক্ষ থেকে মিথ্যা ও ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই জানা গেল হলমার্ক আসলে হাতিয়ে নিয়েছে চার হাজার কোটি টাকা।

খবরটা যখন আরও স্পষ্ট হয় তখন জানা গেল- এতে জড়িত আছে প্রাক্তন ছাত্র লীগ, মহিলা লীগের লোকজনও। এই বিষয়টারও স্পষ্ট ও ভাল কোন তদন্ত হয়নি। দেশের মানুষের আইওয়াশ করার জন্য যতটুকু করার দরকার ছিল ঠিক ততটুকুই করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংক লুটপাট

বেসিক ব্যাংক ছিল একটা আধুনিক পরিচালনায় একটা সরকারি ব্যাংক। বাংলাদেশের ভাল ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই ব্যাংক। তারপর ‘বাচ্চু’ নামের এক অচেনা মানুষকে এই ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এরপর বাচ্চুর ছবি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে ঘন ঘন আসতে থাকলো। কখনো দেখা গেল তিনি ব্রাঞ্চ উদ্ধোধন করছেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে চাঁদা প্রদান করছেন।

এর অল্প কিছুদিন পরই পত্র-পত্রিকায় সেই বাচ্চুর দুর্নীতি আর লুটপাটের খবর প্রকাশ হতে থাকলো। সরকার থেকে, ব্যাংক থেকে- সেই সব খবর বার বার নাকচ করা হলো। তারপর আমরা জানলাম বেসিক ব্যাংক থেকেও প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। ব্যাংকটাকে পথে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এখানেও একটা ভাল তদন্ত না করে সবকিছু ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। একটা ভাল তদন্ত হলে দেখা যেত এখানে লুটপাট হয়েছে আরও ব্যাপক। এই হরিলুটেও একটা গোষ্ঠীর  লুটপাটের আভাস পাওয়া গেছে কিন্তু তা আর প্রকাশ হয়নি। ফলে আমরা আমজনতা সেটাও মেনে নিয়েছি বা নিতে বাধ্য হয়েছি।

বর্তমানে শেয়ার বাজার, হলমার্কের মত এটাও তামাদি ইস্যু।

জনতা ব্যাংক লুটপাট

এখানেও আমরা পত্রিকা থেকেই জানলাম, যে কিছুদিন আগেও একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেছে তাকেই এই ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের নিয়মনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন কিছুই মানা হয়নি। ফলশ্রুতিতে জনতা ব্যাংকও ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। অল্প কিছুদিন পরই হয়ত জানবো সেখানেও ভয়াবহ লুটপাট হয়েছে এবং এই ব্যাংকেরও দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার দশা হয়েছে।

রিজার্ভ চুরি

এই চুরির খবরটাও আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় এক মাস গোপন করে রেখেছিল। হয়ত বাংলাদেশের মানুষ জানতোই না- যদি না খবরটা বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।

যখন বিষয়টা ‘ওপেন সিক্রেট’ হলো তখনই কেবল জাতি জানতে পারলো মাত্র ৮ কোটি ডলার চুরি গেলও টার্গেট ছিল ১০০ কোটি ডলারের অর্থাৎ আরও ৮,২০০ কোটি টাকা।

নেহাতই ভাগ্যগুণে সে যাত্রায় দেশ বড় ধরণের ক্ষতি থেকে বেঁচে যায়। আর সেটাও হয়েছে শ্রীলংকার নাম না জানা কিছু ব্যাংকারের উপস্থিত বুদ্ধিতে। নইলে আমাদের ব্যাংকাররা যেভাবে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে অথবা ঘুমানোর ভান করে চুরিতে সহযোগিতা করছিলেন, তাতে করে পুরো রিজার্ভ লুটের পরই কেবল জাতি জানতে পারত ‘রিজার্ভ নেই’।

একই ঘটনা ঘটেছে অগ্রনী, ফারমার্স ব্যাংকের বেলায়ও।

এরকম আরও অনেক অনেক লুটপাটের খবর লেখা যায়। যেমন, বিদেশি মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া সোনার ক্রেস্ট থেকে সোনা চুরি।

কিন্তু এতে আওয়ামী লীগ বা সরকারের লাভ কী হচ্ছে? ঠকবে তো তারাই, আর দিনশেষে এদেশের জনগণ। অপরদিকে এতে লাভবান হচ্ছে সেইসব চোরের দলের যারা আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে।

একটাই প্রশ্ন, এত এত লুটপাটের পরও কেন একটারও বিচার হয় না? কেন চোরদের ছেড়ে দিয়ে লুটপাটের টাকা অবাধে বিদেশে পাচার করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে?

ভল্টে সোনা রহস্য উদঘাটনে তদন্তের নামে আইওয়াশ না হোক এটা সবারই প্রত্যাশা। একইভাবে এর আগের প্রতিটি চুরিরও বিচার হোক; দোষীদের পরিবার-পরিজনের নামে থাকা যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হোক।