ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

মাদক আজ সারাদেশেই সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। কারণ তরুণ সমাজের অনেকের কাছে মাদক মানেই যেন স্মার্টনেস প্রকাশ আর অনুভূতি উপভোগের অপর নাম । সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে মুক্তিযোদ্ধা পিতার নির্মম মৃত্যুতে সবাই যেন নির্বাক ও শোকাহত ! প্রশ্ন জেগেছে, পকিস্তানী হানাদার বাহিনী যেখানে মারতে পরেনি বীরমুক্তিযোদ্ধা এমদাদুল হক ওরফে মানিক মিয়া (৬৫) কে, সেখানে সেই মানুষটিকেই হাতুড়ি ও রড দিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করল তারই এক মাত্র শিক্ষক পুত্র! আর আমাদের সবার চোখ কপালে তখনই উঠে গেল, যখন আনোয়ারুল কবির ওরফে জন (৩৫) মাদকের নীল ছোবলে আসক্ত হয়ে নিজ বাবার ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হলো । একটি পরিবার থেকে সমাজে মাদকের প্রভাব যে কতটা কষ্টদায়ক, কতটা অমানবিক তা নিজ চোখে না দেখলে সত্যি বিশ্বাস করা কষ্টকর। যারা মাদকের ব্যবসা করেন তারা হয়তো শুধু অর্থ উপার্জন করে ক্ষান্ত থাকেন। এদিকে মাদক যে একটি পরিবারের সুখ-শান্তি চিরতরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়, এ কথা তারা একবারও চিন্তা করে না। কিন্তু আমরা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একজন মাদক ব্যবসায়ীকে সামাজিকভাবে তার অপকর্মের জন্য যতখানি নিগৃহীত করার কথা, যতটুকু ঘৃণা করার কথা, তারচেয়ে একজন মাদকাসক্তকে অনেকটা হীন করে দেখি। ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তিটি ভালোবাসা-সহযোগিতা না পেয়ে পরিবার-সমাজের মানুষগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত দূরে চলে যেতে থাকে। নেশার চাহিদা মেটাতে সে পরিণত হয় পশুতে। এখনো অনেক স্থানেই প্রশাসনের নাকের ডগায়ই মাদকের রমরমা ব্যবসা চলছে । মাদকাসক্ত যদি তার এলাকার মাদকের সব আস্তানা চেনে, তাহলে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মীরা কি করে? তাদের সক্রিয় প্রচেষ্টা কি মাদকের বিস্তার রোধে যথেষ্ট নয়?

আজ ‘জন’ একটা ঘুণে ধরা ঘৃণ্য মানুষের নাম ! কিন্তু এই মাদকাসক্ত ‘জন’ তৈরির পেছনে কি আমাদের কথিত সমাজপতিদের কি কোন মদদ নেই? তারা কি দায়ী নয়, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটিয়ে ‘জন’দের মতো তরুণদের জীবনকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকার পথে! আজ সবার মুখে করুণ সুর আর ছি ছি রব! এই জঘণ্য ঘটনার দোষীর শাস্তি দাবী এখন সবার মনে মনে । কিন্তু এই পৈশাচিক মনোবৃত্তির ‘জন’ রা একদিনে তৈরি হয় না। আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে কিছু অর্থলোভী মাদক ব্যবসায়ীর কু-কর্মের ফল এই ‘জন’রা । এর মূলোৎপাটন না হলে এই ‘জন’দের কু-কর্ম বন্ধ করা যাবে না।

কটিয়াদীর বাগরাইট, ভোগপাড়া, চড়িয়াকোনা গ্রাম ও নিকটবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে চলছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা এবং নেশাখোরদের উত্পাত । অথচ এ গ্রামগুলো মডেল থানা থেকে বেশি দূরে নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতা নাকি অন্য কোনো কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দূর করা সম্ভব হচ্ছে না তা আমরা বুঝতে পারছি না। বরং দেখতে পাচ্ছি মাদক ব্যবসার নিত্যনতুন কৌশল যোগ হচ্ছে।
প্রকাশ্যে না হলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গাঁজা, হেরোইন, নেশাজাতীয় ইনজেকশন ও ফেনসিডিলের জমজমাট ব্যবসা চলছে । কটিয়াদী ও এর আশপাশে নেশাদ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এ মুহূর্তে রোধ করতে না পারলে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংস হবে, তাতে সন্দেহ নেই। মাদকাসক্তরা সংখ্যায় অল্প হলেও সমাজে এর সুদূরপ্রসারী পড়ছে, এর ফলে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক বন্ধন ও ধ্বংস পারিবারিক শান্তি ।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তরুণ-যুবকের সংখ্যাই বেশি। অন্যদিকে তরুণ-যুবকেরাই হলো একটি দেশ ও সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম এবং প্রতিশ্রুতিশীল অংশ। কাজেই তারা যদি মাদকের মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে—তাহলে ভবিষ্যতে অনাগত দিনগুলোয় তারা নিজেরাই বা কতটুকু যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে—এ ব্যাপারে সমাজের প্রগতিশীল ও সচেতন মানুষেরা উদ্বিগ্ন।
এ অবস্থায় কটিয়াদীকে মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ খুব জরুরী পাশপাশি  সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার না হলে, এর বিষবাষ্প আরো ছড়িয়ে পড়বে।

 

সুমিত বণিক

উন্নয়নকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।

sumitbanikktd.guc@gmail.com