ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
journalism

হলুদ সাংবাদিকতার উন্মেষ কবে ঘটেছে, সে দিকে আমার ভ্রুক্ষেপ নেই। সাংবাদিকতাকে একটি চ্যালেঞ্জিং ও মহান পেশা হিসেবেই দেখি এবং দেখতে চাই। তবে হলুদ সাংবাদিকতার জন্ম কিন্তু কোন সাধারণ সাংবাদিকের মাধ্যমে নয়। এর শুরু সাংবাদিকতা জগতের দুই নক্ষত্র যুক্তরাষ্ট্রের জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম রুডলফ হাস্টের হাত ধরেই। আর এটি ছিল পুলিৎজারের নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও হাস্টের নিউইয়র্ক জার্নালের মধ্যে পরিচালিত ব্যবসায়িক স্বার্থকে কেন্দ্র করে।

পরবর্তীতে ফ্র্যাঙ্ক লুথার হলুদ সাংবাদিকতা নিয়ে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরলেও বর্তমানে এর প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্য দেশ-কাল-পাত্র ভেদে ভিন্নতর হয়েছে। তবে যে পেশার স্বার্থই থাকে অন্যের বা জনস্বার্থের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরা। সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর করানো বা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে সম্ভাব্য পথগুলো তুলে ধরা। সে পথ অবশ্যই সর্বদা কন্টকাকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। যে পেশায় চ্যালেঞ্জ নিয়েই প্রতিনিয়ত পথ চলতে হয়, সে পেশাকে মহান না বললে মনে হয়, নিজের বিবেচনাবোধকেই দূর্বল ভাবতে হবে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার উজ্জ্বল ইতিহাস কম নয়। সাংবাদিকতার পেশাগত দক্ষতা ও মেধার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য দিকপাল। যাঁদের অনন্য অবদানের কথা মানুষ আজো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। যারা তাদের কর্মযজ্ঞের দ্বারা নিজে আলোকিত হয়েছেন, গণমাধ্যমকেও করেছেন সমৃদ্ধ। আজ সাংবাদিকতা তারুণ্যের কাছে শীর্ষ পেশার পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু যে সাংবাদিকতা আজো সংবাদ তথা গণমাধ্যমের প্রাণ শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে, তা হলো মফস্বল সাংবাদিকতা। কিন্তু এই  গৌরবোজ্জ্বল মফস্বল সাংবাদিকতার মাঝেই যেন ভূত লুকিয়ে আছে, প্রচলিত কথায় যাকে বলে সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে থাকা। আমরা অনেকেই হলুদ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কথা বলি। বলি সুস্থ্যধারার সাংবাদিকতার উৎকর্ষের কথা। কিন্তু ভেতরের সমস্যাগুলোর উত্তরণ না ঘটা পর্যন্ত,  মফস্বল সাংবাদিকতার এ সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যাবে। এ কথা অনেকেই বুঝেও বুঝতে চায় না। এমনি প্রতিষ্ঠান প্রধানরা দেখেও না দেখার ভান করেন।

প্রত্যেকটা পেশাতেই একটি নির্দিষ্ট পেশাগত ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি কোন সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান দ্বারা নির্ধারিত থাকে। কিন্তু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই এ ধরণের কোন মাপকাঠি এখনো নির্ধারিত হয় নি। প্রেস কাউন্সিল এ ব্যাপারে একটু আওয়াজ তুললেও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু তাই নয়, সব পেশাতেই কর্মীর জন্য অর্থনৈতিক ও অন্যান্য আকর্ষনীয় সুবিধাদি বরাদ্দই থাকে। সে বিবেচনায় সাংবাদিকতা পেশায় কর্মরত মানুষ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান হতে এ ধরণের যুগোপযোগী সুবিধাদি প্রত্যাশা করতেই পারে, আর তা প্রত্যাশা করা অমূলকও নয়। আমার মতে, একজন সাংবাদিক কে হতে হবে দক্ষ, প্রজ্ঞা আর মেধা সম্পন্ন মানুষ। কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই এটির সম্মিলন ঘটে না। এর উপযুক্ত কারণও আছে, কারণ প্রত্যেকটি পেশাজীবিই চায়, তার পেশার উৎসতেই পূর্ণ সময় ব্যয়ের মাধ্যমে নিজ ও পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদার স্বমন্বয় ঘটাতে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকদের এ প্রত্যাশা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। গুটি কয়েক স্বনামধন্য পত্রিকা ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক মতো সাংবাদিকদের খোঁজ-খবর বা বেতনই দেয় না। কিন্তু পত্রিকার পাতা খুললেই যে খবরগুলো আমাদের চোঁখে পড়ে, যে সংবাদগুলো একটা দৈনিকের প্রাণ হয়ে দাড়ায়, সে মফস্বল সাংবাদিকদের খবর কেউ রাখে না। তারা কতটুকু কষ্ট, ঝুঁকি নিয়ে সংবাদগুলো সংগ্রহ করছে, কতটা সময় ব্যয় করে একটা প্রতিবেদন তৈরি করছে, সে খবরই বা আমরা ক-জন রাখি? অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদের পেছনে ছুটতে গিয়ে সন্তান-পরিবার-পরিজনকেও ঠিকভাবে সময় দিতে পারেন না। কিছুটা যেন অন্তহীন দৌড়! কখনো সংবাদ প্রকাশের কারণে আইনী জটিলতায় পড়ে আদালতের কাঠগড়ায়, কখনো স্থানীয় প্রভাবশালীর শিকার হয়ে আহত শরীর নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করা। এ সবই মফস্বল সাংবাদিকদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার সারাংশ। তবুও নেই সাহায্যের হাত বাড়ানোর মানুষ, নেই আইনী লড়াইয়ের সক্ষমতা। কিন্তু অনেকেই এসকল ঝামেলায় না জড়িয়ে উল্টো পথে যাত্রা করেন, যাদের অনেক সাংবাদিককেই স্থানীয়রা সাংবাদিক এর বদলে সাংঘাতিক বলে আখ্যায়িত করে। স্থানীয়দের মতে, সাংবাদিকতা মানে ধান্ধাবাজি করা। আর তাই এসকল মফস্বল সাংবাদিকের ক্ষেত্রে এধরণের ঝামেলা তো ঘটেই না, বরং স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সাংবাদিক পরিচয়ের বদৌলতে জুটে জামাই আদর। সবই যেন ভূতের কারসাজি!

এখন সময় এসেছে গণমাধ্যম কর্মী ও কাজের গুণগত উন্নয়নের। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত রেখে কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়, তথা হলুদ সাংবাদিকতার প্রভাব রোধ করা সম্ভব নয়। আর এই অন্ধকারকে ঢাকতে বিশ্বব্যাপীই এজন্য নতুন রং সৃষ্টির তোড়জোড় সৃষ্টি হয়েছে। যাকে পশ্চিমা বিশ্ব ডাকতে শুরু করেছে গ্রিণ জার্নালিজম বা সবুজ সাংবাদিকতা। সর্বোপরি প্রয়োজন মফস্বল পর্যায়ে যোগ্য ও শিক্ষিত সাংবাদিক তৈরির সৃজনশীল উদ্যোগ, পাশাপাশি এ পেশায় কর্মরতদের আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে মফস্বল পর্যায়ে পেশাগত গণমাধ্যম কর্মী সৃষ্টির পথ সহজতর করা।

 

 

সুমিত বণিক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

sumitbanikktd.guc@gmail.com