ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, ব্যক্তিত্ব

হাওরবেষ্টিত কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার নিভৃত পল্লি কাপাসাটিয়ার সাধারণ পরিবারে ১৮৮৯ সালে জন্মে ছিলেন এক বিপ্লবী সন্তান মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। যাঁর সংগ্রামী জীবন-যৌবনের ৩০টি বছরই কেটেছে জেলের প্রকোষ্ঠে। তবুও বিপ্লবী মনোভাব ছিল চিরজাগ্রত।

বিপ্লবী মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ তাঁর জেলে ত্রিশ বছর ও পাক-ভারত স্বাধীনতা সংগ্রাম বইতে লিখেছেন, ‘আমি ভারতবর্ষের মধ্যে, ভারতবর্ষ কেন, সম্ভবত পৃথিবীর মধ্যে, রাজনৈতিক কারণে সর্বাপেক্ষা অধিক বৎসর যাঁহারা কারাগারে কাটাইয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন সময় কারাগারে নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের সাথে কাটাইয়াছি।’

wp_ss_20160809_0001-001

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা ছিলেন ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী। আজন্ম এই সংগ্রামী মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ভারতবর্ষ ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে নিজ দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। জীবন-যৌবনের ৩০টি বছর কারাগারের প্রকোষ্ঠে আটকে রেখেও তাঁর বিপ্লবী মনোভাবকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। কখনো তিনি ছিলেন যোদ্ধা, কখনো গুপ্তচর। ১৯৭০ সালের ৯ই আগস্ট তিনি ভারতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিযুগে ছদ্মনাম ‘মহারাজ’ হিসেবেই তিনি পরিচিত ছিলেন। সংগ্রামে অংশ নেয়ার কারণে তিনি ১৬ বছর বয়স থেকে কারা ভোগ করা শুরু করেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি বিট্রিশদের কাছে মাথা নত করেননি। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে তিনি বিয়ে করে সংসারী না হয়ে চিরকুমার থেকেছেন। প্রচলিত আছে, পাকিস্তান হওয়ার পর শুধু সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এই মহান দেশপ্রেমিককে প্রাপ্য মূল্যটুকু দেয়া হয়নি, অনেক অসম্মান করা হয়েছে তাঁকে। অবশেষে অভিমানে তিনি ভারতে চলে যান । পরবর্তীতে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে ।

খ্যাতিমান এই বিপ্লবীকে এখন আর কয় জনই বা মনে রেখেছেন? এমনকি তাঁর মতাদর্শের রাজনৈতিক মঞ্চেও তাঁর নামটি উচ্চারিত হয় না। মনে রাখার প্রয়োজন অনুভব করে না নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ। এত বড় এক নেতার জন্ম কুলিয়ারচর হলেও পিতৃভূমির অনেক মানুষই তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি জানে না।

সত্যিই আমরা বাংলার সূর্যসন্তানদের খবর কজনই বা রাখি! দিনবদলের খেলায় হারিয়ে যেতে বসেছি কীর্তিমান মানুষদের অবদানের কথা। যাঁদের বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল এই সোনার বাংলা। আমাদের উচিত, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই বিপ্লবীদের জীবনাদর্শগুলো ছড়িয়ে দেওয়া।

গত ৮ আগস্ট ২০১১ইং প্রখ্যাত সাংবাদিক সুমন মোল্লা’র লেখা প্রথম আলোর খোলা কলম পাতায় প্রকাশিত ‘কে তাঁকে মনে রেখেছে’ শীর্ষক লেখাপড়ার আগে প্রয়াত আজন্ম এই বিপ্লবী মহারাজের কথাটি জানার সৌভাগ্য আমারও হয়নি।

ধন্যবাদ প্রথম আলো ও প্রতিবেদক সুমন মোল্লাকে। কারণ, তিনি আমাদের কিশোরগঞ্জের গর্ব হওয়া সত্ত্বেও আপনাদের এই শুভ উদ্যোগের ফলেই কেবল আমিসহ তাঁর জন্মভূমির অসংখ্য মানুষ তথা তাঁর অনুসারীর তাঁকে নতুন করে জানার সুযোগ হলো। সবশেষে আমি বর্তমান সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত কর্তাব্যক্তি ও স্থানীয় ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাতে চাই, স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষিত বিপ্লবী এই মহান নেতার স্মৃতিকে অমলিন রাখার জন্য এমন কিছু করুন, যেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তিনি অমর হয়ে থাকেন। অন্তত মুখ থুবড়ে যেন না পড়ে বিপ্লবী এই মহান নেতার আত্মত্যাগের উজ্জ্বল কীর্তি।

সুমিত বণিক,
উন্নয়নকর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
sumitbanikktd.guc@gmail.com