ক্যাটেগরিঃ ইতিহাস-ঐতিহ্য

 

বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধি

ঐতিহাসিক বীরাঙ্গনা সখিনার কাহিনী:

উমর খাঁ ছিলেন ময়মনসিংহের অন্তর্গত গৌরীপুর উপজেলার কেল্লা তাজপুরের দেওয়ান।তার একমাত্র কন্যা সখিনার রূপ-গুণ ও সর্ববিদ্যায় পারদর্শিতার কথা সর্বজনবিদিত ছিল। এমনকি তা ৫০/৬০ মাইল দূরবর্তী বার ভূঁইয়ার অন্যতম পরাক্রমশালী জঙ্গলবাড়ীর স্বাধীন শাসক ঈশা খাঁর দৌহিত্র (নাকি অধঃস্থন পুরুষ) সুদর্শন তরুন ফিরোজ খাঁর কানেও পৌঁছে। অপরূপ রূপবতী সখিনাকে স্বচক্ষে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে ফিরোজের অন্তর। কিন্তু উমর খাঁর পরিবারের কঠোর পর্দা প্রথা ফিরোজের অভীক্ষার অন্তরায় হয়ে দাড়ায়। সুতরাং,আশ্রয় নেওয়া হয় কৌশলেই। দরিয়া নাম্নী এক সুন্দরী বাদীকে তসবির বিক্রেতা সাজিয়ে উমর খাঁর অন্তঃপুরে সখিনার বাসগৃহে পাঠানো হল। দূতীয় মুখে ফিরোজ খাঁর অসামান্য রূপ-গুণের কথা শুনে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত সখিনা নিজের অজান্তেই ফিরোজের অনুরক্ত হয়ে পড়েন। চপলমতি কন্যার হঠাৎ ম্রিয়মাণা হওয়ায় অন্তর্নিহিত কারণ বুঝতে বাকী থাকে না খাস বাদীর। সেও সহায়তায় এগিয়ে আসে।

m7-300x225

প্রেমানলে দগ্ধ ফিরোজ খাঁ জঙ্গলবাড়ীতে ফিরে এসে মাতা ফিরোজার সম্মতি নিয়ে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান উমর খাঁর দরবারে। আভিজাত্যগবীঁ কন্যাপক্ষ চরম ঘৃণাভরে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। লজ্জা-ঘৃণা-ক্ষোভে ফিরোজ বিশাল বাহিনী নিয়ে কেল্লা তাজপুরে অভিযান চালান। অতর্কিত আক্রমনে উমর খাঁর বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পরাজয় বরণ করে। শত্রুপক্ষের বিজয়ে উমর খাঁর অন্তঃপুর নারীশূন্য হলেও সখিনার ভাবান্তর হল না। তিনি ঠায় বসে থাকলেন। বিজয়ী ফিরোজ অন্তঃপুরে ঢুকে তাঁকে বাহুবন্ধী করে জঙ্গলবাড়ী নিয়ে যাবেন -এমনটিই যেন চাহিতব্য ছিল। হলও তাই। ইচ্ছার টানে,অনিচ্ছার ভানে সখিনা জঙ্গলবাড়ীতে নীত হলেন। বিবাহের মধ্যদিয়ে উভয়ের অতৃপ্ত প্রেম পূর্ণতার সুধাবারিতে অবগাহন করে।

এদিকে পরাজিত উমর খাঁ প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে আশপাশের হিতাকাঙ্খীগণের সাহায্য প্রার্থনা করলে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া গেল।সম্মিলিত অতিকায় বাহিনীর প্রতিআক্রমণে পরাজয় ঘটল জঙ্গলবাড়ীর সৈন্যদের। ফিরোজ খাঁ বন্দী হলেন। এরপর সখিনাকে তালাক দেওয়ার জন্য বন্দীর উপর চলে অনুক্ষণ চাপ প্রয়োগ। বন্দীর সাফ কথা জীবন থাকতে সখিনার প্রেমের অমর্যাদা করে স্বার্থপরের মত রাজ্যভোগ করবেন না।

হঠাৎ যুদ্ধের ময়দানে আবির্ভূত হল সতের-আঠার বছর বয়েসী এক অনিন্দ্যকান্তি এক যুবক। তার হাতের ছটায় যেন বিদ্যুৎ লাফাচ্ছে। যুবকের নেতৃত্বে ফিরোজের বিপর্যস্থ বাহিনী পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়। ক্ষ্যাপা নেকড়ের মত তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে শত্রু সৈন্যর উপর। দুর্ধর্ষ আক্রমণে উমর খাঁর বাহিনী বিপন্নপ্রায়। এমন সময় ঘটল সেই নিন্দনীয় ঘটনা যা কাহিনীর কলংকজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। উমর খাঁর জনৈক উজিরের কুমন্ত্রণায় রটিয়ে দেয়া হল-যাকে উপলক্ষ করে এই যুদ্ধ, সেই সখিনাকে তালাক দিয়েছেন এই ফিরোজ খাঁ। আলামত হিসেবে ফিরোজের সই জাল করে দেখানো হল যুদ্ধক্ষেত্রে। মুহূর্তে পাল্টে গেল যুদ্ধের ভাব-গতি। যুবক সেনাপতির মাথা ঘুরছে, দেহ কাঁপছে, গলা শুকিয়ে যাচ্ছ, ঘোড়ার লাগাম খসে পড়ছে আর তরবারির হাত হয়ে গেছে স্থবির। আস্তে আস্তে নিথর দেহটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ভূলুণ্ঠিত সেনাপতির শিরোস্ত্রাণ খসে গিয়ে বের হয়ে পড়ে তার আনুলায়িত মেঘবরণ অপূর্ব কেশরাশি। সবাই দেখল এতক্ষণ যে তরুণ সেনাপতি অভূতপূর্ব রণকৌশলে যুদ্ধ করছিল সে আর কেউ নয় উমর খাঁর আদুরের দুলালী সখিনা। খবর পেয়ে ছুটে এলেন পিতা। কলিজার টুকরো কন্যার প্রাণহীন দেহ কোলে নিয়ে উন্মাদের মত বিলাপ করলেন। সে ক্রন্দনে জঙ্গলবাড়ীর বাতাস কি পরিমাণ ভারী হচ্ছিল জানা যায়নি, তবে এই কাহিনী শ্রবণে পূর্ববাসীর অন্তর আজো করুন রসে সিক্ত হয়ে ওঠে, কারো গাল বেয়ে ঝরে কয়েক ফোঁটা নোনাজল।

শোকে মুহ্যমান উমর খাঁ জামাতা ফিরোজ খাঁকে মুক্ত করে দেন। বন্দীত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ফিরোজ যেন প্রতিবন্ধী হয়ে গেলেন। প্রিয়তমার বিয়োগব্যাথা তাকে কিছুতেই সুস্থ হতে দেয় না। অগত্যা রাজপট চুকিয়ে একবস্ত্রে গৃহত্যাগকেই উপযুক্ত ভাবলেন তিনি।

কেল্লা তাজপুরবাসী দেখে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক সোম্যকান্তি মৌলি দরবেশ সখিনার সমাধিতে প্রদীপ জ্বেলে নিশ্চুপ বসে থাকেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকারে পড়ে যায়, নিশুতি রাতের নৈঃশব্দ গ্রাস করে চারপাশ; তথাপি সেই আনমনা ফকির স্থিরনেত্রে সমাধির দিকে চেয়ে থাকেন। কালে জানা গেল ইনিই জীবদ্দশায় সখিনার স্বামী ফিরোজ খাঁ। প্রেমিকার সমাধিতে নিত্য সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বেলে হয়ত ঋণ শোধের চেষ্টা করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

তথ্য প্রদানঃ

১।ইফতেখার আহমেদ
অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ন সচিব
২।কাজী এম.এ.মোনায়েম
সহযোগী অধ্যাপক(বাংলা),
আনন্দমোহন কলেজ,ময়মনসিংহ

গ্রন্থনা ও সম্পাদনায়ঃ
রণজিত কর
প্রাবন্ধিক ও লেখক

সংগ্রহে:

আহাদুল ইসলাম সুমন,
ধারাকান্দী, গৌরীপুর-ময়মনসিংহ।


[ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলাধীন মাওহা ইউনিয়নের কুমড়ী গ্রামে অবস্থিত ইতিহাস প্রসিদ্ধ বীরাঙ্গনা সখিনার মাজারকে পর্যটন হিসেবে গড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।]