ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য শিক্ষা খাতের কিছু অবস্থা দেখে মনে হয় যেন শর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে আছে। নেই কোন সমন্বয়!যথেচ্ছ ভাবেই অনুমোদন পাচ্ছে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কোর্স। আবার অনুমোদনের পর নেই কর্মসংস্থান কিংবা উচ্চ শিক্ষার সুযোগ। হতাশার অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী!এদিকে আবার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বৈধ-অবৈধ প্রশ্ন নিয়ে চলছে নানা মাত্রার নাটক!বুঝতে পারি না, এই হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে কেন এই নাটকীয়তা?

2

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দের শুরুর দিকে আজকের এই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ছিল ব্রিটিশ সরকারের উপনিবেশ। যা উপমহাদেশ নামে পরিচিত ছিল। এই উপমহাদেশটি তিনটি ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমত:ভারত অনেকগুলো অঙ্গরাজ্যের সমন্বয়ে। দ্বিতীয়ত: পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ)।তৃতীয়ত: পশ্চিম পাকিস্তান (পাকিস্তান)। অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত এ উপমহাদেশ চিকিৎসা বিদ্যায় তেমন কোন উন্নতি সাধন করতে পারেনি। যার কারণে ব্রিটিশরা চিকিৎসা বিদ্যার উন্নতির জন্য এই উপমহাদেশটির কিছু অঙ্গরাজ্য সমূহে “দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি” তৈরি করে চিকিৎসা বিদ্যায় লাইসেন্সশিয়েট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (এল এম এফ কোর্স), মেম্বার অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (এম এম এফ কোর্স) পরিচালনা করেন। যাতে করে এই উপমহাদেশে মধ্যম মানের চিকিৎসক তৈরি করা সহজতর হয়। সেই সাথে চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ তৈরি করেন (এরা ছিলেন মধ্যম মানের চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ)।ব্রিটিশদের সৃষ্ট্ মেডিকেল ফ্যাকাল্টি সমূহ যেমন:দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ইষ্ট বেঙ্গল,দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ওয়েষ্ট বেঙ্গল, দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ওয়েষ্ট পাকিস্তান,দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ইষ্ট পাকিস্তান, দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব পাঞ্জাব,ইত্যাদি। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯১৪ সালে তৈরী হয় “দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ইষ্ট বেঙ্গল, এবং ১৯৪৭ সালে তা রূপান্তরিত হয়,দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ইষ্ট পাকিস্তান।”পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে,দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব ইষ্ট পাকিস্তান, রূপান্তরিত হয় “দি স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি অব বাংলাদেশ” এ। যেমন চিকিৎসা বিদ্যায় স্নাতক ডিগ্রি (এমবিবিএস/বিডিএস)সার্টিফিকেট দেয় বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব মেডিসিন এবং চিকিৎসা বিদ্যায় (এমএস/এমডি) স্নাতকোত্তর ডিগ্রির সার্টিফিকেট দেয় বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল সায়েন্সেস এন্ড রিসার্চ বিভাগ।

3

আর এ সমস্ত বিষয়সমূহকে প্রাধান্য দিয়ে এবং চলমান অবস্থার বিরুদ্ধে গত ১৪ মে শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মানববন্ধন ও ১০ দফা দাবী ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজি ও ফার্মেসি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিইবি)।মানববন্ধন থেকে দাবি আদায়ে ১৫ মে রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতর করা হয় এর মূল ফটকের সামনে করা হয় অবস্থান ধর্মঘট। ১৬ মে সোমবার থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরণ অনশনের কর্মসূচি ঘোষণাও দিয়েছে সংগঠনটি।

বিটিইবি’র ১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে -অবিলম্বে প্রস্তবিত ‘প্যারামেডিকেল শিক্ষাবোর্ড’ এর বাংলাদেশ এডুকেশন বোর্ড গঠন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করে মেডিকেল টেকনোলজি ও ফার্মেসি কোর্স পরিচালনা, ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের বেকার সমস্যা দূরীকরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী নতুন পদ সৃষ্টি এবং স্থগিত নিয়োগের আইনগত সমস্যার নিষ্পত্তি করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, সরকারি চাকরিতে ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের পদমর্যাদা ১০ম গ্রেডে এ উন্নীত করা।

এছাড়া রয়েছে -উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সকল সরকারি আইএইচটিতে ফার্মেসি ও রেডিওথেরাপিসহ সকল অনুষদের কোর্সের বিএসসি ও অনতিবিলম্বে এমএসসি কোর্স চালু, বিএসসি ডেন্টাল কোর্সের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে পুনরায় ভর্তি কার্যক্রম চালু, স্বাস্থ্য অধিদফতরে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সার্বিক কার্যক্রম যোগাযোগের সুবিধার্থে স্বতন্ত্র উইং চালু, বিএসসি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট/গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য সরকারি, স্বায়ত্ত্বশাসিত হাসপাতাল, চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইনস্টিটিউটগুলোতে পদ সৃষ্টি করে পদায়ন।

1

ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের ক্যারিয়ার প্ল্যান জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা, ডেন্টাল ও ফিজিওথেরাপি ডিপ্লোমাধারীদের প্রাইভেট রেজিস্ট্রেশন প্রদান, ডিপ্লোমা ল্যাবরেটরি মেডিসিন, রেডিওলোজি অ্যান্ড ইমেজিং ও রেডিওথেরাপি শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব কলেজে স্বীকৃতি প্রদান এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের ইন্টার্ণশিপ ভাতা প্রদান।

মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য ডুয়েটের মতো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং সকল প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য প্রাইভেট চাকরি নীতিমালা প্রণয়ন করে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ দান বাধ্যতামূলক করার দাবিও রয়েছে দশ দফার মধ্যে।

যৌক্তিক এই দাবীগুলো কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুবিবেচনা করে দেখবেন? নাকি আন্দোলনে আর হতাশায় ভরে উঠবে অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবন!
সুযোগ আর বৈষম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান অচলাবস্থার কি অবসান হবে না? এদেশে স্বাস্থ্য শিক্ষার নীতি-নির্ধারকগণ কি এই অব্যবস্থাপনার উত্তরণে কোন পদক্ষেপ নিবেন না?

সুমিত বণিক
উন্নয়নকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক।
sumitbanikktd.guc@gmail.com