ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

অধিকাংশ মানুষই তার স্বপ্নের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেন না। কিন্তু স্বপ্নবান মানুষগুলো তাদের কর্মযজ্ঞের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ জীবনের পরিসরকেই করে তুলেন স্বার্থক। তারা জানেন লালন সাঁইয়ের অমৃত বাণী,‘মানুষ ভজলে,সোনার মানুষ হবি’। মানুষের মাঝেই তারা পরম সুখের সন্ধান খুঁজে বেড়ান। যদিও বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মানুষের মানুষের মাঝেই এই জীবন দর্শন উপেক্ষিত। আমি যাকে উপলক্ষ্য করে এই কথাগুলো লেখছি, তিনি হলেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা সদরের প্রয়াত স্বনামধন্য চিকিৎসক অমূল্য চন্দ্র বণিক।

wp_ss_20160815_0006
ক্ষণজন্মা এই মানুষটি ১৯৩৭ সালে জন্ম নিয়ে ১৯৯১ সালেই পারি জমান না ফেরার দেশে। জীবনের খেলা সাঙ্গ করার সময় পেয়েছিলেন মাত্র ৫৪ বছর। ১৯৫৩ সালে কটিয়াদী থেকে ‘ম্যাট্রিকুলেশন’ পাশ করেন। ১৯৫৭ সালে ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল থেকে ‘কম্পাউন্ডার’ সনদ অর্জনের মধ্য দিয়েইে এলাকায় চিকিৎসা পেশায় কর্মজীবন শুরু করেন। তখন এ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা মানেই ছিল ‘মিকচার’ বেজড। এখনকার মতো কোন ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধির পরামর্শ বা তথ্য-উপাত্তের বর্ণাঢ্য রেফারেন্স বইপত্র পড়ে প্রভাবিত হয়ে চিকিৎসা করার সুযোগ ছিলনা। আপন শিক্ষা ও বিবেচনার সংমিশ্রণ ঘটিয়েই তৈরি করতেন কার্যকর ঔষধ। ১৯৭১’ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরায় ‘অক্সফাম’ পরিচালিত আহত মুক্তিযোদ্ধা, আশ্রিত শরণার্থীদের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্রে ‘কম্পাউন্ডার’ হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

wp_ss_20160815_0005
১৯৭৫ সালে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল এর অধীনে ‘বি’ গ্রেড ফার্মাসিস্ট সনদ অর্জন করেন। আপন সাবলীল স্বভাবের কারণে অতি অল্পতেই প্রসার পান আপন কর্মদক্ষতার। ধীরে ধীরে চিকিৎসার সুফলভোগীদের আপন প্রচারের কারণে, এলাকা ছাড়িয়েও আশে-পাশের এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে আন্তরিক সেবার কথা। রাত-দিন নেই,যেখানেই রোগীর স্বজনের ডাক, সেখানেই স্ব-শরীরে উপস্থিত হতেন। কখনও খাওয়ার মাঝপথে, কখনও বা খাবার রেখেই ছুটেছেন রোগী দেখার উদ্দেশ্যে। এমনকি সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর গভীর রাতেও ঘুমিয়ে থাকার অজুহাতে কাউকে ফিরিয়ে দেননি। ছোট শিশুদের বেশী চিকিৎসা বেশী করতেন। আর টাকার জন্য সাধারণত কেউ বিনা চিকিৎসায় ফিরে যান নি। তাঁর এসকল সাবলীল আচরণের জন্য এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিলেন ‘গরীবের ডাক্তার’ হিসেবে। জীবনের মাত্র প্রায় ৩৪টি বছর সুযোগ পেয়েছিল মানুষের সেবা করার জন্য।

wp_ss_20160815_0004
যার জীবন-দর্শনটি এতক্ষণ তুলে ধরলাম, তিনি আমাদের দাদু। ছোট্টবেলার যতটুকু সুখস্মৃতি মানসপটে জাগরিত আছে, সেটি হলো- মা-বাবা’র পরে, যে মানুষটি আমাদের যমজ দুইভাইকে বটবৃক্ষের মতো পরম মমতায় আগলে রাখতেন, যিনি আমাদের ছোট বেলার সকল সহজাত দুষ্টুমিকে অত্যন্ত সানন্দে উপভোগ করতেন, যিনি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সর্বদা উৎকন্ঠায় ভুগতেন, তিনি হলেন আমাদের প্রাণপ্রিয় দাদু অমূল্য চন্দ্র বণিক। দাদু,সঙ্গত কারণেই খুব আক্ষেপ করেই পরিবার-পরিজনদের বলতেন, ‘আমি যদি এই দুইটারে ম্যাট্রিক পাশ করিয়ে যেতে পারতাম’। দাদু’র লালিত স্বপ্ন ঠিকই পূরণ হয়েছে। কিন্তু সেটি দাদু আর নিজ চোখে দেখে যেতে পারেন নি। আজ আমরা দুই ভাইই সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত।

wp_ss_20160824_0001(1)
আমাদের কাছে, আমাদের দাদু শুধু দাদুই নয়, অনুপ্রেরণার এক অনন্য মানুষ। যখন আজও দাদু চলে যাওয়ার প্রায় ২৫ বছর পরও কথা প্রসঙ্গে এলাকার অনেক অচেনা প্রবীন মানুষের সাথে কথা হলে বলেন,‘উনার মতো মানুষ হয় না’ তখন বুকটা গর্বে ভরে উঠে। তখন মনে হয় দাদু সত্যিই তুমি তোমার জীবন কবি নজরুল ইসলাম এর অমর বাণী,‘এমন জীবন তুমি করিও গঠন/মরণে হাসিবে তুমি/কাদিবে ভুবন…’ কে স্বার্থক করেছো ।

আজও এতসব পঙ্কিলতার মাঝেও দাদু’র রেখে যাওয়া আর্দশই আমাদের জীবন পথের পাথেয়। জানি, যুগের পট পরিবর্তনে মানুষের মূল্যবোধের যখন আমূল নেতিবাচক পরিবর্তন, ঠিক সেই সময়েও মানুষের প্রতি দাদু’র অকৃত্রিম ভালবাসা আর সেবার রেখে যাওয়া দীপ্তিময় আদর্শ যেন নিজেদের উজ্জীবিত করে। দাদু, তুমি শুধু দূর থেকে আশীর্বাদ করো, যেন আমরা তোমার রেখে যাওয়া অমলিন স্মৃতির যোগ্য উত্তরসূরী হতে পারি…!

সুমিত বণিক,
উন্নয়নকর্মী,ঢাকা।
sumitbanikktd.guc@gmail.com